হারিয়ে যাওয়া গ্রামের গল্প
হারিয়ে যাওয়া গ্রামের গল্প
দাদুর মুখের গল্প
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০২ আগষ্ট, ২০২৬
একটা সময় রাতের খাবার শেষ হলেই গল্পের আসর বসত। এখন সেই সময়টুকু অনেক বাড়িতেই কেটে যায় মোবাইলের পর্দার সামনে।
ছোটবেলায় রাতের খাবার শেষ হওয়া মানেই ছিল অপেক্ষার শুরু। দাদু একটু গলা খাঁকারি দিতেন, আর আমরা গোল হয়ে বসে পড়তাম। কখনো মাটির ঘরের বারান্দায়, কখনো উঠোনে মাদুর পেতে, আবার শীতের রাতে আগুন পোহাতে পোহাতে। একবার শুরু হলে ঘুমের কথাও আর মনে থাকত না।
সেই গল্পের ভেতরে কী ছিল না! রাজা-রানী ছিল, রাক্ষস ছিল, বুদ্ধিমান কৃষক ছিল, অলস ছেলের কাহিনি ছিল। আবার এমন অনেক ঘটনা ছিল, যেগুলো দাদুর ভাষায় তাঁর নিজের চোখে দেখা। তখন সত্যি না কল্পনা—সেটা জানার আগ্রহ ছিল না। আমরা শুধু শুনতাম। আর শুনতে শুনতেই যেন অন্য এক জগতে পৌঁছে যেতাম।
পরে বুঝেছি, সেসব শুধু বিনোদনের জন্য বলা হতো না। অজান্তেই সেখানে মিশে থাকত জীবনের শিক্ষা। সততা, সাহস, দয়া, মানুষের প্রতি মমতা—এসব কেউ আলাদা করে শেখাতেন না। গল্প শেষ হতো, কিন্তু তার ভেতরের কথাগুলো অনেক দিন মনে থেকে যেত।
দাদুর গল্প বলার ভঙ্গিটাও ছিল আলাদা। কখনো গলার স্বর বদলে ফেলতেন, কখনো ইচ্ছে করে একটু থেমে যেতেন। আর আমরা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, “তারপর?” সেই একটি শব্দই যেন পুরো আসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত।
আজ সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। রাতের খাবার শেষ হতেই সবাই যেন আলাদা হয়ে যায়। কেউ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত, কেউ টেলিভিশনের সামনে, কেউ আবার হেডফোন কানে নিজের জগতে ডুবে থাকে। একই বাড়িতে থেকেও একসঙ্গে বসে কথা বলার সময় ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
তবে এর জন্য শুধু প্রযুক্তিকে দায়ী করলে পুরো ছবিটা দেখা হবে না। যৌথ পরিবার অনেকটাই ভেঙে গেছে। কাজ, পড়াশোনা আর জীবিকার টানে পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়েছেন। অনেক শিশুরই দাদা-দাদী বা নানা-নানীর সঙ্গে বড় হওয়ার সুযোগ হয় না। ফলে গল্প শোনার সেই স্বাভাবিক পরিবেশটিও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
এর প্রভাব শুধু একটি অভ্যাস হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুখে মুখে বলা গল্প মানুষের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে, মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখায়, অন্যের অভিজ্ঞতা বোঝার ক্ষমতা বাড়ায়। তথ্য আমাদের অনেক কিছু জানায়, কিন্তু মানুষের জীবনের গভীরতা প্রায়ই জানা যায় তার বলা গল্পের মধ্য দিয়ে।
আমাদের লোককথা, রূপকথা আর গ্রামবাংলার মুখে মুখে বেঁচে থাকা কাহিনিগুলো ছিল একেকটি জীবন্ত ঐতিহ্য। সেগুলোর অনেকই কখনো বইয়ে লেখা হয়নি। একজনের মুখ থেকে আরেকজনের কাছে পৌঁছেই তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে ছিল। সেই ধারাবাহিকতা থেমে গেলে গল্পের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও একটি বড় অংশ।
তবু এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার সুযোগ এখনো আছে।
প্রথমত, পরিবারের প্রবীণদের পাশে বসার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁদের বলতে হবে, “আপনার ছোটবেলার কোনো ঘটনা বলুন।” অনেক সময় একটি প্রশ্নই বহু দিনের জমে থাকা স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।
দ্বিতীয়ত, সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারের সবাই কিছু সময় একসঙ্গে কাটাতে পারে। সেই সময়টুকু মোবাইল থেকে দূরে রেখে শুধু গল্প করা, স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া কিংবা শিশুদের কথা শোনাই যথেষ্ট।
তৃতীয়ত, প্রবীণদের মুখে শোনা গল্পগুলো লিখে রাখা বা রেকর্ড করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। আজ যে কণ্ঠটি আমরা শুনছি, হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে সেটিই হয়ে উঠবে পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার।
হয়তো আগের সেই রাতগুলো আর পুরোপুরি ফিরে আসবে না। কিন্তু যদি কোনো এক সন্ধ্যায় একটি পরিবার আবার একসঙ্গে বসে, একজন গল্প বলেন আর বাকিরা মন দিয়ে শোনে, তাহলে সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের একটি অংশ অন্তত ফিরে আসবে।
আজও কোনো প্রবীণ মানুষকে শিশুদের ঘিরে গল্প বলতে দেখলে মনে হয়, তিনি শুধু একটি কাহিনি শুনিয়ে যাচ্ছেন না; তিনি সময়, স্মৃতি আর সংস্কৃতির একটি অমূল্য সেতু পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সেই সেতু অটুট থাকলেই আমাদের শিকড়ও বেঁচে থাকবে।
