উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-১ -জলছায়ার ঠিকানা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
নদীই তাদের ঠিকানা, অথচ কোনো মানচিত্রে সেই বাড়ির নাম লেখা থাকে না।
ভোরের মেটে আলো তখনও ভালো করে ফোটেনি। পদ্মার শাখা নদীটার পাড়ে এসে যখন দাঁড়ালাম, চারদিক এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। হালকা কুয়াশার চাদর সরতেই চোখে পড়ল নদীর বুকে সার বেঁধে নোঙর করে রাখা এক ঝাঁক কাঠের নৌকা। কোনোটার মাথায় বাঁশের ছই, কোনোটা আবার প্লাস্টিক আর ছেঁড়া ত্রিপলে ঢাকা। এটাই বেদে বহর — জলের ওপর ভেসে থাকা এক অন্য জগৎ।
কাদা মাড়িয়ে ঘাটের কাছে যেতেই চোখে পড়ল এক অন্য রকম ব্যস্ততা। শহরের মানুষ যখন নরম বিছানায় শেষ ঘুমের ওমে জড়িয়ে আছে, তখন নদীর বুক ঘেঁষে এই মানুষগুলো জীবনের লড়াই শুরু করে দিয়েছে। কাঠের নৌকার খোলে পিটপিট করে জ্বলছে ছোট্ট মাটির উনুন। শুকনো ডালপালা আর তুষের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে আছে বাতাস। তার মধ্যেই ভেসে আসছে ফুটন্ত ভাতের মিষ্টি গন্ধ। এক কিশোরী এক হাতে নৌকার গলুই ধরে অন্য হাতে অবলীলায় হাঁড়ি থেকে ফ্যান গালছে। তার চলাফেরায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, আছে শুধু দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
এখানে নৌকাতেই রান্না, নৌকাতেই ঘুম, নৌকাতেই সংসার। সবটুকু জীবন এক চিলতে কাঠের কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে।
পাশের বড় ছইওয়ালা নৌকা থেকে বেরিয়ে এলেন কাশফুলের মতো সাদা চুল-দাড়ির এক বৃদ্ধ। নাম কাসেম বহরদার। মুখে বয়সের অজস্র ভাঁজ, কিন্তু চোখ দুটো নদীর জলের মতোই গভীর আর শান্ত।
আমার হাতে এক কাপ গরম চা ধরিয়ে দিয়ে হেসে বললেন, "কী দেখো বাপু? আমাদের ঘরবাড়ি দেখো? ওই যে নীল আকাশ আর নিচে বয়ে যাওয়া জল — এই তো আমাদের চাদর আর তোশক। ডাঙার মানুষ মাটি আঁকড়ে বাঁচতে চায়, আর আমরা বাঁচি জলের দয়ায়।"
কথা বলতে বলতেই কুয়াশা কেটে গিয়ে রোদ এসে পড়ল নদীর জলে। সোনালি আলোয় মুহূর্তে বদলে গেল চারপাশের রূপ। ছইয়ের ওপর শুকোতে দেওয়া রঙিন শাড়ি আর লুঙ্গিগুলো হাওয়ায় দুলছে। পাশেই একদল ছোট ছেলেমেয়ে টলটলে জলে হাত-পা ছুড়ে সাঁতার কাটছে। মনে হলো, জলই তাদের আশ্রয়। এখানেই তাদের জন্ম, এখানেই তাদের বেড়ে ওঠা।
এই বহরের মানুষগুলোর সঙ্গে নদীর সম্পর্কটা শুধু জীবিকার নয়, এক গভীর আত্মার টান। জল কখন রং বদলায়, নদীতে কখন টান ধরে, মেঘের রং দেখে কখন ঝড় আসবে — এসব বুঝতে তাদের কোনো যন্ত্র লাগে না। নদীর স্পন্দন তারা বুকের ভেতরেই টের পায়। নদীর জল শুকিয়ে গেলে তাদের জীবনের গতিও থমকে যায়, নদী শান্ত থাকলে তাদের মুখেও ফোটে নিশ্চিন্ত হাসি।
তবে এই ভেসে থাকা জীবনেও মেঘের মতো জমাট বেঁধে থাকে কষ্ট। কাসেম বহরদারের কথায় সেই কষ্টের কথাই উঠে এল। আধুনিক সময়ের ছোঁয়ায় বেদেদের সেই পুরোনো শিকড়-বাকড়, তাবিজ বিক্রি বা সাপ খেলার কদর এখন আর আগের মতো নেই। গ্রাম-শহরের মানুষ এখন তাদের এড়িয়ে চলে। তাই দিন এনে দিন খাওয়া এই মানুষগুলোর সংসার চালানোই এখন বড় কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থায়ী ঠিকানা না থাকলেও এদের বুকে স্বপ্নের কোনো কমতি নেই। ভাঙা নৌকার ছইয়ের নিচে বসে যে শিশুটি ডাঙা থেকে ভেসে আসা স্কুলের ঘণ্টা শোনে, তার চোখেও এক সুন্দর ভবিষ্যতের ছবি ভাসে। সে হয়তো আর সাপ নিয়ে খেলবে না, রঙিন কাগজের বই হাতে কোনো এক সকালে স্কুলে যাবে। কাসেম বহরদারের ছেলে রহমত যেমন বলছিল, "আমরা না হয় জলেই জীবন কাটাইয়া দিলাম, কিন্তু আমাদের পোলাপানগো তো একটা ডাঙার ঘর দরকার। এক জায়গায় থাইকা অন্তত একটা ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ তো ওরা পাইতে পারে।"
এই অনিশ্চিত জল-জীবনের মাঝেও তাদের উৎসব আছে, আছে নিজেদের মতো আনন্দ-বেদনার গল্প। সকাল গড়িয়ে দুপুর হওয়ার আগেই বহরের তরুণেরা জাল গুটিয়ে তৈরি হয়ে নেয়, মেয়েরা সাজিয়ে নেয় শিকড় আর পুঁতির মালার ডালা। জীবিকার টানে তারা ছড়িয়ে পড়ে কাছের গ্রামগুলোতে। আবার গোধূলি নামলে সবাই ফিরে আসে এই একই ঘাটে, একসঙ্গে বসে নৌকার ছইয়ের ওপর, উনুনে ফুটতে থাকে রাতের ভাত।
বেলা বাড়ে। নদীর জল রোদে ঝিকমিক করে। তীরে দাঁড়িয়ে বিদায় নেওয়ার সময় হঠাৎ মনে হলো, আমরা যারা ইটের খাঁচায় স্থায়ী ঠিকানার খোঁজে সারা জীবন দৌড়ে বেড়াই, তারা হয়তো শান্তির আসল মানেটাই বুঝি না। বেদেদের কোনো মানচিত্র নেই, জমির দলিল নেই, কিন্তু বিশাল নদীর মতো উদার একটা বুক আছে তাদের। সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে শুধু স্রোতের মতো বাঁধভাঙা বেঁচে থাকার আনন্দ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।