#তুমি_অনিবার্য
পর্ব : ০৯
লেখিকা: ইসরাত জাহান
কৃষ্ণনগরের আকাশ আজ এক বিষণ্ণ ধূসর চাদরে ঢাকা। সকাল থেকেই মেঘের আনাগোনা, তবে বৃষ্টি নামেনি। বাতাসের আর্দ্রতা রায়বাড়ির পুরনো দেওয়ালে যেন এক অদ্ভুত সেঁতসেঁতে বিষাদ লেপে দিয়েছে। মেহু তার ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে তার চিরচেনা সাদাটে এক সুতির কামিজ। বাস্তবের রুক্ষতা আবার তাকে ঘিরে ধরেছে।
মাজেদুল রায়ের কণ্ঠস্বর নিচতলা থেকে ভেসে আসছে। তিনি কারোর ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে চিৎকার করছেন। মেহু জানে, তার বাবার এই মেজাজ কোনো নতুন বিষয় নয়, কিন্তু আজ যেন শব্দের প্রতিটি কম্পন তার বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধছে। সে অনুভব করল, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক সুক্ষ্ম সুতোয় ঝুলে আছে যেকোনো সময় ছিঁড়ে যেতে পারে।
হঠাৎ তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। ঈশানের মেসেজ। ছোট, সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত চুম্বকত্ব আছে।
.
“ঘাটের দিকে আসবি? আকাশটা আজ অন্যরকম। তোর. শিউলি-চত্বরের চেয়েও অনেক বেশি খোলামেলা।”
মেহু কিছুক্ষণ স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরকার 'দ্বিধা-দ্বন্দ্ব' আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ঈশানের কাছে যাওয়া মানেই সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়া, যা সে সেদিন গ্রন্থাগারে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু একইসঙ্গে, ঈশানের উপস্থিতি ছাড়া তার এই গুমোট দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোনো পথ নেই। সে পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। ভাগ্যিস বাবা তখন বাইরের বারান্দায় কারোর সঙ্গে তর্কে মগ্ন ছিলেন, মেহু পিছনের দরজা দিয়ে অনায়াসেই বেরিয়ে যেতে পারল।
জলঙ্গী নদীর ঘাটটা আজ জনশূন্য। কেবল দুই-একটা নৌকা মাঝনদীতে স্থির হয়ে আছে। ঈশান ঘাটের ওপরের চাতালে বসে ছিল। তার সামনে রাখা একটি ছোট স্কেচবুক। মেহু গিয়ে তার পাশে দাঁড়াতেই ঈশান মুখ না তুলেই বলল,
-“জানতাম তুই আসবি। এই মেঘলা দিনে তোর মতো গৃহবন্দী মানুষের পক্ষে চারদেয়ালের ভেতর টিকে থাকা অসম্ভব।”
মেহু হালকা হেসে ওর পাশে বসল। ঘাসের ওপর জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার কামিজে লেগে এক অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে দিল। সে নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, -“তোর সব ব্যাপারেই অতিরিক্ত বিশ্বাস, তাই না? যদি না আসতাম?”
ঈশান এবার স্কেচবুক থেকে মাথা তুলে মেহুর দিকে তাকাল। তার চোখে এক চিলতে দুষ্টুমি।
-“না আসলে লসটা তোর হতো। দেখ, আকাশটা কেমন নীলাভ ধূসর হয়ে আছে। আর তোর ওই রায়বাড়ির স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের চেয়ে এখানকার হাওয়াটা অনেক বেশি জ্যান্ত।”
-“বাবা আজ খুব মেজাজে আছে রে,”
মেহু নিচু গলায় বলল, যেন এখানে বসেও বাবার চিৎকার শুনতে পাচ্ছে সে।
- “মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই বাড়িটা আসলে একটা প্রকাণ্ড খাঁচা। দম বন্ধ হয়ে আসে।”
ঈশান আলতো করে মেহুর কাঁধে হাত রাখল। বন্ধুর মতো, ভরসা দেওয়ার মতো করে বলল,
- “আরে ধুর! অত সিরিয়াসলি নিস না তো। খাঁচা-টাচা বলে মন খারাপ করিস না। এই তো এখন বাইরে আছিস, প্রাণভরে শ্বাস নে।
মেহু একটু হেসে ঈশানের স্কেচবুকের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
-“দেখি কী আঁকছিস?
ঈশান খাতাটা সরিয়ে নিয়ে হাসল।
-“উঁহু, এখন দেখানো যাবে না। ফিনিশ করি, তারপর দেখবি। আগে বল, কালকের পড়াটা রেডি করেছিস? নাকি সারাদিন জানলায় দাঁড়িয়ে মেঘই দেখলি?”
“-একদম মনে করাবি না ওসব!”
