নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-২
যত্নের নামে নয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৮, জুন, ২০২৬
বিয়ের আগে অভিককে নিয়ে সবার একটাই কথা ছিল—ছেলেটা খুব যত্নশীল। নিশিরও তাই মনে হয়েছিল। প্রথম কয়েক মাস যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল।
অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে অভিক ফোন করত, “কোথায়? ঠিক আছ তো?”
বৃষ্টি হলে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। নিশির পছন্দের খাবার মনে রাখত। রাতে ওষুধ খেয়েছে কি না, সেটাও জিজ্ঞেস করত। এসব দেখে নিশির মনে হতো, এমন মানুষই তো চেয়েছিল সে।
কিন্তু খুব ধীরে ধীরে কিছু বদলাতে শুরু করল। একদিন অভিককে তার ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকতে দেখে নিশি বলল, “আমার ফোন?”
অভিক স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,
“এমনিই দেখছিলাম। আমাদের মধ্যে আবার লুকানোর কী আছে?”
তখন কথাটা খারাপ লাগলেও তর্ক করেনি নিশি। তারপর এটা অভ্যাস হয়ে গেল।
কে ফোন করল, কার মেসেজ এল, কার সঙ্গে কতক্ষণ কথা হলো—সবই অভিক জানত। সে কখনো রাগ করে ফোন কেড়ে নিত না। শুধু এমনভাবে দেখত, যেন এটাই স্বাভাবিক।
একদিন কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার কথা উঠল। নিশি খুব উৎসাহ নিয়ে বলেছিল,
“অনেক দিন পর সবাই একসঙ্গে হব।”
অভিক একটু ভেবে বলল,
“ইচ্ছে হলে যাও। তবে সবাই আগের মতো থাকে না। দূরত্ব থাকাই ভালো।” সে নিষেধ করেনি। তবু নিশি গেল না। এরপর আরেকবার ডাক এল। তারপরও না। একসময় বন্ধুরা ডাকাই বন্ধ করে দিল।
আরও কিছু বদল এভাবেই হলো। কোন পোশাক পরবে, কোথায় যাবে, বাবার বাড়িতে কত দিন থাকবে, সামাজিক মাধ্যমে কী লিখবে—প্রতিটা সিদ্ধান্তের আগে নিশির মাথায় একটাই প্রশ্ন আসত,
“অভিক কী বলবে?”
এক সন্ধ্যায় নিশি বলল,
“ভাবছি আবার স্কুলে পড়ানো শুরু করি।”
অভিক শান্ত গলায় বলল,
“সংসার আর চাকরি একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে নিজেই কষ্ট পাবে। এখন না করাই ভালো।”
নিশি মাথা নেড়েছিল। আজ বুঝতে পারে, সেদিন সিদ্ধান্তটা সে নেয়নি। তার হয়ে নেওয়া হয়েছিল।
একদিন পুরোনো বন্ধু রিমি ফোন করল,
“বের হবি?
অনেক দিন গল্প হয় না।”
নিশি রাজি হয়ে গিয়েছিল। রাতে অভিক শুনে শুধু বলল,
“আমি মানা করছি না। তবে ওর সঙ্গে আগের মতো মেশাটা ভালো হবে বলে মনে হয় না।”
কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। শুধু অভিকের অস্বস্তি। শেষ পর্যন্ত নিশিই ফোন করে না বলে দিল। ফোন রেখে অনেকক্ষণ বসে ছিল। হঠাৎ মনে হলো, সত্যিই কি সে যেতে চাইছিল না?
নাকি অন্য কারও অস্বস্তিকে নিজের ইচ্ছা ভেবে নিয়েছে?
