নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-১
আমার হয়ে বেঁচো না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৮,জুন, ২০২৬
বিয়ের তিন বছর পর একদিন নিশি হঠাৎ খেয়াল করল, অনেক দিন হলো সে নিজের জন্য আলাদা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না।
অদ্ভুত ব্যাপার, এত দিনেও বিষয়টা তার চোখে পড়েনি। কারণ অভিক কখনো তাকে ধমকায়নি।
কোনো দিন গায়ে হাত তোলেনি। বন্ধুদের সামনে ছোটও করেনি।
সবকিছু হয়েছে খুব শান্তভাবে। এমনভাবে, যেন এটাই স্বাভাবিক।
অভিক প্রায়ই একটা কথা বলত
আমি যা বলছি, তোমার ভালোর জন্যই বলছি।
শুরুর দিকে কথাটা শুনতে ভালো লাগত।
নতুন সংসার। নতুন শহর। অনেক কিছুই তো অচেনা।
কোন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলবে, কোন ডাক্তারের কাছে যাবে, কোথা থেকে বাজার করলে ভালো—অভিকই সব দেখে দিত।
নিশির সুবিধাই হতো।
তাই কোনো প্রশ্ন জাগত না।
একদিন নিশি বলল,
ভাবছি আবার স্কুলে পড়ানো শুরু করি।
অভিক হেসে বলেছিল,
এখনই কেন?
সংসারটা আরেকটু গুছিয়ে নিই। তারপর না হয় করো।
কথাটা অযৌক্তিক লাগেনি।
কয়েক মাস পর আবার বিষয়টা তুলল।
অভিক এবার বলল,
তোমার এত কষ্ট করার দরকার কী?
আমার আয়েই তো চলছে।
নিশি আর কিছু বলেনি।
তারপর কলেজের বান্ধবীরা বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করল।
অভিক বলল,
সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না। না গেলেই ভালো।
নিশি গেল না।
এরপর ছোট ছোট আরও অনেক বিষয়।
কোন পোশাক পরবে।
কার সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলবে।
কখন বাবার বাড়ি যাবে।
ফেসবুকে কী পোস্ট করবে।
সবকিছুর আগে অভিকের মতামত।
আর প্রায় প্রতিবারই একই কথা,
আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি।
এই কথাটার সঙ্গে তর্ক করা কঠিন।
বাইরে থেকে শুনলে মনে হয়, মানুষটা শুধু যত্ন করছে।
একদিন নিশির মা ফোন করে বললেন,
কবে আসবি?
নিশি কিছু বলার আগেই পাশ থেকে অভিক উত্তর দিল,
আগামী সপ্তাহে যাবে। এই সপ্তাহে একটু ব্যস্ত।
ফোন রাখার পর নিশি হঠাৎ থমকে গেল।
উত্তরটা সে দেয়নি।
তার হয়ে অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে।
সেদিন রাতে ডায়েরিটা খুলল।
শেষ লেখা চার মাস আগের।
"আজ মনে হচ্ছে, আমি আগের নিশিটাকে একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছি।"
তারপর আর কিছু লেখা নেই।
পাতাটা অনেকক্ষণ খোলা ছিল।
পরদিন দুপুরে পুরোনো বান্ধবী রিমি এলো।
অনেক গল্প হলো।
হাসতে হাসতেই রিমি বলল,
তুই আগে কত কথা বলতিস!
এখন এত চুপচাপ হয়ে গেছিস কেন?
নিশি হেসে এড়িয়ে গেল।
কিন্তু কথাটা মাথা থেকে নামল না।
রিমি চলে যাওয়ার পর অভিক বলল,
এত ব্যক্তিগত কথা বলার দরকার ছিল?
তেমন কিছুই তো বলিনি।
তবু একটু সাবধানে থেকো। সবাই ভালো চায় না।
আবার সেই একই সুর।
"সাবধানে থেকো।"
"আমি তোমার ভালোর জন্য বলছি।"
এক বিকেলে আলমারি গোছাতে গিয়ে নিশি একটা পুরোনো ফাইল পেল।
ভেতরে তার চাকরির নিয়োগপত্র।
যে স্কুলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে সে কোনো দিন যোগই দেয়নি।
ফাইলের মধ্যে একটা প্রিন্ট করা ই-মেইলও ছিল।
"প্রার্থী নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করায় নিয়োগ বাতিল করা হলো।"
নিশির হাত কেঁপে উঠল।
সে তো যোগ দিতে চেয়েছিল।
তাহলে?
রাতে অভিককে জিজ্ঞেস করল,
ওই সময় তুমি কি স্কুলে ফোন করেছিলে?
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ।
কেন?
তখন তুমি খুব চাপের মধ্যে ছিলে। আমি ভেবেছিলাম চাকরি করলে আরও কষ্ট হবে।
আমাকে না বলে?