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০২ আগষ্ট, ২০২৬
একটা সময় রাতের খাবার শেষ হলেই গল্পের আসর বসত। এখন সেই সময়টুকু অনেক বাড়িতেই কেটে যায় মোবাইলের পর্দার সামনে।
ছোটবেলায় রাতের খাবার শেষ হওয়া মানেই ছিল অপেক্ষার শুরু। দাদু একটু গলা খাঁকারি দিতেন, আর আমরা গোল হয়ে বসে পড়তাম। কখনো মাটির ঘরের বারান্দায়, কখনো উঠোনে মাদুর পেতে, আবার শীতের রাতে আগুন পোহাতে পোহাতে। একবার শুরু হলে ঘুমের কথাও আর মনে থাকত না।
সেই গল্পের ভেতরে কী ছিল না! রাজা-রানী ছিল, রাক্ষস ছিল, বুদ্ধিমান কৃষক ছিল, অলস ছেলের কাহিনি ছিল। আবার এমন অনেক ঘটনা ছিল, যেগুলো দাদুর ভাষায় তাঁর নিজের চোখে দেখা। তখন সত্যি না কল্পনা—সেটা জানার আগ্রহ ছিল না। আমরা শুধু শুনতাম। আর শুনতে শুনতেই যেন অন্য এক জগতে পৌঁছে যেতাম।
পরে বুঝেছি, সেসব শুধু বিনোদনের জন্য বলা হতো না। অজান্তেই সেখানে মিশে থাকত জীবনের শিক্ষা। সততা, সাহস, দয়া, মানুষের প্রতি মমতা—এসব কেউ আলাদা করে শেখাতেন না। গল্প শেষ হতো, কিন্তু তার ভেতরের কথাগুলো অনেক দিন মনে থেকে যেত।
দাদুর গল্প বলার ভঙ্গিটাও ছিল আলাদা। কখনো গলার স্বর বদলে ফেলতেন, কখনো ইচ্ছে করে একটু থেমে যেতেন। আর আমরা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, “তারপর?” সেই একটি শব্দই যেন পুরো আসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত।
আজ সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। রাতের খাবার শেষ হতেই সবাই যেন আলাদা হয়ে যায়। কেউ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত, কেউ টেলিভিশনের সামনে, কেউ আবার হেডফোন কানে নিজের জগতে ডুবে থাকে। একই বাড়িতে থেকেও একসঙ্গে বসে কথা বলার সময় ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
তবে এর জন্য শুধু প্রযুক্তিকে দায়ী করলে পুরো ছবিটা দেখা হবে না। যৌথ পরিবার অনেকটাই ভেঙে গেছে। কাজ, পড়াশোনা আর জীবিকার টানে পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়েছেন। অনেক শিশুরই দাদা-দাদী বা নানা-নানীর সঙ্গে বড় হওয়ার সুযোগ হয় না। ফলে গল্প শোনার সেই স্বাভাবিক পরিবেশটিও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
এর প্রভাব শুধু একটি অভ্যাস হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুখে মুখে বলা গল্প মানুষের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে, মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখায়, অন্যের অভিজ্ঞতা বোঝার ক্ষমতা বাড়ায়। তথ্য আমাদের অনেক কিছু জানায়, কিন্তু মানুষের জীবনের গভীরতা প্রায়ই জানা যায় তার বলা গল্পের মধ্য দিয়ে।
আমাদের লোককথা, রূপকথা আর গ্রামবাংলার মুখে মুখে বেঁচে থাকা কাহিনিগুলো ছিল একেকটি জীবন্ত ঐতিহ্য। সেগুলোর অনেকই কখনো বইয়ে লেখা হয়নি। একজনের মুখ থেকে আরেকজনের কাছে পৌঁছেই তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে ছিল। সেই ধারাবাহিকতা থেমে গেলে গল্পের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও একটি বড় অংশ।
তবু এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার সুযোগ এখনো আছে।
প্রথমত, পরিবারের প্রবীণদের পাশে বসার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁদের বলতে হবে, “আপনার ছোটবেলার কোনো ঘটনা বলুন।” অনেক সময় একটি প্রশ্নই বহু দিনের জমে থাকা স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।
দ্বিতীয়ত, সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারের সবাই কিছু সময় একসঙ্গে কাটাতে পারে। সেই সময়টুকু মোবাইল থেকে দূরে রেখে শুধু গল্প করা, স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া কিংবা শিশুদের কথা শোনাই যথেষ্ট।
তৃতীয়ত, প্রবীণদের মুখে শোনা গল্পগুলো লিখে রাখা বা রেকর্ড করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। আজ যে কণ্ঠটি আমরা শুনছি, হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে সেটিই হয়ে উঠবে পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার।
হয়তো আগের সেই রাতগুলো আর পুরোপুরি ফিরে আসবে না। কিন্তু যদি কোনো এক সন্ধ্যায় একটি পরিবার আবার একসঙ্গে বসে, একজন গল্প বলেন আর বাকিরা মন দিয়ে শোনে, তাহলে সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের একটি অংশ অন্তত ফিরে আসবে।
আজও কোনো প্রবীণ মানুষকে শিশুদের ঘিরে গল্প বলতে দেখলে মনে হয়, তিনি শুধু একটি কাহিনি শুনিয়ে যাচ্ছেন না; তিনি সময়, স্মৃতি আর সংস্কৃতির একটি অমূল্য সেতু পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সেই সেতু অটুট থাকলেই আমাদের শিকড়ও বেঁচে থাকবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।