অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ৮: যেদিন বুঝলাম, নিশি নেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
অভিক... তুমি বদলে গেছ।
নিশি কথাটা বলল রাতের খাবার টেবিলে। ভাতের থালা সামনে, কিন্তু খাচ্ছে না। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের নিচে কালি। গত এক সপ্তাহ ধরে ঘুমায় না ঠিকমতো। পাশ ফিরে শুয়ে থাকে।
আমি ডাল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে হাসলাম। বদলে যাওয়া তো স্বাভাবিক হতে পারে। মানুষ কি দশ বছর আগের মতো থাকে? তুমিও তো বদলেছ। আগে কত কথা বলতে। এখন চুপচাপ। মাথা ধরেছে?
নিশি মাথা নাড়ল। ধীরে। খুব ধীরে। আমি সেটা বলছি না। তুমি এখন... এখন এমন একজনের সাথে সারাদিন কথা বলো, যে এই ঘরে নেই। যাকে আমি দেখি না।
আমার হাত থেমে গেল। বিরক্তিটা গলায় উঠে এল। আমি বারান্দার লোকটার কথা বলছ? উনি তো আছেন। তুমি দেখতে পাও না বলে উনি হাওয়া হয়ে যাবেন? উনি তো কালও বললেন, তোমার রান্নার হাত ভালো। ইলিশের দোপেঁয়াজা।
নিশি আর তর্ক করল না। চামচটা প্লেটে নামিয়ে রাখল। টুং করে শব্দ হলো। ফ্যানের বাতাসে চুল উড়ছে। তারপর উঠে শোবার ঘরে চলে গেল। দরজাটা লাগাল না, কিন্তু আমার আর খাওয়া হলো না। ডালটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
এরপর থেকে বুঝলাম, আমরা আসলেই তিনজন বাসায়।
আমি। নিশি। আর উনি।
ওনার নাম জানি না। বয়স পঞ্চাশের মতো মনে হয়। চুপচাপ। বেশিরভাগ সময় বারান্দার বেতের ইজিচেয়ারে বসে থাকেন। পুরোনো ইত্তেফাক পড়েন। মাঝে মাঝে আমি অফিস থেকে ফিরলে বলেন, আজ বসের সাথে তর্ক করো না। চাকরি যাবে। টার্গেট মিস হয়েছে।
আমি শুনতাম। সত্যি হতো প্রায়ই। সেদিন স্যার রেগে ছিলেন। ফাইল ছুড়ে মেরেছিলেন সেলসের শুভকে। আমি চুপ ছিলাম বলে বেঁচে গেছি। প্রেজেন্টেশনটা পরে দিয়েছি।
নিশিকে বলতাম। নিশি শুনে মুখ ঘুরিয়ে নিত। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকত। তুমি একা একা কথা বলো অভিক। ঘরে তৃতীয় কেউ নেই। বিশ্বাস করো। ডাক্তার দেখাও।
আমি রেগে যেতাম। তোমার সমস্যা কী? উনি থাকলে তোমার ক্ষতি কী? উনি তো ভালো কথা বলেন। বাজার কত, পেঁয়াজের দাম কত, সব বলেন।
নিশি কাঁদত না। চিৎকার করত না। শুধু দিন দিন চুপ হয়ে যাচ্ছিল। রাতে পাশ ফিরে শুত। আমার দিকে পিঠ দিয়ে।
সেদিন রাতে খেতে বসে নিশি ভাত মাখল না। চামচটা হাতে নিয়ে বসে রইল। স্টিলের চামচে লাইটের আলো। তারপর আমার দিকে তাকাল। চোখ দুটো লাল। জ্বরে পোড়া রোগীর মতো দেখাচ্ছে।
আমি আর পারছি না, অভিক। গলাটা ভাঙা।
কী পারছ না? আমি মাংস ছিঁড়ছি।
প্রতিদিন... প্রতিদিন তোমাকে একটু একটু করে অন্য কারও হয়ে যেতে দেখতে। আমার অভিকটা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমি জানি না। অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াও।
আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। প্লেটটা ঠেলে দিলাম। ভাত ছড়িয়ে পড়ল। সমস্যা তোমার, নিশি। আমার না। তুমি ডাক্তার দেখাও। তুমি হ্যালুসিনেশন দেখো। ঘরে মানুষ থাকলে দেখতে পাও না। চোখে ড্রপ দাও।
নিশি সেদিন ভাত না খেয়ে উঠে গেল। আমি শুনলাম, বাথরুমের দরজা বন্ধ করে ও কাঁদছে। অনেকক্ষণ। পানির শব্দের সাথে কান্না মিশে গেছে।
আমি গেলাম না। বারান্দায় উনি বসে ছিলেন। ইজিচেয়ারে। আমাকে দেখে বললেন, মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু তুমি ঠিক। তুমি ওকে বোঝাতে পারবে না। সময় লাগবে। মাথায় তেল দাও।
আমি মাথা নাড়লাম। ঠিক বলেছেন।
বড়দা এল এক মাস পর। রাজশাহী থেকে। ট্রেনে।
সরাসরি বলল, চল, ডাক্তার দেখিয়ে আনি। সাবরিনা আপাকে চিনি।
আমি হাসলাম। তুইও? নিশি তোকে ফোন করেছে? ফুসলেছে?
