গল্পের নাম: শোনো অবেলার পথিক
কলমে: হিমানী হিমাদ্রি
(দ্বিতীয় পর্ব)
অহিদত্তের শক্ত হাতটা যখন ইরা নিজের মুঠোয় চেপে ধরল, ঠিক সেই মুহূর্তে সময়ের চাকাটা যেন উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। বর্তমানের এই গুমোট সন্ধ্যা আর সামাজিক বাধাগুলো মুছে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ থেকে পনেরো বছর আগের এক তপ্ত দুপুর।
ਚক্রবর্তী বাড়ির বিশাল আমবাগানে তখন রোদের ঝিলিক। দশ বছরের অহিদত্ত একটা পাকা সিঁদুরে আম পেড়েছে মাত্র। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া নূপুরের আওয়াজ আর একটা তীক্ষ্ণ শাসনের সুর ভেসে এল— "অহি! মেজকাকা দেখলে আজ তোমার পিঠের চামড়া রাখবে না। একা একা চুরি করে আম খাওয়া হচ্ছে?"
ধবধবে সাদা ফ্রক পরা আট বছরের ইরা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কপালে চন্দনের তিলক আর দু-পায়ে রূপোর নূপুর—পুরো যেন একটা জীবন্ত ঠাকুরমূর্তি। ছোট্ট অহিদত্ত একগাল হেসে বলেছিল, "ভয় দেখাচ্ছো কাকে বামুনপিসি? এই আমটা তো তোমার জন্যই পাড়লাম।"
ইরা চোখ বড় বড় করে বলেছিল, "মা যে বলেছে তোমাদের ছোঁয়া কিছু খেতে নেই!" অহিদত্ত দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না। সে আমটা দুই টুকরো করে এক টুকরো ইরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জেদের সুরে বলেছিল, "বড় হয়ে আমি যখন অনেক বড় মানুষ হব, তখন দেখবে তোমার মা-ও বলবে আমার হাতের আম খেতে।"
সেদিন সেই বাগানের কোণে বসে অস্পৃশ্যতার সব নিয়ম তুচ্ছ করে এক কায়স্থের ছেলে আর এক ব্রাহ্মণের মেয়ে ভাগ করে খেয়েছিল একই আম। সেদিন তাদের পরিচয় 'উঁচু-নিচু' ছিল না, ছিল স্রেফ 'অহি' আর 'ইরা'।
বর্তমানে ফিরে আসা: স্মৃতির সেই সুগন্ধি দুপুরটা ফিকে হয়ে এল। অহিদত্ত দেখল, তার হাতের ওপর রাখা ইরার হাতটা থরথর করে কাঁপছে। সে ইরার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। তারপর সেই পুরনো সুরে ব্যঙ্গ করে বলল— "সেদিন আম চুরি করার অপরাধে আমি মার খেয়েছিলাম ইরা, কিন্তু আজ তোমাকে চুরি করলে তো ওরা আমায় মেরেই ফেলবে। সহ্য করতে পারবে তো?"
ইরা তার হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে আজ এক অদ্ভুত জেদ। ধরা গলায় সে উত্তর দিল— "মরে যাওয়া তো সহজ অহি, বেঁচে থাকাটাই তো আসল লড়াই। তুমি কি আমার সাথে সেই লড়াই লড়বে না?"
অন্ধকার তখন আরও ঘন হয়েছে। হঠাৎ দূরে কয়েকটা টর্চের আলো আর মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। ইরা আর অহিদত্ত দুজনেই চমকে উঠে হাত ছেড়ে দিল। "ইরা! ওরে ও ইরা! কোথায় গেল মেয়েটা?"— চক্রবর্তী বাড়ির পুরনো চাকর দয়া দস্তিদারের গলা। তার পেছনেই ভারী জুতো আর গম্ভীর গলার আওয়াজ— ইরার মেজকাকা, মহিম চক্রবর্তী।
অহিদত্তের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে ফিসফিস করে বলল, "পালাও রাজকন্যে! তোমার পণ্ডিতমশাইরা লাঠি-সোটা নিয়ে বোধহয় যজ্ঞ করতে বেরিয়েছেন। ধরা পড়লে আজ গঙ্গা স্নান করেও তোমার পাপ ধোয়া যাবে না। যাও, বাড়ির মেয়ে বাড়িতে ফেরো।"
ইরা এবার তীব্র চোখে অহিদত্তের দিকে তাকাল। "তুমি কি সবসময় এভাবেই পালাবে অহি? আজও সেই আমবাগানের মতো সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে মার খাবে আর আমি পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁদব? না, আজ নয়।"
বলতে বলতেই আলোর উৎসগুলো ঘাটের ধাপে এসে পৌঁছাল। মহিম চক্রবর্তীর টর্চের আলোটা সরাসরি গিয়ে পড়ল অহিদত্তের রুক্ষ মুখের ওপর। ঘৃণায় আর আভিজাত্যের অহংকারে মহিমবাবুর কপাল কুঁচকে গেল। এক অচ্ছুৎ যুবকের পাশে নিজের বাড়ির মেয়েকে দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
মহিমবাবু গম্ভীর স্বরে ডাকলেন— "ইরা! সরে আয় ওখান থেকে।"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।