যে আলো নিভেও নেভে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গদ্য কবিতা। ১০ আগস্ট, ২০২৬
আলো নিভে গেলে ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ
অন্ধকার থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ সয়ে যায়।
কিন্তু তোমার চলে যাওয়ার পর আমার চোখ আর কোনোদিন সয়ে উঠল না।
তুমি নেই,
এই কথাটা আমি মেনে নিয়েছি।
কিন্তু তোমার না-থাকাটা?
সেটা এখনো আমার চারপাশে ছড়িয়ে আছে।
কখনো জানালা খুললে বাতাসের সঙ্গে পুরোনো একটা গন্ধ আসে।
কেন জানি মনে হয়, তুমি বুঝি এইমাত্র পাশ দিয়ে গেলে।
তারপর নিজেকেই বুঝিয়ে বলি,
না, কেউ আসেনি।
এসব শুধু মনে থাকার ব্যাপার।
তোমার সেই হাসিটা হয়তো তুমি অনেক আগেই ভুলে গেছ।
আমি ভুলিনি।
সন্ধ্যা নামলে কোনো কোনো দিন সেই হাসিটা
হঠাৎ মনে পড়ে যায়।
ঘরটা তখন একটু বেশি চুপচাপ লাগে।
যে পথ ধরে তুমি একদিন চলে গিয়েছিলে,
সেই পথ এখনো আছে।
শুধু তুমি নেই।
মাঝে মাঝে সেই পথের দিকে তাকিয়ে থাকি।
জানি, তুমি আর ফিরবে না।
তবু মানুষের মন বড় অদ্ভুত,
যা অসম্ভব, সেটাকেই কখনো কখনো
চুপচাপ বিশ্বাস করতে থাকে।
বাতাসে তোমার নাম লিখতে গিয়েছিলাম একদিন।
বাতাস এসে মুছে দিল।
অদ্ভুতভাবে ভালোই লাগল।
ভাবলাম, কিছু নাম হয়তো
লিখে রাখার জন্য নয়।
মনে রাখার জন্য।
আমি তোমাকে আটকে রাখিনি।
কখনো রাখবও না।
তুমি চলে যেতে চেয়েছিলে,
চলে গেছ।
শুধু তুমি যে ছোট্ট আলোটা আমার জীবনে রেখে গিয়েছিলে, সেটা আমি নিভিয়ে দিতে পারিনি।
সেই আলোয় অনেক রাত কেটেছে।
কখনো শান্তিতে, কখনো খুব একা হয়ে।
কখনো মনে হয়েছে,
এই আলোটা আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে।
আবার কোনো কোনো রাতে মনে হয়েছে,
এই আলোতেই আমি একটু একটু করে পুড়ে যাচ্ছি।
কেউ এসব জানে না।
মানুষ শুধু বাইরে থেকে দেখে আমি আছি,
কথা বলছি, কাজ করছি,
হাসছি।
ভেতরে কতটা নদী বয়ে যায়,
তার খবর কে রাখে?
নদী তো পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েও থামে না।
চুপচাপ নিজের পথ করে নেয়।
আমিও শিখে গেছি।
অভিমান আছে।
কষ্টও আছে।
তবু ভালোবাসাটাকে পুরোপুরি ফেলে দিতে পারিনি।
তুমি এখন অনেক দূরের একটা আকাশ।
আমি হয়তো তোমার জীবনের
একটা পুরোনো অধ্যায় মাত্র।
হয়তো তুমি আমাকে আর মনে রাখো না।
হয়তো মনে রাখলেও সেই মনে রাখার কোনো মানে নেই।
তুমি তোমার জীবনে চলে গেছ।
নতুন মানুষ, নতুন গল্প, নতুন দিন।
আর আমি?
আমি এখনো মাঝে মাঝে পুরোনো খাতার পাতা উল্টাই।
কিছু লেখা পড়ি।
কিছু পড়ি না।
কিছু পাতা ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে,আবার পারি না।
কারণ সেখানে শুধু তোমার কথা নেই,
সেখানে আমারও একটা সময় আছে।
একটা মানুষ ছিল, যে খুব সহজে বিশ্বাস করত।
খুব সহজে ভালোবাসত।
আর ভাবত, ভালোবাসলে মানুষ থেকে যায়।
সেই মানুষটা এখন আর আগের মতো নেই।
তবু পুরোপুরি হারিয়েও যায়নি।
সুখ চলে গেলে আমি বুঝেছি,
ভালোবাসা সবসময় সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় না।
কখনো সে থেকে যায়।
একটা খালি ঘরের মতো।
যেখানে কেউ থাকে না,
তবু দরজা খুললে মনে হয় কেউ বুঝি এখনো
ভেতরে আছে।
একটা প্রদীপের মতোও থাকে, অনেকক্ষণ পরও
যার সলতেটা একটু একটু করে জ্বলতে থাকে।
সময়ের ওপর আমার কোনো রাগ নেই।
সময় তার কাজই করেছে।
মানুষ বদলেছে।
দূরত্ব বেড়েছে।
কথা কমেছে।
শেষ পর্যন্ত তুমিও চলে গেছ।
সময় কাউকে ধরে রাখে না।
শুধু কে কোথায় থেকে গেল,
আর কে কোথায় হারিয়ে গেল—
সেই হিসাবটা হয়তো হৃদয় নিজের মতো করে রেখে দেয়।
এখনো কোনো গান বাজলে এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়,
তুমি পাশে এসে বসেছ।
তারপর চোখ তুলে দেখি—
কেউ নেই।
শুধু জানালার পর্দা নড়ছে।
ঘরের আলোটা একটু কাঁপছে।
আর আমি বসে আছি।
আগের মতো অপেক্ষা করছি না।
তোমাকে ফিরে আসতে বলছি না।
শুধু মাঝে মাঝে মনে পড়ে।
এতটুকুই।
হয়তো এটাই ভালোবাসার শেষ রূপ—
কাউকে কাছে না চেয়েও তার জন্য মনের ভেতর
একটা ছোট জায়গা রেখে দেওয়া।
তুমি তোমার মতো থেকো।
আমি আমার মতো থাকি।
তোমার জীবনে আমি না থাকলেও আমার জীবনের একটা সময়ে
তুমি ছিলে—এই সত্যিটুকু কেউ বদলাতে পারবে না।
আর সেই সময়ের জন্য
আজও আমার কোনো আফসোস নেই।
কারণ তুমি চলে গেছ বলে
সেই দিনগুলো মিথ্যে হয়ে যায়নি।
শুধু শেষ হয়ে গেছে।
এই যে এখনো বেঁচে আছি,
তোমাকে ছাড়াই দিন পার করছি,
নিজের মতো করে আবার হাঁটতে শিখছি,
এটাও হয়তো এক ধরনের ভালোবাসা।
তোমাকে পাওয়ার নয়,
তোমাকে ছেড়ে দিয়েও
নিজেকে হারিয়ে না ফেলার ভালোবাসা।
তুমি নেই।
তবু একটা আলো রয়ে গেছে।
হয়তো তোমার রেখে যাওয়া।
হয়তো আমার নিজের।
এখন আর জানার দরকার নেই।
শুধু জানি—
কিছু আলো নিভে গেলেও
পুরোপুরি নেভে না।
তারা ঘরের ভেতর থাকে না,
মানুষের ভেতর থেকে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।