ছায়ার প্রাসাদ
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরনঃ ভৌতিক গল্প
তারিখঃ ২৯ অক্টোবর ২০২৫
সিলেটের পাহাড়ি শহরটা যেন মেঘের আঁচলে মোড়া এক নিঃশব্দ কবিতা।
চা-বাগানের সবুজের ফাঁক গলে চলে গেছে সরু কাঁচা রাস্তা,
যেখানে কুয়াশা এসে জড়িয়ে ধরে তালগাছের ডাল,
আর বাতাসে ভেসে থাকে অপরিচিত এক ফুলের গন্ধ—
যেন হারিয়ে যাওয়া কারও চুলের গন্ধ ফিরে আসে বাতাসে।
সেই পথের শেষে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন প্রাসাদ—
লোকমুখে যার নাম ছায়ার প্রাসাদ।
দুইশো বছরের পুরনো, লাল ইটের দেয়াল জুড়ে শ্যাওলা,
ছাদের অর্ধেক ভেঙে পড়েছে,
জানালার কাঁচে মাকড়সার জাল,
আর সিঁড়ির ধারে সময়ের পায়ের ছাপ।
রাতে নাকি ভেতর থেকে আলো জ্বলে ওঠে।
কেউ বলে—ওখানে আত্মারা বাস করে,
কেউ বলে—ওটা ভালোবাসার কারাগার।
শুধু বাতাস জানে, কোন গল্পটা সত্যি।
ঢাকা থেকে বদলি হয়ে সিলেটে এসেছে অভিক।
সরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক।
চল্লিশের কাছাকাছি বয়স—চোখের নিচে ক্লান্তির ছায়া,
আর মুখে এমন এক নিরবতা,
যা কথার চেয়েও ভারী।
অফিসের প্রথমদিনেই সহকর্মী সুরজ তাকে বলেছিল—
“স্যার, ওই কোয়ার্টারে একা থাকবেন না।
রাতের পর কেউ ওই দিকটায় যায় না।”
অভিক মৃদু হাসল।
“ভয় পাই না, সুরজ। ভয় তো তখনই আসে, যখন মানুষ কিছু হারায়।”
সুরজ চুপ করে গেল।
তার মনে হলো—এই মানুষটার ভেতরে কিছু একটার অভাব আছে,
যা সে এখনো বুঝতে পারেনি।
তৃতীয় রাতে, হঠাৎ কুয়াশার ভেতর,
অভিক দেখল অচেনা এক দৃশ্য।
প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী—
লম্বা চুল, সাদা পোশাক, চোখে নীলচে আলো।
বাতাসে তার চুল উড়ছে, ঠোঁট নড়ছে যেন ডাকছে—
“অভিক…”
অভিক থমকে গেল।
নামটা স্পষ্ট শুনতে পেল সে—
ঠিক সেই কণ্ঠে,
যে কণ্ঠ শেষবার শুনেছিল বিশ বছর আগে।
নিশি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রেম।
যে মেয়েটিকে এক বিকেলে হারিয়ে ফেলেছিল—
যে এক বিদেশযাত্রার পর আর কখনো ফিরে আসেনি।
বছরখানেক পর জানা যায়,
সে আত্মহত্যা করেছে।
অভিক ভেবেছিল গল্পটা শেষ।
কিন্তু কিছু গল্প শেষ হয় না,
তারা শুধু সময়ের অন্য পাশে গিয়ে বাঁচে।
পরের সন্ধ্যায়, প্রাসাদের গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় অভিক।
ভেতরটা কুয়াশায় ঢাকা,
দরজার কাঠে পুরনো ধূপের গন্ধ,
যেন কেউ আজও এখানে পূজা দেয়।
বাতাস হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল।
পেছন থেকে মৃদু কণ্ঠ ভেসে এলো—
“তুমি এলেই না… আমি কতদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম।”
অভিক ঘুরে দাঁড়াল।
নিশি।
ঠিক সেই মুখ, সেই হাসি,
তবে চোখে এক অদ্ভুত আলোকরেখা—
যেন সময় সেখানে থেমে গেছে।
“তুমি বেঁচে আছো?” অভিক ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
নিশি হেসে বলল,
“মৃত্যু কেবল শরীরকে নেয়, অভিক…
ভালোবাসাকে নয়।”
সে অভিকের হাত ধরে ভেতরে টেনে নিল।
ভেতরটা যেন অন্য এক জগত—
দেয়ালে ঝুলছে পুরনো পেইন্টিং,
মেঝেতে ভাঙা পিয়ানো,
আর কোণের টেবিলে আধভাঙা চায়ের কাপ।
