ধারাবাহিক গল্প
গোপন উত্তরাধিকার
পর্ব ৪: অন্য একজন উত্তরাধিকারী
২০ জুন, ২০২৬
"প্রিয় নিশি,"
কাগজটা পুরনো। কালি একটু ছড়িয়ে গেছে কোনায়। হাতের লেখা তাড়াহুড়ো করে লেখা, কিন্তু পরিষ্কার।
নিশি পড়ল।
"প্রিয় নিশি,
আপনি আমাকে চেনেন না। আমি আপনাকে চিনি। অফিসের ক্যান্টিনে আপনাকে দুবার দেখেছি। একবার আপনি অভিকের জন্য টিফিন নিয়ে এসেছিলেন। আরেকবার আপনি একা বসে কাঁদছিলেন। কেউ দেখেনি। আমি দেখেছিলাম।
আমি রুবিনা। আমি প্রেগন্যান্ট। বাচ্চার বাবা কে, সেটা আমি কাউকে বলিনি। বলবও না। কারণ ওরা দুই ভাই, আর আমি চাই না আমার জন্য ওদের সম্পর্ক ভাঙুক।
আমি শুধু একটা অনুরোধ করছি। যদি কোনোদিন আমার ছেলে আপনার দরজায় আসে, ওকে ফিরিয়ে দেবেন না। ওর কোনো দোষ নেই। ওর জেদটা ওর বাবার মতো। কার মতো, সেটা আমি বলব না। আপনি দেখলেই বুঝবেন।
রুবিনা হোসেন"
নিশি চিঠিটা ভাঁজ করল। খুব ধীরে।
রায়ান তাকিয়ে ছিল। "কী লেখা?"
নিশি চিঠিটা ওর দিকে ঠেলে দিল না। ব্যাগে রেখে দিল।
"তোমার মা আমাকে চিনত।"
রায়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল। "মানে?"
"মানে তোমার মা জানত আমি কে। অভিকের বউ।"
অর্ণব জানালার পাশ থেকে ঘুরল। "রুবিনা নিশিকে চিঠি লিখেছিল?"
নিশি বলল, "হ্যাঁ। তোমাকে না। অভিককেও না। আমাকে।"
ঘরে এক সেকেন্ডের জন্য কেউ কথা বলল না।
রায়ান উঠে দাঁড়াল। "তাহলে আমি কার ছেলে?"
কেউ উত্তর দিল না। কারণ, সম্ভবত, কেউ সত্যি জানে না।
অর্ণব বলল, "DNA টেস্ট করালেই তো হয়।"
রায়ান আর নিশি প্রায় একসঙ্গে বলল, "না।"
দুজন দুজনের দিকে তাকাল। আবার সেই অস্বস্তিকর মিল।
নিশি বলল, "টেস্ট করালে কী হবে? যদি ও অভিকের ছেলে হয়, তাহলে আমি কী করব? যদি তোমার ছেলে হয়, তাহলে অভিক এত বছর টাকা দিল কেন?"
অর্ণব বলল, "কারণ অভিক ভেবেছিল ওটা ওর দায়িত্ব।"
"কিসের দায়িত্ব? যে বাচ্চার বাবা ও না-ও হতে পারে, তার?"
"হ্যাঁ।" অর্ণবের গলা এবার শক্ত। "কারণ ও আমার ভাই। আর আমি রুবিনাকে ভালোবাসতাম।"
রায়ান চেয়ারটা পেছনে ঠেলে উঠল। শব্দ হলো। "আমি এখানে বসে আপনাদের ফ্যামিলি ড্রামা শুনতে আসিনি। আমার ফান্ডিং ছাড়ুন। আমি যাব।"
নিশি বলল, "বসো।"
"আবার?"
"হ্যাঁ, আবার। কারণ তোমার ফান্ডিং এখনো আমার কাছে।"
রায়ান দাঁতে দাঁত চাপল। বসল না। দাঁড়িয়ে রইল।
"ঠিক আছে। তাহলে শোনো। তোমার প্রজেক্ট আমি দেখেছি। R.H Logistics। তেজগাঁওয়ের ওই গুদামটা নিয়ে। আইডিয়া খারাপ না। কিন্তু নাম্বারগুলো কাঁচা।"
রায়ান থমকাল। "আপনি আমার প্রজেক্ট দেখেছেন?"
