সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প- ১ শেষ শখ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
একদিন ভোরে নিশি হঠাৎ টের পেল, তার নিজের বলতে আর কোনো শখ বেঁচে নেই। যা আছে, সবই প্রয়োজন। অ্যালার্ম বাজার আগেই আজকাল তার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলতেই মাথার ভেতর হিসাব শুরু হয়ে যায়—মেঘের টিফিনে কী দেবে, মিশির দুধটা বসাতে হবে, অভিকের নীল শার্টটা এখনও ইস্ত্রি করা হয়নি। সব মনে থাকে। শুধু নিজের কথাটা মনে থাকে না।
একসময় নিশির খুব আঁকার শখ ছিল। কলেজে পড়ার সময় ক্যানভাস পেলেই সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত। কখনো নদী, কখনো জানালার পাশে পড়ে থাকা বিকেলের আলো, কখনো কোনো অচেনা মুখ। বন্ধুরা মজা করে বলত,
“তুই একদিন সত্যিই বড় শিল্পী হবি।”
নিশিও বিশ্বাস করত। বিয়ের পরও কিছুদিন সেই বিশ্বাসটা ছিল। আলমারির ওপরের তাকে একটা বাক্সে রাখা থাকত ক্যানভাস, তুলি আর রঙের টিউব। মাঝেমধ্যে বাক্সটা নামিয়ে ছবি আঁকা শুরু করত নিশি। তারপর সংসারের ডাক আসত—“নিশি, এক কাপ চা হবে?”
কিংবা “মা, আমার জামাটা কোথায়?”
অথবা “আজ রান্নাটা একটু তাড়াতাড়ি করো।” নিশি তুলি রেখে উঠে যেত। ছবিটা পড়ে থাকত একদিন, দুদিন, এক সপ্তাহ। তারপর আর আঁকা হতো না। একসময় রং শুকিয়ে গেল, তুলিগুলো শক্ত হয়ে গেল। বাক্সটাও আলমারির ওপর থেকে নেমে গেল নিচের তাকে। এভাবেই বছর কেটে গেল।
একদিন মেঘ স্কুল থেকে ফিরে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “মা, তুমি আঁকতে পারো?”
নিশি হেসে বলল, “একসময় পারতাম।”
মিশি সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এখন পারো না?”
নিশি একটু থেমে বলল, “সময় পাই না।”
কথাটা বলেই তার নিজের কাছেই কেমন লাগল। সে আঁকা ভুলে যায়নি। শুধু নিজের জন্য সময় রাখার অভ্যাসটাই হারিয়ে ফেলেছে।
অভিক খারাপ মানুষ নয়। সংসারের জন্য অনেক পরিশ্রম করে। রাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরেও মেয়েদের খোঁজ নেয়। মাঝে মাঝে নিশিকে বলে,
“তুমি না থাকলে আমি এই সংসারটা সামলাতেই পারতাম না।”
নিশির ভালো লাগে শুনতে। তবু কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না, “তুমি কেমন আছ?” কেউ জানতে চায় না,
“তোমার নিজের কী করতে ইচ্ছে করে?”
অভিকের দোষ হয়তো নেই। সংসারের মানুষগুলোও নিশির ওপর নির্ভর করতে করতে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, তারা ভুলেই গেছে—যে মানুষটা সবার প্রয়োজন মেটায়, তারও নিজের কিছু প্রয়োজন থাকতে পারে।
এক বিকেলে আলমারি গোছাতে গিয়ে পুরোনো স্কেচবুকটা হাতে এল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। একটা পাতায় নিজের হাতের লেখা দেখতে পেল নিশি—“আমার রংগুলো কখনো শুকাবে না।” লেখাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে হেসে ফেলল। খুব আস্তে বলল,
“শুকিয়েই তো গেলি।”
ঠিক তখনই মেঘের ডাক এল,
“মা, কোচিংয়ের দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
নিশি খাতাটা বন্ধ করে রেখে দিল। আবার সেই চেনা ব্যস্ততা।
সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর নিশি অনেকক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। শহরের অসংখ্য জানালায় আলো জ্বলছে। প্রতিটি জানালার পেছনে একেকটা জীবন, একেকটা ব্যস্ততা, একেকটা গল্প। নিশির মনে হলো, তারও তো একটা জীবন আছে। শুধু দায়িত্বের তালিকা দিয়ে একটা জীবন হয় না। এই কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো। যেন বহুদিন পর সে নিজের কাছেই নিজের অস্তিত্বের কথা শুনতে পেল।
পরদিন মেঘ স্কুলের প্রজেক্ট বানাতে বসেছিল। রং মেশাতে গিয়ে বারবার ভুল করছে। নিশি পাশে বসে বলল,
“লালের সঙ্গে একটু হলুদ মেশাও। দেখবে কমলা হবে।”
মেঘ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“মা, তুমি তো দারুণ জানো!”
মিশি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“তাহলে মা, তুমিও একটা আঁকো!”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বহু বছর পর আবার তুলি হাতে নিল। হাতটা একটু কাঁপছিল। সে একটা ছোট ফুল আঁকল। খুব সাধারণ একটা ফুল। কিন্তু আঁকতে আঁকতে তার মনে হলো, বুকের ভেতর বহুদিন বন্ধ থাকা একটা দরজা যেন একটু খুলে গেল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অভিকও দেখছিল। সে মৃদু হেসে বলল,
“তুমি তো সত্যিই ভালো আঁকো।”
নিশি বলল,
“আগে আঁকতাম।”
অভিক একটু ভেবে বলল,
“আবার শুরু করো না।” কথাটা খুব সাধারণ।
কিন্তু নিশির ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে রইল।
সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ ভাবল। সংসারকে ভালোবাসতে গিয়ে নিজেকেও কি একটু ভালোবাসা যায় না? নিজের জন্য দশ মিনিট সময় চাওয়া কি সত্যিই স্বার্থপরতা?
এতদিন সে ভেবেছে, নিজের ইচ্ছেগুলো পরে পূরণ করবে। কিন্তু সেই “পরে” যে কখনো আসে না, সেটা বুঝতে তার এতগুলো বছর লেগে গেল।
পরদিন সবকিছু আগের মতোই চলল। মেঘের টিফিন, মিশির দুধ, অভিকের শার্ট, রান্নাঘরের কাজ—কিছুই বদলায়নি। শুধু নিশি বারান্দার কোণের পুরোনো টেবিলটা পরিষ্কার করে সেখানে স্কেচবুক আর কয়েকটা নতুন রং রেখে দিল। দুপুরে কাজ শেষ হলে সে দশ মিনিট বসবে। হয়তো ছবি আঁকবে, হয়তো কিছুই হবে না। তবু বসবে। কারণ তার শেষ শখটা মরে যায়নি। শুধু অনেকদিন চুপ করে অপেক্ষা করছিল।
সেদিন সাদা পাতায় নিশি একটা রেখা টানল। রেখাটা বাঁকা হয়ে গেল। সে মুছল না। বহু বছর পর নিজের জীবনে নিজের হাতে টানা সেই প্রথম রেখাটাকে সে ওভাবেই রেখে দিল। বাইরে তখন দুপুরের রোদ। ঘরের ভেতর সংসারের কাজের শব্দ। আর বারান্দার ছোট টেবিলে, একটা সাদা পাতার ওপর, নিশির নিজের জন্য শুরু হলো খুব ছোট্ট একটা জায়গা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।