আমি ভেবেছিলাম, পরে বুঝবে আমি ঠিকই করেছি।
নিশি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রাগ হলো না।
বরং ভেতরে কোথাও হালকা একটা ভাঙার শব্দ হলো।
খুব ছোট্ট।
কিন্তু স্পষ্ট।
পরের কয়েক দিন সে তেমন কথা বলল না।
শুধু নিজের দিকে তাকাতে শুরু করল।
শেষ কবে একা কোথাও গেছে?
শেষ কবে নিজের পছন্দে কিছু কিনেছে?
শেষ কবে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে কারও অনুমতির দরকার পড়েনি?
প্রশ্নগুলো সহজ ছিল।
উত্তরগুলো না।
একদিন দুপুরে সে বাবার বাড়ি চলে গেল।
কাউকে না জানিয়ে।
মা দরজা খুলে অবাক হয়ে বললেন,
হঠাৎ?
নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
মা, মানুষ কি কাউকে খুব ভালোবেসেও তার জীবনটা নিজের মতো চালাতে পারে?
মা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আস্তে বললেন,
পারে।
যদি সে ভালোবাসা আর মালিকানা—এই দুটোর পার্থক্য বুঝে উঠতে না পারে।
কথাটা নিশির ভেতরে কোথাও গিয়ে বসে রইল।
রাতে বাড়ি ফিরতেই অভিক বলল,
আমাকে না জানিয়ে গেলে কেন?
নিশি শান্ত গলায় বলল,
কারণ যেতে ইচ্ছে করেছিল।
আমি তো চিন্তা করেছি।
করতে পারো।
কিন্তু তাই বলে আমার হয়ে সব সিদ্ধান্তও কি তোমাকেই নিতে হবে?
অভিক প্রথমবার থেমে গেল।
অনেকক্ষণ পরে বলল,
আমি তো কখনো তোমার ক্ষতি চাইনি।
জানি।
তুমি ক্ষতি চাওনি।
কিন্তু আমার হয়ে বাঁচতে চেয়েছ।
দুটো এক জিনিস না।
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
অনেকক্ষণ পরে অভিক ধীরে বলল,
ছোটবেলা থেকে দেখেছি, বাবা সব সিদ্ধান্ত নিতেন। মা কিছু বলতেন না। আমি ভেবেছি, সংসার মানেই বোধহয় এমন।
কথাটা বলার সময় তার গলায় কোনো যুক্তি ছিল না।
ছিল শুধু অনুতাপ।
নিশি আস্তে বলল,
আমিও বুঝিনি অনেক দিন।
কারণ তুমি কখনো চিৎকার করোনি।
কোনো দিন অপমান করোনি।
শুধু প্রতিটা মোড়ে আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছ।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমি নিজের পথটাই ভুলে গেছি।
অভিক মাথা নিচু করল।
আমি সত্যিই বুঝিনি।
আমি ভেবেছিলাম তোমাকে আগলে রাখছি।
আসলে তোমার জায়গাটাই নিয়ে নিচ্ছিলাম।
কয়েক সপ্তাহ পর বদলটা ধীরে ধীরে দেখা গেল।
নিশি নিজেই আবার স্কুলে আবেদন করল।
ইন্টারভিউ দিল।
চাকরিটাও পেল।
নিয়োগপত্রে সই করার আগে সে অভিকের দিকে তাকাল।
অভিক শুধু হেসে বলল,
সিদ্ধান্তটা তোমার।
আমি শুধু পাশে আছি।
নিশি সেই হাসিটা ফিরিয়ে দিল।
অনেক দিন পর মনে হলো, এই হাসিটা তার নিজের।
প্রথম কর্মদিবসের সকালে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অভিক বলল,
ভয় লাগছে?
একটু।
দরকার হলে ফোন কোরো।
নিশি ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল,
করব।
আর যদি না-ও করি, তার মানে আমি নিজেই সামলে নিতে পেরেছি।
অভিক মাথা নাড়ল।
এবার আর কোনো উপদেশ দিল না।
দরজাটা শুধু খুলে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
নিশি বাইরে বেরিয়ে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তার মনে হলো, স্বাধীনতা সব সময় বড় কোনো ঘোষণা নয়।
কখনো কখনো স্বাধীনতা মানে, নিজের জীবনের একটা ছোট সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া।
আর ভালোবাসা?
ভালোবাসা কাউকে নিজের মতো বানিয়ে ফেলার নাম নয়।
ভালোবাসা হলো, সে যেন নিজের মতো করেই বাঁচতে পারে—সেই জায়গাটা তাকে দেওয়া।
কারণ শিকল সব সময় চোখে দেখা যায় না।
কিছু শিকল খুব নরম ভাষায় তৈরি হয়।
আর সবচেয়ে কঠিন বন্দিত্ব সেইটাই, যেটাকে অনেক মানুষ সারা জীবন ভালোবাসা ভেবে ভুল করে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।