যদি নারী-পুরুষ উভয়েই মানুষ হয়, তবে ইসলামে উত্তরাধিকার, সাক্ষ্য ও কিছু বিধানে পার্থক্য কেন?
সমতা (Equality) নাকি ন্যায় (Equity)? ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ
ইসলামের বিরুদ্ধে সমসাময়িক যুগে সবচেয়ে বেশি উত্থাপিত আপত্তিগুলোর একটি হলো, "যদি ইসলাম নারী ও পুরুষকে সমান মানুষ বলে, তাহলে উত্তরাধিকার, সাক্ষ্য, পারিবারিক নেতৃত্ব এবং কিছু আইনি বিধানে পার্থক্য কেন?" অনেকেই মনে করেন, এই পার্থক্যই প্রমাণ করে যে ইসলাম নারীকে পুরুষের চেয়ে কম মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু এই দাবি সত্য কি? নাকি এখানে "সমান মর্যাদা" এবং "একই ভূমিকা" এই দুটি বিষয়কে এক করে ফেলা হয়েছে?
প্রথমেই ইসলামের মৌলিক নীতিটি জানা জরুরি। ইসলাম কখনো বলেনি যে নারী পুরুষের চেয়ে নিম্নমানের সৃষ্টি। বরং কুরআন ঘোষণা করে,
> "হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের সবাইকে এক প্রাণ (নফস) থেকে সৃষ্টি করেছেন।"
(সূরা আন-নিসা ৪:১)
অর্থাৎ নারী ও পুরুষ উভয়ের মানবিক উৎস এক।
আরও স্পষ্টভাবে আল্লাহ বলেন,
> "নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী... আল্লাহ তাদের সবার জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।"
(সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৫)
এখানে আল্লাহ ঈমান, তাকওয়া এবং আখিরাতের প্রতিদানের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষকে সমানভাবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি লিঙ্গ নয়; তাকওয়া।
কুরআন ঘোষণা করে,
> "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।"
(সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)
অতএব, ইসলামের মৌলিক নীতি হলো আধ্যাত্মিক মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমান।
তাহলে পার্থক্য কোথায়?
ইসলাম সমান মর্যাদা (Equal Worth) এবং একই দায়িত্ব (Identical Roles)-কে এক জিনিস মনে করে না। বাস্তব জীবনেও আমরা দেখি, একজন বিচারক, একজন সেনাসদস্য এবং একজন চিকিৎসকের মানবিক মর্যাদা সমান; কিন্তু তাদের দায়িত্ব এক নয়। ভিন্ন দায়িত্ব মানেই অসম্মান নয়।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো উত্তরাধিকার। কুরআনে অনেক ক্ষেত্রে ছেলেকে মেয়ের দ্বিগুণ সম্পত্তি দেওয়া হয়েছে।
> "আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দেন: একজন পুরুষের অংশ দুইজন নারীর অংশের সমান।"
(সূরা আন-নিসা ৪:১১)
সমালোচকরা এখানেই থেমে যান। কিন্তু তারা প্রায়ই উল্লেখ করেন না যে, একই ইসলামী আইনে পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পুরুষের ওপর দেওয়া হয়েছে।
কুরআন বলে,
> "পুরুষরা নারীদের রক্ষণাবেক্ষণকারী, কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে।"
(সূরা আন-নিসা ৪:৩৪)
অর্থাৎ একজন পুরুষ বিয়ের সময় মোহর দেবেন, স্ত্রীর ভরণপোষণ করবেন, সন্তানদের ব্যয় বহন করবেন এবং পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু একজন নারীর ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে সংসারের জন্য খরচ করা শরিয়ত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়। ফলে উত্তরাধিকারের পার্থক্যকে ইসলাম একটি অধিকার-দায়িত্বের ভারসাম্য হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ক্ষেত্রে নারী পুরুষের অর্ধেক উত্তরাধিকার পান না। এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে এমন বহু ক্ষেত্র আছে যেখানে নারী পুরুষের সমান পান, কখনো কখনো বেশি পান, আবার কিছু ক্ষেত্রে একাই সম্পূর্ণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। তাই "নারী সবসময় অর্ধেক পায়" কথাটি তথ্যগতভাবে সঠিক নয়।
দ্বিতীয় আপত্তি হলো সাক্ষ্য। কুরআনের একটি আয়াতে বলা হয়েছে যে ঋণ-লেনদেনের ক্ষেত্রে একজন পুরুষ না থাকলে দুইজন নারী সাক্ষী হবেন।
> (সূরা আল-বাকারা ২:২৮২)
এখানে লক্ষ্য করা দরকার, এই বিধানটি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ধরনের আর্থিক চুক্তি সম্পর্কে। কুরআন এখানে কারণও উল্লেখ করেছে:
> "...যাতে একজন ভুলে গেলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।"
এটি কোনো সাধারণ ঘোষণা নয় যে, সব বিষয়ে নারীর সাক্ষ্য অর্ধেক। ইসলামী ফিকহে এমন বহু ক্ষেত্র আছে, যেমন সন্তান জন্ম, স্তন্যদান, নারীদের শারীরিক বিষয়, যেখানে একজন নারীর সাক্ষ্যই গ্রহণযোগ্য এবং একজন পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
অর্থাৎ, সাক্ষ্যের বিধান বিষয়ভেদে পরিবর্তিত হয়।
আরেকটি প্রশ্ন আসে, "পুরুষই কেন পরিবারের প্রধান?"
