ধারাবাহিক গল্প
গোপন উত্তরাধিকার
পর্ব ২: টাকার গন্ধ
২০ জুন, ২০২৬
নিশি জানত, টাকা কখনো শুধু টাকা হয় না।
একটা লেনদেনের পেছনে একটা সিদ্ধান্ত থাকে। আর সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে, মানুষটা আসলে কী চায়।
সকাল সাড়ে আটটা। অভিক গ্রুপ, তেজগাঁও।
কাঁচের দেয়াল, ব্যস্ত কর্মচারীদের আনাগোনা, করিডোরে কফির গন্ধ। বাইরে থেকে দেখলে সব নিখুঁত।
নিজের কেবিনে বসে নিশি পুরনো আর্থিক নথিগুলো চাইল।
প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সাদমান একটু ভ্রু কুঁচকালেন।
"ম্যাডাম, কোন সালেরগুলো?"
"যে বছরগুলোতে আমরা ছোট ছিলাম।"
"পুরনো আর্কাইভ?"
"হ্যাঁ। ওগুলোই।"
আধা ঘণ্টার মধ্যে টেবিলে ফাইলের স্তূপ। নিশি R.H Holdings লেখা ফোল্ডারটা টেনে নিল।
ভেতরে প্রথমেই সেই ছেলেটার ছবি। রায়ান।
তার নিচে একটা লিজ পেপার। তেজগাঁওয়ের একটা পুরনো গুদাম।
নিশির আঙুল থেমে গেল।
এই ঠিকানাটা সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে।
এটাই তাদের প্রথম গুদাম ছিল। যেখানে সে আর অভিক নিজের হাতে কার্টন গুনত, রাত দুইটা পর্যন্ত ইনভয়েস লিখত। যেখানে অভিক বলেছিল, "একদিন এই ছোট জায়গা থেকেই বড় কোম্পানি হবে।"
সেই গুদামটা এখন R.H Holdings এর নামে।
নিশি চেয়ারটা পেছনে ঠেলে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের গ্লাসের পানিটা এক চুমুকে শেষ করল। হাতটা একটু কাঁপছিল। রাগে, হয়তো অন্য কিছুতে।
এটা শুধু একটা ছেলেকে টাকা পাঠানো না। এটা তাদের অতীতের একটা টুকরো কেটে নিয়ে যাওয়া।
ব্যাংকিং পোর্টালটা খুলতেই চোখে পড়ল।
R.H Project - রায়ান হোসেন
পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের তারিখ: পরের সপ্তাহ
অবস্থা: অনুমোদনের অপেক্ষায়
নিশির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
সে মাউসটা টেনে "অনুমোদন বাতিল" বাটনে ক্লিক করল। একটা কনফার্মেশন উইন্ডো ভেসে উঠল।
"আপনি কি নিশ্চিত?"
নিশি এক সেকেন্ডও ভাবল না।
হ্যাঁ।
স্ক্রিনে লেখা উঠল: "লেনদেন বাতিল করা হয়েছে।"
নিশি ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। বুকের ভেতরটা হালকা লাগছিল না, ভারীও লাগছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল, ঠিক করেছি।
কেউ যদি আমার কাছ থেকে লুকিয়ে আমার জিনিস নেয়, আমি সেটা বন্ধ করবই।
দুপুরে অভিক দরজা ঠেলে ঢুকল। নক না করেই।
"তুমি R.H এর পেমেন্ট আটকেছো?"
নিশি ফাইল থেকে চোখ তুলল না।
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
"কারণ ওই টাকা কোথায় যাচ্ছে সেটা আমি জানি না।"
"তুমি জানো কোথায় যাচ্ছে।"
"না। আমি জানি কার কাছে যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে, সেটা জানি না।"
অভিক টেবিলে দুই হাত রাখল, ঝুঁকে দাঁড়াল।
"তুমি কি মনে করো আমি তোমাদের কিছু কেড়ে নিচ্ছি?"
নিশি এবার তাকাল।
"আমি মনে করি তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছো। বাকি হিসাবটা পরে হবে।"
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর গলাটা নামিয়ে বলল,
"তুমি যখন কষ্ট পাও, তখন বিচারক হয়ে যাও, নিশি।"
কথাটা গায়ে লাগল। নিশি চোখ সরাল না।
"আর তুমি যখন ভয় পাও, তখন সত্য লুকাও।"
দুজনেই চুপ। দুজনের কথাতেই সত্যি ছিল, আর সেটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
"পেমেন্টটা ছেড়ে দাও," অভিক বলল।
"না।"
"নিশি—"
"বললাম তো না। আগে আমি জানব রায়ান কে। তারপর টাকা যাবে।"
অভিক দরজার দিকে ঘুরল। যাওয়ার আগে বলল,
"তুমি সবসময় জিততে চাও। সব কথায়।"
নিশি বলল,
"আর তুমি সবসময় পালাতে চাও। সব সত্য থেকে।"
অভিক আর কিছু বলল না। দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হলো।
সন্ধ্যায় নিশি আবার R.H Holdings এর ফাইল খুলল। গুদামের দলিলটা ভালো করে দেখল।
প্রথম পাতায় মালিকানা হস্তান্তরের স্বাক্ষর।
প্রথম স্বাক্ষর: A.R
দ্বিতীয় স্বাক্ষরটা দেখে নিশির হাত থেমে গেল।
হাতের লেখাটা সে চেনে। খুব ভালো করে চেনে।
এটা অভিকের লেখা না।
কিন্তু এই লেখা সে গত বারো বছর ধরে কোম্পানির কত কাগজে দেখেছে, তার হিসাব নেই।
নিশি ফাইলটা বন্ধ করল না। খোলাই রইল।
বাইরে তেজগাঁওয়ের রাস্তায় গাড়ির হর্ন বাজছে। একটানা।
নিশি ফোনটা হাতে নিল। অভিককে ফোন করার জন্য না।
সেই স্বাক্ষরটা যে মানুষটার, তাকে ফোন করার জন্য।
রিং হচ্ছে...
চলবে...
পর্ব ৩: যে সত্যটা অভিক বলেনি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।