মেহু কৃত্রিম রাগে মুখ ঘুরিয়ে নিল। “
ঈশান শব্দ করে হেসে উঠল।
-“আচ্ছা বাবা, সরি! চল, আজ আর পড়া নিয়ে কোনো কথা হবে না। শুধু বসে নদী দেখব আর তোর মন খারাপ তাড়াব। বল, ফুচকা খাবি? আসার সময় দেখলাম মোড়ে ননী কাকা দোকান খুলছে।”
মেহুর বিষণ্ণ মুখটায় এবার সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠল। ঈশানের এই এক গুণ খুব সাধারণ কথা দিয়েই সে সব গুমোট আবহাওয়া হালকা করে দিতে পারে। সে মাথা নেড়ে সায় দিল,
-“চল, তবে ঝাল বেশি দিতে বলবি কিন্তু!”
ননী কাকার ফুচকার দোকানের সামনে তখন ভিড়টা একটু পাতলা। টক জলের ঝাঁঝালো গন্ধ আর ভাজা ফুচকার সুবাসে চারপাশটা ম ম করছে। মেহু একটা বড় ফুচকা মুখে দিয়ে ঝালে নাজেহাল হয়ে যখন ‘উঁ উঁ’ করছে, ঈশান তখন তার হাতের স্কেচবুকটা একপাশে সরিয়ে রেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেহুর দিকে। তার চোখের সেই চাউনিতে কেবল মুগ্ধতা নয়, ছিল এক গভীর আচ্ছন্নতা যেন সে মেহুর প্রতিটি ছোট নড়াচড়াকে নিজের স্মৃতির অ্যালবামে গেঁথে রাখছে।
মেহু ফুচকার শালপাতাটা হাতে নিয়ে ঈশানের দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বলল,
—“কিরে? ওভাবে হাঁ করে দেখছিস কী? ফুচকা খেতে এসেছিস না আমাকে মাপতে?
ঈশান মেহুর খুব কাছাকাছি এগিয়ে এল। এতই কাছে যে মেহু তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করতে পারছিল।
ঈশান মেহুর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
—“রোজ দেখি বলেই তো শেষ হয় না রে। তুই আসলে একটা নেশার মতো। যত দেখি, তত মনে হয় আরও কিছুটা দেখা বাকি রয়ে গেছে।
মেহু কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। লোকলজ্জার ভয় তার রক্তে, কিন্তু ঈশানের এই বেপরোয়া মুগ্ধতা তাকে অদ্ভুত এক নেশায় আচ্ছন্ন করছিল।
এদিকে ননী কাকার দোকানের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পাড়ার দুই প্রবীণা জোহরা বেগম আর কুলসুম বিবি। দুজনেই হাতে বাজারের থলি নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে ওদের মেপে নিচ্ছিলেন। জোহরা বেগম মুখ বেঁকিয়ে কুলসুমের কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,
—“দেখলে কুলসুম? মাজেদুল সাহেবের আদরের দুলালী! দিনে দুপুরে পাড়ার ছেলের সাথে ঢলাঢলি করছে। বাড়ির খবর কি আর ওনারা রাখেন? মেয়ে তো এখন অন্যের নেশায় চুর হয়ে আছে। লজ্জাশরম সব ধুয়ে মুছে সাফ!”
কুলসুম বিবি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন,
—“আরে বুবু, আজকালকার মেয়েদের কি আর অত লজ্জা আছে? ওই ছেলেটা তো পুরো পাগল হয়ে গেছে ওর পেছনে। দেখেছিস কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে? যেন গিলে খাবে! এই সব মেলামেশার শেষটা যে ভালো হয় না, সেটা তো আমরা জানিই।”
মেহু ওদের কথাগুলো আংশিক শুনতে পেয়ে কুঁকড়ে গেল। তার মনে পড়ল বাবার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর বাড়ির কড়া শাসন। সে ছটফট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—“ঈশান, এবার আমায় উঠতে হবে। লোকজনের কথা শুনতে পাচ্ছিস? তাছাড়া বাবা যদি কোনোভাবে জেনে যায় আমি বাইরে এসেছি, তবে আমার হাড় আস্ত রাখবে না।”
কিন্তু ঈশান যেন এক ঘোরের মধ্যে ছিল। সে মেহুর হাতটা খপ করে চেপে ধরল। তার হাতের মুঠো ছিল বেশ শক্ত, এক ধরণের অধিকারবোধে মাখানো। সে মেহুর চোখের দিকে তাকিয়ে উন্মত্তের মতো হাসল।
—“যেতে তো হবেই। কিন্তু এইটুকু সময় কি যথেষ্ট? তুই চলে যাওয়ার পর আমার এই নীল রঙের আকাশটা আবার ধূসর হয়ে যাবে। আচ্ছা মেহু, তুই কি বুঝিস না তোর জন্য আমার ভেতরে কী ধরণের দহন চলে? তোর এই সাদা কামিজের প্রতিটি সুতোয় আমি আমার অস্তিত্ব খুঁজে পাই।”
মেহু কিছুটা ভয় পেয়ে গেল ঈশানের এই আচরণে। সে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
—“তুই আজ বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছিস ঈশান! এটা প্রেম নয়, এটা তো পাগলামি। ছাড় হাত, কেউ দেখে ফেললে অনর্থ হবে।”
সে মনে মনে আওড়াল,
—“পাগলামিই তো রে! তোকে সুস্থভাবে ভালোবাসার সাধ্য আমার নেই। তুই যখন চলে যাস, তখন মনে হয় আমার বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে নিচ্ছে।