ইসলামে এটি শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা নয়; বরং দায়িত্বের ঘোষণা। পরিবারের প্রধান হওয়ার অর্থ হলো পরিবারের ব্যয়ভার বহন করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আল্লাহর সামনে সেই দায়িত্বের জবাবদিহি করা। তাই ইসলামে নেতৃত্ব একটি সম্মানের পাশাপাশি একটি ভারী দায়িত্বও।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
> "তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯)
অর্থাৎ নেতৃত্ব মানেই বিশেষ সুবিধা নয়; বরং অধিক জবাবদিহি।
এখানে একটি দার্শনিক বিষয়ও বিবেচ্য। আধুনিক বিশ্বে অনেকেই Equality (সবার জন্য একই নিয়ম)-কে ন্যায়বিচারের একমাত্র সংজ্ঞা হিসেবে দেখেন। কিন্তু ইসলাম Equity (দায়িত্ব ও বাস্তবতার ভিত্তিতে ন্যায্য বণ্টন)-কে গুরুত্ব দেয়। ইসলামের দাবি হলো, একই দায়িত্ব না থাকলে সব অধিকারও সবসময় এক রকম হবে না। তবে মর্যাদা, মানবিক মূল্য এবং আল্লাহর কাছে সম্মান সমান থাকবে।
অবশ্য এটিও সত্য যে, আধুনিক যুগে এই ব্যাখ্যা নিয়ে মুসলিম সমাজের ভেতরেও বিস্তর আলোচনা রয়েছে। কিছু সমসাময়িক চিন্তাবিদ এসব বিধানের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন করে গবেষণা করছেন, আবার ঐতিহ্যবাহী আলেমরা ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যাই অনুসরণ করেন। তবে উভয় পক্ষই সাধারণত একমত যে, কুরআনের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার ও মানবমর্যাদা প্রতিষ্ঠা।
সবশেষে বলা যায়, ইসলামের দাবি এই নয় যে নারী ও পুরুষ সব ক্ষেত্রে অভিন্ন। বরং ইসলামের দাবি হলো, তারা মানবিক মর্যাদায় সমান, কিন্তু কিছু অধিকার ও দায়িত্বে ভিন্ন। সেই ভিন্নতাকে ইসলাম বৈষম্য নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বের ভারসাম্য হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
সুতরাং, "যদি নারী-পুরুষ উভয়েই মানুষ হয়, তবে ইসলামে কিছু বিধানে পার্থক্য কেন?" এই প্রশ্নের ইসলামী উত্তর হলো: ইসলাম নারী ও পুরুষের মর্যাদাকে সমান ঘোষণা করেছে, কিন্তু সব দায়িত্বকে অভিন্ন ঘোষণা করেনি। উত্তরাধিকার, সাক্ষ্য ও পারিবারিক দায়িত্বের পার্থক্যকে ইসলাম মানবিক মূল্যবোধের পার্থক্য নয়, বরং অধিকার ও দায়িত্বের ভারসাম্য হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।