কয়েক দিন পরে আলমারি গুছাতে গিয়ে একটা খাম পেল। ভেতরে তার পুরোনো নিয়োগপত্র। যে স্কুলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। আর সঙ্গে ছিল যোগ না দেওয়ার কারণে বাতিল হওয়ার চিঠি। তারিখটা দেখে সব মনে পড়ে গেল।
সেদিনও অভিক বলেছিল,
“পরে করো। এখন বিশ্রাম নাও।”
খামটা হাতে নিয়ে নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। জীবনের কতগুলো মোড়ে সে নিজের ইচ্ছায় থামেনি। থেমে গেছে। কারণ কেউ তাকে থামিয়ে দিয়েছিল।
পরদিন সে মায়ের কাছে গেল। চা খেতে খেতে হঠাৎ বলল,
“মা, কেউ যদি সব সময় বলে, ‘আমি তোমার ভালোর জন্য করছি’, তাহলে কি সেটা সত্যিই ভালোবাসা হয়?”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে বললেন,
“ভালোবাসা তোমার পাশে হাঁটে। নিয়ন্ত্রণ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে পথ ঠিক করে দেয়। বাইরে থেকে দুটোকে এক রকম লাগে। ভেতরে কিন্তু এক নয়।”
কথাটা নিশির মাথায় ঘুরতেই থাকল।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে অভিককে বলল,
“একটা প্রশ্ন করব?”
“করো।”
“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে আমার ফোন দেখো কেন?
আমি কোথায় যাব, কার সঙ্গে কথা বলব—এসব ঠিক করার দরকার পড়ে কেন?”
অভিক চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“আমি শুধু চাই তুমি নিরাপদে থাকো।”
নিশি ধীরে মাথা নাড়ল।
“নিরাপদ রাখতে গিয়ে যদি আমার নিজের মতো বাঁচাটাই হারিয়ে যায়?
তাহলে সেটা নিরাপত্তা না। ওটা একটা খাঁচা।”
ঘরটা অনেকক্ষণ নীরব ছিল।
শেষ পর্যন্ত অভিক খুব আস্তে বলল,
“আমি বুঝতেই পারিনি। আমার কাছে এগুলোই যত্ন ছিল।”
নিশির গলাও শান্ত।
“যত্ন মানুষকে ভরসা দেয়। নিয়ন্ত্রণ মানুষকে নিজের ওপরই সন্দেহ করতে শেখায়। আমি অনেক দিন ধরে সেটাই করছি।”
সেদিন কোনো নাটক হয়নি। কেউ বাড়ি ছাড়েনি। কেউ চিৎকারও করেনি। শুধু দুজন মানুষ প্রথমবার নিজেদের দিকে সত্যি করে তাকিয়েছিল।
পরিবর্তনও এক দিনে আসেনি। তবে শুরু হয়েছিল। অভিক আর নিশির ফোন হাতে নিত না। কোথাও যাওয়ার আগে অনুমতি দিত না। শুধু বলত, “ফিরতে দেরি হলে জানিয়ো।
দরকার হলে আমি নিতে আসব।”
কয়েক দিন পরে নিশি প্রথমবার নিজের ফোনে নতুন একটা পাসওয়ার্ড দিল। অভিক সেটা দেখল। কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শুধু হালকা হেসে বলল, “ভালো।”
এই ছোট্ট শব্দটাই নিশির কাছে অনেক বড় মনে হলো।
এত দিনে সে বুঝল, বিশ্বাস মানে সব দরজা খুলে রাখা নয়। বিশ্বাস মানে, দরজা বন্ধ থাকলেও সম্পর্কের ভেতর বাতাস চলাচল বন্ধ না হওয়া।
কয়েক মাস পর নিশি আবার চাকরির ইন্টারভিউ দিল। বের হওয়ার সময় অভিক শুধু বলল, “শুভকামনা।” আর কিছু না।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নিশির মনে হলো, ভালোবাসা কাউকে নিজের মতো বানিয়ে ফেলার নাম নয়। ভালোবাসা মানে, মানুষটাকে তার নিজের মতো থাকার জায়গা করে দেওয়া। কারণ যে সম্পর্ক শ্বাস নিতে দেয় না, তাকে যত্ন বলা যায় না।
সেটা শুধু খুব সুন্দর করে সাজানো একটা কারাগার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।