যে চিঠি কখনো পোস্ট হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছয় পর্বের ছোটগল্প
২৪ আগষ্ট, ২০২৬
পর্ব চার
মালবিকার শেষ চিঠি
পরদিন মালবিকা অনেক দেরিতে এলেন। সাধারণত বিকেলের আগেই আসতেন। আজ সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, “শরীর খারাপ?”
মালবিকা মাথা নাড়লেন। “না।
আজ একটা কাজ ছিল।”
“কী কাজ?”
“শেষ চিঠিটা লিখেছি।”
অনিরুদ্ধ কিছু বললেন না।
মালবিকা ব্যাগ থেকে একটি খাম বের করলেন।
“এটা আজ রাখবেন।”
“কোথায়?”
“যেখানে সবসময় রাখি।”
তিনি খামটি অনিরুদ্ধের হাতে দিলেন। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“জানেন, এত বছর ধরে আমি ভাবতাম, ওকে অনেক কথা বলব। আজ বুঝলাম, বলার মতো আর কিছু নেই।”
“সব বলা হয়ে গেছে?”
“না।”
মালবিকা একটু হাসলেন।
“কিছু কথা কোনোদিন বলার জন্য ছিলই না।”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকালেন।
“আপনি চিঠি লিখেছেন?”
অনিরুদ্ধ চমকে গেলেন। “না।”
“লিখবেন।”
“কী লিখব?”
“যেটা মুখে বলতে পারেননি।”
সেদিন মালবিকা চলে গেলেন।
পরদিন তিনি এলেন না। তার পরদিনও না। তৃতীয় দিনেও বেঞ্চটা খালি। চতুর্থ দিনেও।
অনিরুদ্ধের বুকের মধ্যে অস্বস্তি জমতে লাগল।
পঞ্চম দিনে তিনি মালবিকার দেওয়া শেষ খামটি খুললেন।
ভেতরে লেখা,
“তুমি জানো, আমি তোমার ওপর কত রাগ করতাম?
তুমি কখনো জিনিস জায়গামতো রাখতে না। চশমা হারিয়ে আমাকে ডাকতে। চা ঠান্ডা করে ফেলতে। আর নিজের অসুখটাও লুকিয়ে রাখতে। তখন খুব রাগ হতো। এখন এসব মনে পড়লে হাসি পায়।
পনেরো বছর ধরে তোমাকে চিঠি লিখেছি। ভেবেছিলাম, একদিন হয়তো সব অভিমান শেষ হয়ে যাবে। হয়নি। অভিমানও বুঝি ভালোবাসার মতো—পুরোপুরি মরে না।
তবে আজ একটা কথা বলতে পারি। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি খুব একা হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে ছাড়া বাঁচতে শিখেছি। তোমাকে ভুলে নয়। তোমাকে সঙ্গে নিয়েই।
আজ শেষ চিঠি লিখছি। কারণ আমার মনে হচ্ছে, এবার আমারও একটু বাইরে যাওয়া দরকার। চিঠি রেখে যাব না আর।
ডাকঘরের ওই মানুষটাকে বলবেন—সে যেন নিজের চিঠিটা লিখে। সে খুব দেরি করে ফেলেছে।”
নিচে শুধু,
মালবিকা।
অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।