নীরব মানুষটার শেষ সীমা
পর্ব–২ : ভালোবাসা নয়, নিয়ন্ত্রণ
একটি ধারাবাহিক গল্প
লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১০ জুলাই, ২০২৬
“আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”
নিশি কথাটা প্রায়ই বলত।
শুরুর দিকে অভিকের ভালোই লাগত।
তার মনে হতো, মানুষটা তাকে এতটা ভাবে বলেই সবকিছু নিয়ে মাথা ঘামায়।
কিন্তু কখন যে খেয়াল রাখা আর নিয়ন্ত্রণ করার মাঝের দাগটা মুছে গেল, সেটা সে নিজেও টের পায়নি।
একদিন অফিসে যাওয়ার আগে নীল শার্টটা বের করেছিল।
নিশি আলমারি খুলে আবার রেখে দিল।
“এটা না। সাদা শার্টটা পরো। তোমাকে ওটাই মানায়।”
অভিক একবার শার্টটার দিকে তাকাল।
তারপর কিছু না বলেই সাদা শার্টটা পরে নিল।
কয়েক দিন পর রাকিব ফোন করল।
“দোস্ত, একদিনের জন্য চল। সবাই মিলে বসব। কত দিন দেখা নেই।”
অভিক বলল,
“দেখি...”
ফোন রেখে নিশিকে কথাটা বলতেই সে হেসে বলল,
“সংসার করার পরও বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানোর এত শখ?”
অভিক আর কিছু বলল না।
রাকিবকে শুধু লিখল,
“এইবারও হলো না।”
এরপর টাকার ব্যাপারেও একই অবস্থা।
বেতন পেলেই পুরো টাকাটা নিশির হাতে দিত। এটা নিয়ে তার কোনো সমস্যা ছিল না।
সমস্যা শুরু হলো, যখন নিজের জন্য সামান্য কিছু কিনতেও পারমিশন চাইতে হতো।
একদিন বলল,
“পাঁচশো টাকা লাগবে। একটা বই কিনব।”
নিশি তাকিয়ে বলল,
“এত বই পড়ে কী হবে? দরকার আছে?”
অভিক একটু চুপ করে থেকে বলল,
“থাক... লাগবে না।”
সেদিন বইটা আর কেনা হয়নি।
তারপর থেকে চাইতেও ইচ্ছে করত না।
একদিন অফিসে একজন কলিগ মজা করে বলল,
“ভাই, নিজের জন্য কিছু কেনেন না নাকি?”
অভিক হেসে বলেছিল,
“অভ্যাস নেই।”
বাইরে থেকে শুনলে কথাটা খুব সাধারণ।
কিন্তু সে জানত, এটা অভ্যাস না।
আস্তে আস্তে নিজের ইচ্ছেগুলো ভুলে যাওয়ার নাম।
নিশি কখনো ভাবেনি সে ভুল করছে।
সে সত্যিই বিশ্বাস করত, এভাবেই সংসার টিকে থাকে।
তার কাছে ভালো স্বামী মানে এমন একজন, যে স্ত্রীকে না জানিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না।
কিন্তু কবে যে “জানানো” বদলে “অনুমতি নেওয়া” হয়ে গেল...
সেটা কেউ খেয়াল করেনি।
অভিকও না।
একসময় সে প্রশ্ন করাই ছেড়ে দিল।
কোন শার্ট পরবে...
কোথায় যাবে...
কার সাথে দেখা করবে...
কী কিনবে...
সবকিছুর উত্তর যেন আগেই ঠিক করা থাকত।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ মনে হলো,
“আমি কি এখনও নিজের মতো করে বাঁচছি?”
উত্তরটা সে সেদিনও পায়নি।
শুধু মনে হলো, আয়নায় যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে...
সে যেন আগের সেই অভিকটা আর নেই।
চলবে...
পাঠকের কাছে প্রশ্ন:
ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণের মাঝের লাইনটা ঠিক কোথায়? কখন "খেয়াল রাখা" বদলে "আটকে রাখা" হয়ে যায়? আপনার মতামত জানাতে পারেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।