দাদা আমার হাত ধরল। শক্ত করে। ভাই, আমাদের জন্য। একবার চল। মা কবরে শুয়ে কষ্ট পাচ্ছে।
গেলাম। জোর করে। কারণ সবাই পাগল হয়ে গেছে, আমি না। রাস্তায় জ্যাম ছিল।
ডা. রেজওয়ান করিম। সিনিয়র সাইকিয়াট্রিস্ট। চেম্বার ধানমন্ডি ২৭।
আমি সব বললাম। বারান্দার লোকটার কথা। উনি কী পরেন, কী খান, কী পরামর্শ দেন। কীভাবে আমার জীবন বাঁচান। বাসের অ্যাক্সিডেন্ট থেকে।
ডাক্তার আধঘণ্টা শুনলেন। একটা কথাও থামালেন না। নোট নিলেন। তারপর চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন। কাচে দাগ।
অভিক সাহেব, আমি আপনার কষ্টটা বুঝতে পারছি। আপনি যা দেখছেন, যা শুনছেন, আপনার ব্রেইনে সেটা একশো ভাগ সত্যি হতে পারে। একে বলে কমপ্লেক্স হ্যালুসিনেশন। সাথে ডিলিউশন। আপনার মস্তিষ্ক এমন একটা বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেটা বাইরের দুনিয়া থেকে আলাদা। এতে আপনার দোষ নেই। লজ্জাও নেই। ব্রেইন একটা অর্গান। লিভারের অসুখ হলে যেমন ওষুধ খান, এটাও তেমন। আমরা চিকিৎসা শুরু করব। আস্তে আস্তে ক্লিয়ার হবে সব। সময় দিতে হবে।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। টেবিলে পানির গ্লাস কেঁপে উঠল। আপনি বলছেন উনি নেই? আমি পাগল? আমি অফিস করি কীভাবে?
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন, আমি বলছি, উনি আপনার ভেতরে আছেন। বাইরে না। আমরা ওনাকে তাড়াব না। ওনাকে আপনার সাথে মিশিয়ে দেব। ইন্টিগ্রেট করব।
বিশ্বাস করিনি। কিন্তু ওষুধ নিলাম। নিশির মুখের দিকে তাকিয়ে। ও দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ছয় মাসে প্রথমবার ওর চোখে আশা দেখলাম। চোখের কোণে পানি।
শুরুর তিন সপ্তাহ আমি মানুষ ছিলাম না।
মাথা ঝিমঝিম। ঘুম। বমি। আর রাগ। দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করত।
সবচেয়ে কষ্ট হতো বিকেলে। বারান্দায় যেতাম। ইজিচেয়ার খালি। কান পাততাম। না, কোনো শব্দ নেই। কোনো গলা নেই। আজ সাবধানে যেও বলার কেউ নেই। বুকের ভেতর ফাঁকা লাগত।
বুকের ভেতর খালি লাগত। যেন কেউ মরে গেছে। খুব কাছের কেউ। আমি কাঁদতাম। নিশিকে বলতাম না। বাথরুমে ঢুকে কল ছেড়ে কাঁদতাম।
এক মাস পর। উনি কম আসেন। সপ্তাহে দুই দিন। তারপর একদিন। ছায়ার মতো।
তিন মাসের মাথায় বুঝলাম, পনেরো দিন হয়ে গেছে, উনি আসেননি। ফোন দেননি।
বুকের খালি জায়গাটা ভরাট হচ্ছে। কিন্তু সেলাইয়ের দাগের মতো ব্যথা আছে। চুলকায়।
ছয় মাস পর। আমি সুস্থ।
অফিস করি। টিম লিড করি। বন্ধুদের সাথে মুভি দেখি। রাতে নিশির সাথে ছাদে হাঁটি। কৃষ্ণচূড়া ফুটেছে।
ডাক্তার বললেন, আপনি রেমিশনে। তবে ওষুধ চালাতে হবে। লো ডোজ। স্ট্রেস নেবেন না। রাত জাগবেন না। রুটিন মানবেন।
এক বিকেলে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ মনে হলো, অনেকদিন নিশির সাথে চা খাই না। আদা দিয়ে।
ঘরে ঢুকে ডাকলাম, নিশি? শুনছ? আজ চা খাবে? আদা দিয়ে করি? বিস্কুট আছে।
কোনো উত্তর নেই। টিভি বন্ধ।
নিশি? আবার ডাকলাম। গলা কাঁপছে কেন?