নিশি পিয়ানোতে বসে বাজাতে শুরু করল তাদের প্রিয় সুর—
“তুমি এলেই না…”
অভিকের চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
তার হাত ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
“তুমি আমার সঙ্গে থাকো,” নিশি বলল,
“এই প্রাসাদে কেউ মরেনি, অভিক…
সবাই শুধু সময়ের মধ্যে থেমে আছে।”
অভিক জানে, এই মায়া বিপজ্জনক—
তবু এই মায়ার বাইরেও কিছু নেই তার কাছে।
পরদিন সকালে অফিসে গুজব ছড়িয়ে পড়ল—
ম্যানেজার সাহেব নাকি রাতে প্রাসাদে গেছেন।
কেউ বলল—তার ছায়া দেখা গেছে জানালায়,
কেউ বলল—সেখানে পিয়ানোর শব্দ শোনা গেছে।
সুরজ দৌড়ে গেল স্থানীয় তান্ত্রিক মদন সেন-এর কাছে।
মদন সেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওই প্রাসাদে এক আত্মা বন্দী আছে।
সে প্রেমে পড়েছিল, কিন্তু সেই প্রেম অসম্পূর্ণ ছিল।
এখন সে অপেক্ষা করে—
যে তাকে ভালোবেসেছিল, তার ফেরার জন্য।”
সেই রাতে, সুরজ ও মদন সেন
অভিকের কোয়ার্টারে গিয়ে দরজা ঠেলে ঢুকল।
ভেতরটা ফাঁকা।
দূরে পাহাড়ের দিক থেকে পিয়ানোর সুর ভেসে আসছে।
সুরজের বুক কেঁপে উঠল।
তারা ছুটে গেল প্রাসাদের দিকে।
ভেতরে ঢুকেই দেখল—
অভিক বসে আছে পিয়ানোর পাশে,
নিশির হাত ধরে।
দু’জনের মুখে শান্ত হাসি, চোখ বন্ধ।
কিন্তু চারপাশে ঘুরছে ধোঁয়া, ছায়া, আর গা ছমছমে গন্ধ।
মদন সেন ধূপ জ্বালিয়ে মন্ত্র জপ শুরু করল—
“ওম ভৈরবং রক্ষ, প্রেতমোক্ষায় হ্রীং…”
নিশির চোখ লাল হয়ে উঠল।
সে চিৎকার করে উঠল,
“ওরা আমাকে তোমার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল!
এবার আমি কাউকে যেতে দেব না!”
অভিক ছুটে গেল তার দিকে।
তান্ত্রিক ধূপের ছাই ছুড়ে দিল আগুনের মতো।
এক মুহূর্তে কুয়াশা ঘনিয়ে গেল—
আর নিশির ছায়া মিলিয়ে গেল ধোঁয়ার সঙ্গে।
অভিক নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
ভোরের আলোয় চোখ খুলল তার।
হাসপাতালের বিছানায়, পাশে সুরজ।
সবকিছু যেন কুয়াশায় ঢাকা স্মৃতি।
“স্যার,” সুরজ বলল,
“আপনি ওই প্রাসাদে একা গিয়েছিলেন।
ভেতরে কিছুই ছিল না—শুধু ঠান্ডা হাওয়া,
আর এক ভাঙা পিয়ানো।”
অভিক জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
দূরে পাহাড়ের কিনারে, কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে।
চুল উড়ছে বাতাসে।
তার ঠোঁটে হালকা হাসি।
বাতাসে ভেসে এল সেই পরিচিত সুর—
“তুমি এলেই না…”
অভিকের চোখ ভিজে গেল।
চুপচাপ বলল,
“ভালোবাসা মরে না, সুরজ…
শুধু তার ঠিকানা বদলায়।”
দু’মাস পর নতুন ম্যানেজার এল।
প্রথম রাতেই জানালার পাশে পিয়ানোর সুর শুনে থমকে গেল।
ধোঁয়ার ভেতর দেখা গেল দুইটা ছায়া—
এক পুরুষ, এক নারী—
চুপচাপ বসে আছে পাশাপাশি।
বাতাসে আবার সেই কণ্ঠ—
“এবার কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না…”
#ছায়ারপ্রাসাদ #ভৌতিকগল্প #মনস্তাত্ত্বিকভয়
#অপূর্ণভালোবাসা #নিশিএবংঅভিক #রহস্যওরোমাঞ্চ #বাংলাগল্প
#ভালোবাসারআত্মা #পিয়ানোরসুর
#সিলেটেরছায়া #মোহাম্মদজাহিদহোসেন #enolej_idea
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।