বাবার শেষ দিনগুলোর স্মৃতি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
স্মৃতিচারণ। এপ্রিল ২৭,২০২৬
আমরা প্রায়ই ভাবি সময় আমাদের হাতে। দিনগুলোকে আমরা ব্যবহার করি, পরিকল্পনা করি, সামনে এগিয়ে নিয়ে যাই। কিন্তু কিছু কিছু সময় আসে যখন এই ধারণাটা ভেঙে পড়ে। তখন মনে হয়, আমরা সময়কে চালাচ্ছি না—সময়ই আমাদের ভেতর দিয়ে নিজের কাজটা করিয়ে নিচ্ছে।
২০২২ সালের ২২ অক্টোবর, দিনটা এমনই ছিল কি না, এখন আর নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। শুধু মনে পড়ে, সন্ধ্যার দিকে খবরটা এল—বাবার জ্বর বেশ বেশি।
আমি যখন তার কাছে পৌঁছাই, তিনি গেস্ট রুমের ছোট খাটটায় শুয়ে ছিলেন। কপালে হাত রাখতেই টের পেলাম অস্বাভাবিক তাপ, যেন শরীরের ভেতর থেকে কোনো চাপা আগুন উঠছে। হাত-পায়ে ব্যথা বললেন, শরীর ভেঙে যাচ্ছে—তবুও কথাবার্তায় একটা চেষ্টা ছিল স্বাভাবিক থাকার। এই ব্যাপারটা তার মধ্যে আগে থেকেই ছিল; নিজের অস্বস্তিকে অন্যদের সামনে খুব বেশি জায়গা দিতেন না।
রাত ৮টার দিকে রক্ত নেওয়া হলো। ঘরের ভেতর তখন আলো-আধো ছায়া, আর একটা অদ্ভুত স্থিরতা। ১০টার দিকে বাবা উঠে বসলেন। আমাকে দেখে হাসলেন, খুব জোরালো না, আবার একেবারে অনিচ্ছাকৃতও না—মাঝামাঝি একটা অভিব্যক্তি।
ডাক্তার এসে বললেন হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার। কিন্তু বাবা যেতে রাজি হলেন না। আমরা ভেবেছিলাম, সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায়। এখন মনে হয়, সেই ভেবে নেওয়াটাই পরে দীর্ঘ একটা অনিশ্চয়তার শুরু।
রাত ১১টার দিকে বাসায় ফিরলাম। ঘুম আসেনি। চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু মাথার ভেতর একটা অস্বস্তি ঘুরছিল। ফজরের পর অল্প সময়ের জন্য ঘুম, তারপর আবার বেরিয়ে পড়া।
সকালে গিয়ে দেখি পরিস্থিতি বদলে গেছে। বাবা অস্থির, জ্বরের ঘোরে স্যালাইন খুলে ফেলছেন। কথাবার্তাও ঠিক নেই। এর মধ্যেই রিপোর্ট এলো—ডেঙ্গু, এবং হার্ট অ্যাটাকের স্পষ্ট ইঙ্গিত। ওই মুহূর্তে বোঝা গেল, বিষয়টা আর অপেক্ষার মধ্যে নেই।
দুপুর ২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্স এলো। হুইলচেয়ারে বসিয়ে চারজন মিলে তাকে সাত তলা থেকে নামানো হলো। সিঁড়ির ভেতর ধাতব শব্দ, পায়ের টান, আর মাঝে মাঝে থেমে যাওয়া শ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে দৃশ্যটা এখন মনে করলে ভারী লাগে। তখন অবশ্য আমরা শুধু নামানোর কাজেই ব্যস্ত ছিলাম।
সরকারি হাসপাতালে গিয়ে খুব দ্রুতই বোঝা গেল, সময় এখানে আমাদের পক্ষে নেই। ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না, সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। আমরা আবার বের হলাম।
এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল। আইসিইউ বেড খোঁজার এই দৌড়টা খুব অদ্ভুত—বাইরে শহর চলছে, ভেতরে আমাদের সময় ছোট হয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত এক পরিচিত মানুষের সহায়তায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে জায়গা পাওয়া গেল।