রান্নাঘর ফাঁকা। শোবার ঘর ফাঁকা। বালিশ গোছানো। বাথরুমে পানি পড়ার শব্দ নেই। মেঝে শুকনো। ছাদে গেলাম। না, নেই। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করব?
বুকটা ধক করে উঠল। দৌড়ে নিচে নামলাম। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাবি বের হয়েছে? নীল শাড়ি পরা?
দারোয়ান অবাক। ভাবি? স্যার, ভাবি তো... ছয় মাস আগে চলে গেছেন। সুটকেস নিয়ে।
আমি দৌড়ে উপরে উঠলাম। দাদাকে ফোন করলাম। হাত কাঁপছে। ফোন পড়ে গেল। তুলে আবার ডায়াল করলাম।
দাদা, নিশি কোথায়? বাসায় নেই। ফোন ধরছে না। সুইচড অফ। হাসপাতালে?
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। শুধু ফ্যানের শব্দ। সিলিং ফ্যান। তারপর দাদা বলল। খুব আস্তে। যেন কোনো ঘুমন্ত বাচ্চাকে জাগাতে চায় না। খুব সাবধানে।
অভিক... ভাই আমার... তুই... তুই সত্যিই মনে করতে পারছিস না? ডাক্তার কী বলেছিল?
কী মনে করব? আমার গলা ফাটছে। চিৎকার করছি। নিশি কোথায়? অ্যাক্সিডেন্ট?
নিশি তো ছয় মাস আগে চলে গেছে, ভাই। ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে তিন মাস হলো। রেজিস্ট্রি করে। উকিল নোটিশ দিয়েছে। ও অনেক চেষ্টা করেছিল। তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। রাত জেগে বসে থাকত। পানি দিত। কিন্তু তুই... তুই শেষের দিকে ওকেই চিনতে পারতি না। বলতি, তুমি কে? নিশি কোথায়? আমার বউ কই? ও সহ্য করতে পারেনি। ওরও তো জীবন আছে।
ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল। মেঝেতে শব্দ হলো।
আমি পাগলের মতো ঘর দেখলাম।
সোফার উপর নিশির নীল শালটা নেই। গত ছয় মাস ধরে ওখানেই ছিল। আমি রোজ দেখতাম। গায়ে দিতাম শীতে।
ডাইনিং টেবিলে ওর কাঁচের মগ। যেটাতে ‘গুড মর্নিং’ লেখা, হাতি আঁকা। নেই। জায়গাটা খালি। ধুলো জমেছে একটু।
আলমারি খুললাম। নিশির পাশটা ফাঁকা। শুধু কয়েকটা হ্যাঙ্গার ঝুলছে। খালি। কটকট শব্দ করছে ফ্যানের বাতাসে। ন্যাপথালিনের গন্ধ।
ওয়াশরুমে গেলাম। ওর টুথব্রাশ নেই। গোলাপি টা। শ্যাম্পুর বোতল নেই। লালটা। তোয়ালেটা নেই।
ছয় মাস। একশো আশি দিন। এই ঘরে নিশির কোনো চিহ্ন নেই। একটা চুলও না।
অথচ আমি রোজ সকালে উঠে বলেছি, গুড মর্নিং নিশি। চা হয়েছে?
রোজ রাতে বলেছি, লাইট নিভিয়ে দাও। মশারি টানাও।
রোজ ঝগড়া করেছি, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না। তুমি বাপের বাড়ি যাও।
রোজ রান্না নিয়ে কমপ্লেইন করেছি, লবণ কম হয়েছে। ঝাল বেশি।
কার সাথে? কে শুনত? কে উত্তর দিত? দেয়াল? বাতাস? আমি নিজে?
আমি ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লাম। টাইলস ঠান্ডা।
বারান্দার ইজিচেয়ারটার দিকে তাকালাম।
ওখানে কেউ নেই। অনেকদিন নেই। ধুলা পড়েছে।
ঘরটাও ফাঁকা। অনেকদিন। শব্দ করলে ইকো হয়।
শুধু আমি ছিলাম। আমি আর আমার মাথার ভেতরের ‘নিশি’।
যে আমাকে ছেড়ে যায়নি। কারণ সে কোনোদিন ছিলই না। শেষ ছয় মাস। আমার ব্রেইন তাকে বানিয়েছে।
যাকে আমি খেতে দিয়েছি। যার সাথে ঝগড়া করেছি। যাকে জড়িয়ে ধরেছি।
আমি মুখ ঢেকে চিৎকার করলাম। কিন্তু শব্দ বের হলো না। গলা বন্ধ।
কারণ এই ফ্ল্যাটে কান্না শোনার কেউ নেই।
অনেক আগেই চলে গেছে। সবাই।
(চলবে… গল্প ৯: ৩০৫ নম্বর কক্ষ)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।