মানসিক কষ্ট কি এখন বিলাসিতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ফেব্রুয়ারি ০৩,২০২৬
সিরিজ অস্বস্তিকর সত্য
-১
মানসিক কষ্ট কি এখন বিলাসিতা? নাকি আমরা কষ্টকে অস্বীকার করতেই শিখে গেছি? সমাজ ও বাস্তবতার নির্মম বিশ্লেষণ।
মানসিক কষ্ট কি এখন বিলাসিতা?
প্রশ্নটা শুনতে খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু চারপাশে তাকালেই বোঝা যায়, আমরা এই দিকেই এগোচ্ছি।
আজ কেউ যদি বলে, “আমি মানসিকভাবে ভালো নেই,” খুব কম মানুষই সেটা মন দিয়ে শোনে। বেশিরভাগ সময় উত্তরটা প্রস্তুত থাকে।
“এত ভাবলে চলবে?”
“পেটের চিন্তা আগে করো।”
“সবাই তো কষ্টে আছে।”
এই কথাগুলো নির্দয় না বললেও, ভেতরে ভেতরে খুব পরিষ্কার একটা বার্তা দেয়। তোমার কষ্টটা জরুরি না।
এখান থেকেই মানসিক কষ্ট ধীরে ধীরে বিলাসিতায় পরিণত হয়।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে বেঁচে থাকাটাই ফুল-টাইম কাজ। সকালে উঠেই দৌড়। পড়াশোনা, চাকরি, সংসার, দায়, দেনা। এই দৌড়ের মধ্যে থেমে নিজের ভেতরের অবস্থা দেখার সময় নেই। আর সময় না থাকলে অনুভূতিও যেন নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, অনুভূতি কি সময় দেখে আসে?
বাস্তবে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মানসিক কষ্ট হয় ঠিক তখনই, যখন মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে থাকে। অথচ তখনই তাকে বলা হয়, “এইসব ভাবার সময় নাই।”
এর সঙ্গে আছে সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ। সবাই ভালো আছে। সবাই হাসছে। সবাই সফল। সেখানে নিজের ভাঙা মনের কথা বললে মনে হয়, আমি ব্যতিক্রম। আমি দুর্বল। ফলে মানুষ চুপ করে যায়।
এই চুপ করে যাওয়াটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ কষ্ট কথা না বললে কমে না। জমে। আর জমে জমে একসময় মানুষ ভেতর থেকে ফাঁকা হয়ে যায়।
আমরা প্রায়ই বলি, “আগে বাঁচা দরকার, পরে মেন্টাল হেলথ।” এই কথার ভেতরেই সবচেয়ে বড় ভুলটা লুকিয়ে আছে।
মানসিক কষ্ট কোনো আলাদা বিষয় না। এটা জীবনের অংশ। আপনি যদি দিনের পর দিন নিজের অনুভূতিকে চাপা দেন, তাহলে আপনি শুধু কাজ করা একটা শরীর হয়ে যান। মানুষ থাকা বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এই বিষয়টা আরও নির্মম। তাদের কষ্টের কোনো স্পেস নেই। কারণ বাস্তবতা কঠিন। কাজ না করলে খাওয়া নেই। ফলে তারা শিখে নেয়, কষ্ট মানে দুর্বলতা।
আমরা আসলে কষ্টকে সমস্যা হিসেবে দেখি, সিগন্যাল হিসেবে না। কষ্ট মানে কিছু একটা ঠিক নেই। শরীর ব্যথা করলে যেমন গুরুত্ব দিই, মন ব্যথা করলে তেমন দিই না। কারণ সেটা দেখা যায় না।
আর যেটা দেখা যায় না, সেটাকে অস্বীকার করা সহজ। এখানেই সমাজ ব্যর্থ হয়।
আমরা একে অন্যের কষ্টকে তুলনা করি।
“ওর তো আরও খারাপ অবস্থা।”
“তুমি তো এখনো অনেক ভালো।”
এই তুলনাগুলো কোনো সমাধান দেয় না। বরং মানুষকে আরও একা করে।
সত্যি কথা হলো, কষ্টের কোনো লেভেল নেই। কারও কষ্ট ছোট, কারও বড় এমন না। প্রত্যেকটা মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভাঙে।
সমাধান খুব বড় কিছু না।
কিন্তু কঠিন।
শুনতে শেখা। বিচার না করে শোনা। উপদেশ না দিয়ে পাশে থাকা।
আমাদের সমাজে সবাই কথা বলতে চায়, কিন্তু খুব কম মানুষ শুনতে চায়। অথচ মানসিক কষ্টের ক্ষেত্রে অনেক সময় সমাধান না, একজন শ্রোতাই যথেষ্ট।
সবশেষে একটা অস্বস্তিকর সত্য বলতেই হয়।
মানসিক কষ্ট বিলাসিতা না। বিলাসিতা হলো, আমরা সেটাকে গুরুত্ব না দিয়েও বেঁচে থাকতে পারছি।
কিন্তু সবাই পারে না। যারা পারে না, তারা চুপচাপ হারিয়ে যায়। আর আমরা তখন অবাক হই।
#মানসিক_কষ্ট #মানসিক_স্বাস্থ্য
#নীরব_বাস্তবতা #সমাজ_ও_আমরা
#বাংলা_বিশ্লেষণ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।