অতঃপর বেঁচে থাকা
শামীমা আকতার
ভর দুপুর। সূর্য মাথার উপর। পিটার বেড়াবার জন্য সবসময় এ সময়টাকেই বেছে নেয়। প্রতিদিন সে বিভিন্ন গাছপালা দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে তার ৩৫ বছরের নতুন দেহকে নিয়ে বেঞ্চে গিয়ে ঘণ্টাখানেক বসে থাকে। তার বসে থাকার ভঙ্গি দেখে দূর থেকে কেউ তাকে শতবর্ষের একজন বৃদ্ধ বলে ভুল করবে। গতকাল এক তরুণী এ ভুলটাই করেছিল। সে দূর থেকে দেখে পাশে এসে বসতেই থমকে গেল। মেয়েটি অস্বস্তি নিয়ে বসল।
অস্বস্তির সাথে এবার লজ্জা এসে মিশল—যখন পিটার হেসে বলল, "সবাই ভুল করে।"
পিটার মেয়েটিকে সহজ করার জন্য বলল, "খুকী, তুমি কি এখানে বেড়াতে এসেছ?"
মেয়েটি এবার রেগে গিয়ে বলল, "আমাকে দেখে কী খুকী মনে হয়? সামনের মাসে আমার বয়স পঁচিশ পূর্ণ হবে!"
"আর আমার আজ হাজার বছর পূর্ণ হয়েছে।"
"হাজার বছর? তা কী করে সম্ভব?"
"সম্ভব এজন্যে যে, আমি একজন ক্লোন মানুষ।"
বিস্ময়ে মেয়েটির চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
"ক্লোন মানুষ? কী ভয়াবহ ব্যাপার! একটু খুলে বলবেন?"
২০৫০ সালের কোনো এক বিকেল। অফিস থেকে যখন বের হলাম তখন পড়ন্ত বিকেল। আকাশে মনে হলো কয়েক টুকরা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। মনে মনে একটু শঙ্কিত হলাম। যা ভেবেছিলাম তাই; হুড়মুড় করে বৃষ্টি শুরু হলো। আমি দৌড়ে একটি ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালাম।
বৃষ্টির ছাঁট এসে গায়ে পড়তে লাগল। হঠাৎ শীতল স্পর্শে চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখি এক লোক দরজা খুলে দাঁড়িয়েছেন।
বললেন, "আপনি তো ভিজে চুপসে গিয়েছেন, ভিতরে আসুন।"
প্রস্তাবটা মন্দ লাগল না। ঘরে ঢুকতেই তিনি ভিতর থেকে তোয়ালে এনে দিলেন। এরপর আবার ভিতরে চলে গেলেন। লোকটি দু’টি কফির মগ নিয়ে ভিতরে ঢুকে বললেন, "কী ব্যাপার, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন।"
"আজ না, আর একদিন এসে বসে যাব। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে, মেয়েটা ঘরে একা।"
"বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাবেন? আমার গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে।"
লোকটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল।
"আপনার কি ওই একটাই বাচ্চা?"
"হ্যাঁ, একা একা কী করছে কী জানি!"
"একা কেন? আপনার স্ত্রী কোথায়?"
অন্য সময় হলে খুবই বিরক্ত হতাম। তাঁর বলার ভঙ্গিতে এমন আন্তরিকতা ছিল—বরং ভালোই লাগল।
"দেখেন, আপনার তবু একটা মেয়ে আছে। আমার একা একা কী দুর্বিষহ জীবন! প্রায়ই মনে হয় জীবনটা যদি আবার প্রথম থেকে শুরু করতে পারতাম!"
"হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন; আমারও প্রায়ই তাই মনে হয়।"
"আচ্ছা মনে করেন, আপনি আপনার সকল অভিজ্ঞতা নিয়ে আবার জন্মগ্রহণ করলেন, তাহলে কেমন হয়?"