চিকিৎসা শুরু হলো। পরদিন জানানো হলো প্লাটিলেট কমে গেছে, প্লাজমা দিতে হবে। ডোনারের ব্যবস্থা, পরীক্ষা—সবকিছু দ্রুত চলছিল। কিছুটা উন্নতিও দেখা গেল। আইসিইউ থেকে কেবিনে আনা হলো তাকে। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো পরিস্থিতি একটু স্থির হচ্ছে। কিন্তু জ্বরটা স্থির হয়নি।
২৪ তারিখে সামান্য উন্নতি ছিল। ২৫ তারিখে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, বাসার কাছের হাসপাতালে নেওয়া হবে। এখন মনে হয়, এটা খুব সরল একটা সিদ্ধান্ত ছিল, যেটার পেছনে আমাদের ক্লান্তি কাজ করছিল বেশি, যুক্তি নয়।
খিদমা হাসপাতালে নেওয়ার পর দিনটা মোটামুটি কেটে গেল। কিন্তু রাতে আবার জ্বর ফিরে এলো। ২৬ তারিখ সকালেও তেমন পরিবর্তন নেই।
সেদিন দুপুরে আমি একা তার পাশে ছিলাম। তিনি বললেন, “মাথাটা একটু টিপে দে।” আমি টিপে দিচ্ছিলাম। হঠাৎ বললেন, “ডান হাত দিয়ে কর… তোর বাম হাতে ব্যথা।”
এই কথাটা তখন খুব ছোট মনে হয়নি। এখন মনে হয়, ওই সময়টায় তিনি নিজের কষ্টের ভেতর থেকেও আমার খুঁটিনাটি মনে রাখছিলেন।
এরপর ছোট ভাই এলে আমি মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে বের হই। কিছুক্ষণ পরই ফোন—বাবার অবস্থা খারাপ।
আমি আবার হাসপাতালে যাই। গিয়ে দেখি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, জ্বর বেড়েছে। ডাক্তার দ্রুত আইসিইউতে নিতে বললেন।
আবার অ্যাম্বুলেন্স। আবার খোঁজ। মুগদা হাসপাতালে বেড পাওয়া যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর একটা ব্যবস্থা হলো।
চিকিৎসা শুরু হলেও ডাক্তার জানালেন, দেরি হয়ে গেছে। শরীরের কয়েকটা অঙ্গ ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত।
আইসিইউর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভেতর থেকে মেশিনের একটানা শব্দ আসছিল—নিয়মিত, কিন্তু জীবনের সাথে পুরোপুরি অমিল। ভেতরে গিয়ে দেখি বাবা আমার হাত ধরে আছেন, মাঝে মাঝে পানি চাইছেন।
এই মুহূর্তগুলো তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। পরে এসে মনে হয়, এটাই শেষ সাধারণ মুহূর্ত ছিল।
রাত ১টার দিকে বাসায় ফিরলাম। সকালে খবর এলো—লাইফ সাপোর্ট লাগাতে হবে। আমি অনুমতি দিলাম।
হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম, শরীরটা প্রায় নিস্তব্ধ। তখন দাঁড়িয়ে থাকাটাই কঠিন লাগছিল, কারণ বুঝতে পারছিলাম—এটা আর চিকিৎসার পর্যায় নয়, সময়ের শেষ পর্যায়।
দুপুরে বাসায় ফিরলাম। মেয়েকে পরীক্ষার হলে নিয়ে যেতে হবে। জীবন নিজের নিয়মে চলছিল, অথচ ভেতরে সবকিছু অন্যভাবে ভেঙে পড়ছিল।
বিকেলে খবর এলো—অবস্থা ভালো না। সন্ধ্যার আগে বলা হলো বাসায় থাকতে।
তারপর আর সময়টা খুব স্পষ্ট মনে নেই। শুধু মনে আছে, সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফোন এলো—বাবাকে নিয়ে আসা হচ্ছে।
৭টা ৩০ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স এসে থামলো।
নিচে নেমে দেখলাম, তিনি শুয়ে আছেন। মুখে কোনো কষ্ট নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ঘুমিয়ে আছেন।
কিন্তু ঘুম আর জেগে থাকা—এই পার্থক্যটা তখন আর কোনো অর্থ রাখেনি।
শুধু একটা জিনিস পরিষ্কার ছিল—সময় এগিয়ে গেছে, আর তিনি আর তার সাথে নেই।
চোখের সামনে বাবা।
শুধু নেই তার ভেতরের প্রাণ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।