ঈশান ধীরে ধীরে হাতের বাঁধন আলগা করল, কিন্তু তার চোখের সেই তৃষ্ণার্ত চাউনি কমল না।
মেহু আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। পিছন ফিরে তাকানোর সাহস হলো না তার, কিন্তু সে অনুভব করতে পারছিল, ঈশান তখনও সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—ঠিক একজন নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো, যার নেশার বস্তু চোখের আড়াল হয়ে গেলেও তার রেশ তখনও রক্তে মিশে আছে।
মেহু যখন বাড়ির দিকে দ্রুত পায়ে এগোচ্ছিল, তার পিঠে ঈশানের সেই প্রখর দৃষ্টির দহন তখনও সে টের পাচ্ছিল। ঈশানের চাউনিতে কোনো ক্লান্তি নেই, কেবল এক গভীর আদিম তৃষ্ণা যেন মেহুকে দেখেও তার দেখার শেষ হয় না।
মেহু বাড়ির পেছনের সরু গলিটায় আসতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে। বাড়ির ঠিক পেছনের পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন জোহরা বিবি আর কুলসুম বেগম। তাঁদের হাতে ধরা পানের বাটা আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত ধূর্ত হাসি। জোহরা বিবি কুলসুমের কনুইতে একটা খোঁচা দিয়ে মেহুর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,
—“দেখলে তো কুলসুম বুবু? আমি ভুল দেখিনি। ওই যে মাজেদুল সাহেবের কলিজার টুকরো! ফুচকার দোকানের সামনেওই বাউন্ডুলে ছেলেটার সাথে এমন মাখামাখি করছিল যে চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। মাজেদুল সাহেব ওদিকে তটস্থ হয়ে লোকজনকে শাসন করছেন, আর ওনার নিজের আস্তাবলেই আগুন লেগেছে, সে খবর কি উনি রাখেন?”
কুলসুম বেগম ওড়নার খুঁট দিয়ে মুখ চেপে একটু হাসলেন। তাঁর গলার স্বরে বিষ মাখানো। তিনি বললেন,
—“আরে বুবু, ওই ঈশান ছেলেটার চাউনি দেখেছো? ও তো ভালো মানুষের মতো তাকায় না, মনে হয় যেন মেয়েটাকে গিলে খেয়ে ফেলবে। ওই তো চোখের সামনে দেখলাম, মেয়েটার হাতটা কেমন করে চেপে ধরেছিল! কী দিনকাল এল বাপু! আমাদের সময় তো পরপুরুষের ছায়া মাড়ালেও সাত দিন প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো।”
মেহুর পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছিল। এই মহিলারা যদি একবার মাজেদুল রায়ের কানে কথাগুলো পৌঁছে দেয়, তবে আজই হবে মেহুর শেষ দিন। সে মাথা নিচু করে, যতটা সম্ভব নিজেকে ছোট করে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তার কানের কাছে ঈশানের সেই রিনরিনে কণ্ঠস্বর তখনও বাজছিল— “তুই আসলে একটা নেশার মতো।”
ঈশান তখনও ফুচ
চকার দোকানের সামনে বসে তার স্কেচবুকে হাত বোলাচ্ছে। সে পাগল, সে আসক্ত। মেহু চলে যাওয়ার পর সে স্কেচবুকের পাতায় মেহুর সেই ঝালে লাল হয়ে যাওয়া মুখটা ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত। তার পেন্সিলের প্রতিটি টানে এক ধরণের উন্মাদনা। মাঝে মাঝে সে বিড়বিড় করে হাসছে, আবার পরক্ষণেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে। তার কাছে মেহু কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, মেহু হলো তার অক্সিজেন, তার নেশা।
মেহু যখন বাড়ির পেছনের ছোট দরজাটা দিয়ে সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকল, তখন সারা শরীর কাঁপছে তার। তার সাদা কামিজের কোণে বৃষ্টির কয়েকটা ছোট ছিটে লেগে আছে, যা ঈশানের দেওয়া স্মৃতির মতোই শীতল। সে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাবে, অমনি নিচতলা থেকে বজ্রগম্ভীর গলায় ডাক এল
—“মেহু! কোথায় গিয়েছিলে?”
মাজেদুল রায়ের কণ্ঠস্বর। মেহু সিঁড়ির ওপর হিম হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মনে হলো, ঈশানের সেই পাগলামি আর পাড়ার মহিলাদের ওই বিষাক্ত কথাগুলো যেন একযোগে তাকে শ্বাসরোধ করে মারতে আসছে,
[🖇আপনাদের প্রতিটি মন্তব্য আমাকে নতুন করে লেখার অনুপ্রেরণা দেয়। গল্পটি ভালো লাগলে বা মেহুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনাদের কোনো ধারণা থাকলে অবশ্যই কমেন্টে জানান। আপনাদের সাড়াই আমার আগামীর পথচলা।
গল্পটি চালিয়ে যাব কি না, আপনারা পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করছেন কি না তা জানতে উন্মুখ হয়ে রইলাম। পাশে থাকবেন। ❤️] (do not copy)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।