"তাহলে তো খুব ভালো হয়। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়।"
"মনে করেন, আপনার ক্লোন করা হলো।"
বললাম, "তাতে আমার লাভ কী? যে জন্মাবে সে তো অন্য মানুষ, আমি নই।"
"লাভ নেই বলছেন কেন? নতুন দেহে যদি আপনার সমস্ত স্মৃতি স্থাপন করা হয়, তাহলে কেমন হয়?"
এ কথাগুলো বলার সময় লোকটির চোখ কেমন ছোট থেকে ছোট হয়ে গেল। আমি মানুষ হিসেবে ভীতু নই; কিন্তু হঠাৎ আমার সমস্ত শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল।
এমন সময় গাড়ির হর্ন শোনা গেল। আমি দ্রুত দরজায় চলে এলাম।
আমার হঠাৎ করে এমন ভয় পাওয়ার জন্য লজ্জা করতে লাগল। লোকটি এবার হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। হাত ধরার সাথে সাথেই সমস্ত শরীর দিয়ে আবার শীতল স্রোত বয়ে গেল। লোকটির হাত এত ঠান্ডা কেন? দ্রুত গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ঘুমে আমার দু’চোখ জড়িয়ে আসতে লাগল। মরণ ঘুম আমাকে গ্রাস করল।
যখন ঘুম ভাঙল, দেখলাম একটি বিশাল ঘরের ছোট্ট একটি খাটে আমি শুয়ে আছি। মুখ তুলতেই লোকটিকে দেখতে পেলাম। সমস্ত শরীর সজাগ হয়ে উঠল।
লোকটি দৌড়ে এসে আমার হাত চেপে ধরল, "কোথায় যাচ্ছ?"
বললাম, "আমাকে ছেড়ে দিন।"
লোকটি হাহা করে হেসে উঠল। আমাকে হাত ধরে টেনে একটি আয়নার সামনে দাঁড় করাল, "নিজেকে ভালো করে দেখো।"
আয়নায় নিজের চেহারা দেখে আমি বাকরুদ্ধ। দেখলাম, আমি আট-দশ বছরের একজন বালক মাত্র।
"আমার এমন ক্ষতি কেন করলেন?" আমি হাউমাউ করে কাঁদতেলাম।
"দেখো, আমি অমরত্ব লাভ করতে চেয়েছি। তাই প্রথম পরীক্ষা তোমার উপর চালিয়েছি। আমি চাই পৃথিবীতে শুধু আমার রাজত্ব চলবে। তাই আমি হতে চাই এক, আবার একই সাথে অনেক।"
"মানে?"
"চলো, তোমাকে দেখাচ্ছি।"
যা দেখলাম তাতে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আটটি খাটে তিনজন করে মোট চব্বিশ জন শিশু। প্রত্যেকে দেখতে হুবহু একই রকম।
"এরা সবাই আমি। আমরা সবাই একই রকম চিন্তা করব, একই রকম ভাবব।"
বললাম, "আপনার কাজ তো শেষ, এবার আমাকে ছেড়ে দেন।"
"না, দেব না। কারণ এখানে কোনো ভুল দেখা দিলে তোমার প্রয়োজন পড়বে। আমি নিজে তো নিজেকে নষ্ট করতে পারি না।"
এরপর থেকে আমি তার হাতের পুতুল।
আজ ৩০২৩ সালের ১লা নভেম্বর। পৃথিবীতে আমার জন্মের হাজার বছর পূর্ণ হলো। প্রথম জন্মে প্রতিবছর এ দিনে অনেক মজা হতো। আর এখন সামনে কিছু নেই, পিছনে কিছু নেই, পাশে কেউ নেই; আছে শুধু ক্লান্তিকর বেঁচে থাকা।
মেয়েটি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর পাশে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। সে বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল। হঠাৎ একটি তীব্র কষ্টের অনুভূতি তার সমস্ত শরীর তোলপাড় করে ফেলল। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।