সাহিত্যে বাস্তবতা সংকট
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ২৫, ২০২৬
(“সাহিত্য ও বাস্তবতা পলায়ন নাকি প্রবণতা” — মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, ২২ এপ্রিল ২০২৬ প্রবন্ধের আলোচনার সমালোচনামূলক সম্প্রসারণ)
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার উপস্থাপন নিয়ে যে সংকটের কথা উঠে আসে, তা আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন সাহিত্যিক সমস্যা নয়। বরং এটি সাহিত্য, পাঠক এবং ডিজিটাল পরিবেশ—এই তিনটি শক্তির পারস্পরিক পরিবর্তনের ফল। আগের আলোচনায় যে সমাধানগুলো এসেছে—ধীরগতির লেখা, নিরাপদ সাহিত্য থেকে বের হওয়া, পাঠক-শিক্ষা বৃদ্ধি—এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব প্রয়োগ ছাড়া এগুলো কেবল ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ধীরগতির লেখা নিঃসন্দেহে একটি প্রয়োজনীয় সাহিত্যিক নীতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের লেখক কেবল সাহিত্যিক নান্দনিকতার ভেতর কাজ করেন না; তিনি একই সঙ্গে সময়, মনোযোগ অর্থনীতি এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রতিযোগিতার মধ্যেও অবস্থান করেন।
২০২৪ সালের একুশে বইমেলায় প্রথম বই প্রকাশ করা দুই তরুণ লেখকের সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, তারা স্বীকার করেন—লেখার গুণগত মানের পাশাপাশি “দ্রুত প্রকাশ” এবং “পাঠকের প্রতিক্রিয়া” তাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে ধীর লেখার ধারণা যতটা আদর্শিক, বাস্তব প্রয়োগ ততটা সহজ নয়।
নিরাপদ সাহিত্যকে শুধু লেখকের ব্যক্তিগত ভয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া-ব্যবস্থার অংশ।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যে লেখাগুলো দ্রুত ছড়ায়, সেগুলো সাধারণত কম বিতর্কিত এবং সহজে গ্রহণযোগ্য। ফলে লেখক ধীরে ধীরে এমন বিষয় বেছে নেন যা ঝুঁকিহীন।
এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি একটি “ইকোসিস্টেম-চালিত প্রবণতা”, যেখানে গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিক্রিয়া বিষয় নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
২০২৫ সালের ঈদে ফেসবুকে “মা” বিষয়ক একটি ছোট গদ্য ১০ হাজারের বেশি শেয়ার পায়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই লেখার মূল বক্তব্য পাঠকের স্মৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে যায়।
এটি কেবল ভাইরালিটির উদাহরণ নয়; বরং এটি বাস্তবতার উপস্থাপনের সংকট। অনুভূতি আছে, কিন্তু গভীর কাঠামো নেই। ফলে সাহিত্য দ্রুত ছড়ায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
প্রতীকী ভাষা সাহিত্যের শক্তি, কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন প্রতীক বাস্তবতাকে উন্মোচন না করে ঢেকে ফেলে।
শঙ্খ ঘোষের কবিতায় সরাসরি সামাজিক মন্তব্য কম, তবুও ভাষার ভেতরের ভাঙন এবং নীরবতা একটি চাপা বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। কিন্তু শঙ্খ ঘোষের নীরবতা ছিল রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের সময়ে লেখা, আর আজকের নীরবতা অ্যালগরিদমের ভয়ে। দুই নীরবতা এক নয়।
এখানে পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নীরবতা ছিল রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার ফল, অন্যদিকে আজকের নীরবতা অনেক সময় দৃশ্যমানতার অর্থনীতির ভেতরে টিকে থাকার কৌশল। ফলে প্রতীক যখন বাস্তবতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাহিত্য তার ব্যাখ্যামূলক শক্তি কিছুটা হারায়।
ঢাকার এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মন্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক:
“লম্বা লেখা পড়তে মন বসে না, কিন্তু ছোট পোস্টে নিজেকে খুঁজে পাই।”
এই মনস্তত্ত্ব লেখককে প্রভাবিত করছে। ফলে সাহিত্য ধীরে ধীরে সংক্ষিপ্ত, দ্রুত এবং আবেগনির্ভর ফর্মে রূপ নিচ্ছে। এখানে দায় একপাক্ষিক নয়—এটি একটি যৌথ পরিবর্তন।
সমাধান তখনই কার্যকর হবে, যখন তা বাস্তব অনুশীলনে রূপ নেবে—
সিরিজ আকারে দীর্ঘ লেখা প্রকাশ
পাঠচক্রে সমকালীন সাহিত্য বিশ্লেষণ
সংক্ষিপ্ত লেখাতেও বিশ্লেষণমূলক স্তর যোগ করা
লেখার প্রথম খসড়া নয়, রিভিশন সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া
সাহিত্যে বাস্তবতা সংকট মানে বাস্তবতার অনুপস্থিতি নয়; বরং তার উপস্থাপন কাঠামোর পরিবর্তন। লেখক, পাঠক এবং প্ল্যাটফর্ম—এই তিনটি স্তর একসাথে এই পরিবর্তনকে গড়ে তুলছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়—আমরা কি এমন সাহিত্য তৈরি করছি, যা বাস্তবতাকে সহজ করে দেয়, নাকি এমন সাহিত্য, যা বাস্তবতাকে সত্যিকার অর্থে বোঝার সুযোগ দেয়?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।