বিষের ভেতর যে আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গদ্য কবিতা। ৯ আগষ্ট, ২০২৬
অনেকবার মনে হয়েছে,
এখানেই শেষ।
আর এক কদমও না।
অথচ প্রতিবার রাত ফুরিয়েছে।
জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকেছে
এক চিলতে রোদ।
নিতান্ত সাধারণ রোদ।
সেই সামান্য আলোটুকুই কাঁধে হাত রেখে বলেছে যাও, আরও একটা দিন।
কিছু দুঃখ কেবল পোড়ায় না,
মানুষ করে তোলে।
প্রথমে ব্যথা দেয়, অনেক পরে এসে আঙুল ধরে
মানুষ চেনায়, নিজেকে চেনায়।
একদিন খুব চুপচাপ বসে টের পেলাম,
বুকের ভেতর যে ভারী পাথরটা নিয়ে হাঁটছি এতদিন,
তার নিচেও একটা নদী বয়ে যাচ্ছে।
ক্ষীণ। কিন্তু বেঁচে আছে।
সব পেয়ে গেলেই মানুষ ভালো থাকে না।
কিছু না-পাওয়া বরং দীর্ঘদিন পাশে থাকে।
একটা পুরোনো বিকেল হয়ে,
একটা ভুলে যাওয়া গন্ধ হয়ে,
কারও শেষবার বলা “সাবধানে যেও” হয়ে।
সুখের কাছে আমার তেমন ঋণ নেই।
যা কিছু শিখেছি, দুঃখের কাছেই শিখেছি।
দুঃখ আমাকে তাড়াহুড়ো করতে ভুলিয়েছে।
সবাই যখন নিজের কথা বলেছে,
তখন অন্যের নীরবতাটুকু শুনতে শিখিয়েছে।
আমার নিজের কষ্ট?
তার সবটুকু কোনোদিন কাউকে বলা হয়নি। বলিনি।
অনেক স্বপ্ন ছিল।
কিছু ঝরে গেছে পথে।
কিছু আমার হওয়ার ছিলই না কোনোদিন।
কিছু ইচ্ছে এমন ছিল,
মুখ ফুটে বলার সাহসই হয়নি।
এখন আর অভিযোগ করি না।
বড় হতে হতে মানুষ বোঝে,
সব চাওয়া পূরণ করার জন্য জীবন আসে না।
তবু ভেতরে একটা কোণ ফাঁকা রেখেছিলাম।
সেখানেই এসেছে অন্ধকার,
এসেছে একা-থাকা, এসেছে নির্ঘুম রাত।
নিজের সঙ্গে কথা বলেছি অনেক রাত।
কখনও উত্তর পেয়েছি, কখনও পাইনি।
আর আশ্চর্য,
সেই অন্ধকারের ভেতর বসেই একদিন আলোটা চোখে পড়ল।
মানুষ বোধহয় এভাবেই বেঁচে থাকে।
ভেঙে যায়, আবার নিজেই নিজেকে কুড়িয়ে জোড়া লাগায়।
কাউকে হারায়, স্বপ্ন হারায়, একসময় নিজের অহংকারটুকুও রেখে আসে পেছনের বাঁকে।
তারপর একদিন পেছন ফিরে দেখে—
যাকে এত শক্ত ভেবেছিল,
সে আসলে খুব সাধারণ একজন মানুষ।
তারও ভয় করে, তারও বুক কাঁপে,
সেও ভিড়ের ভেতর হঠাৎ একা হয়ে যায়।
জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর হয় না।
হওয়ার কথাও নয়।
আমরা শুধু হেঁটে যাই।
কখনও বুঝে, কখনও না বুঝে।
কখনও সাহস নিয়ে, কখনও কেবল অভ্যাসে।
তারপরও কোথাও একটা বিশ্বাস থেকে যায়।
বড় কিছু নয়।
ছোট্ট একটা বিশ্বাস—সব হারিয়ে গেলেও,
সবটা হারায় না।
আমি আজও সেইটুকুই খুঁজি।
বিষের মতো দিনগুলোর ভেতর এক ফোঁটা স্বস্তি।
দীর্ঘ অন্ধকারের বুকের ওপর একটুখানি আলোর দাগ।
যার জন্য আরও একটা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায়।
তার নাম অমৃত কি না, জানি না।
হয়তো তার নাম কেবল— বেঁচে থাকা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।