"আমি তোমার টাকা আটকেছি। অবশ্যই দেখেছি। তুমি গত তিন কোয়ার্টারে লস করেছো।"
"স্টার্টআপ লস করেই—"
"স্টার্টআপ লস করে, বোকামি করে না। তুমি একটা রুটে তিনটা গাড়ি নামিয়েছো যেখানে একটাই লাগে।"
রায়ান চুপ। অর্ণব অবাক হয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে আছে।
নিশি ব্যাগ থেকে একটা প্রিন্টআউট বের করল। "এটা আমার নোট। কোথায় কাটছাঁট করবে, কোথায় বাড়াবে। এটা ঠিক করো। তারপর আমি ফান্ডিং ছাড়ব।"
রায়ান কাগজটা নিল না। "আপনি আমাকে করুণা করছেন?"
"না। আমি আমার টাকা বাঁচাচ্ছি। তুমি যদি ডুবে যাও, আমার টাকাও ডুববে। আমি লস করি না।"
"আপনি আমাকে পছন্দ করেন না।"
"ঠিক। করি না। তুমি আমার সংসারে ঢুকে পড়েছো, আমার স্বামীকে মিথ্যাবাদী বানিয়েছো, আমার কোম্পানির টাকা খাচ্ছো। তোমাকে পছন্দ করার কোনো কারণ নেই।"
রায়ান হাসল। প্রথমবার। তিক্ত হাসি। "ফাইনালি। সত্যি কথা।"
"আমি সবসময় সত্যি কথাই বলি। তোমার বাবারা বলে না।"
"তাহলে একটা সত্যি কথা আমিও বলি। আমি জানি না আমি কার ছেলে। কিন্তু আমি জানি আমি কার মতো জেদি।" রায়ান কাগজটা টেবিল থেকে তুলে নিল। "আপনার নোট আমি পড়ব। ভুল থাকলে ছিঁড়ে ফেলব। ঠিক থাকলে মানব।"
নিশি বলল, "ফেয়ার।"
অর্ণব বলল, "তোমরা দুজন আসলেই—"
"বলবেন না আমরা একরকম," নিশি আর রায়ান একসঙ্গে বলল। তারপর দুজনেই থেমে গেল।
সন্ধ্যায় নিশি বাড়ি ফিরল। অভিক সোফায় বসে ছিল। ল্যাপটপ বন্ধ।
"রায়ানের সঙ্গে দেখা করেছো?"
"হ্যাঁ।"
"ও... কেমন আছে?"
নিশি ব্যাগ থেকে রুবিনার চিঠিটা বের করে টেবিলে রাখল।
"এটা পড়ো।"
অভিক চিঠিটা খুলল। পড়তে পড়তে ওর মুখ সাদা হয়ে গেল।
"এটা... এটা কোথায় পেলে?"
"তোমার ছেলের কাছে।"
"ও আমার ছেলে না-ও হতে পারে।"
"আমি জানি।" নিশি ওর দিকে তাকাল। "তুমি জানতে রুবিনা আমাকে চিঠি লিখেছিল?"
"না।"
"তুমি জানতে রুবিনা আমাকে চিনত?"
"না।"
"তুমি কী জানতে, অভিক?"
অভিক চিঠিটা টেবিলে রাখল। হাত কাঁপছে।
"আমি জানতাম রুবিনা প্রেগন্যান্ট। আমি জানতাম বাচ্চাটা আমারও হতে পারে, অর্ণবেরও হতে পারে। আমি জানতাম রুবিনা কাউকে বলবে না। তাই আমি ঠিক করেছিলাম... যদি বাচ্চাটা আমার না-ও হয়, আমি ওর দায়িত্ব নেব। কারণ অর্ণব নেবে না। ও পালাবে।"
"আর আমাকে বলোনি কেন?"
"কারণ তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে।"
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
"তুমি ঠিক। আমি চলে যেতাম।"
অভিক চোখ তুলল।
"তখন যেতাম," নিশি বলল। "এখন জানি না।"
অভিক উঠে দাঁড়াতে গেল। নিশি হাত তুলে থামাল।
"এখন না। আমাকে একটু সময় দাও। আমি রায়ানের ফান্ডিং ছেড়ে দিয়েছি। ওর প্রজেক্ট আমি দেখব। ওর বাবা কে সেটা আমি জানি না। জানতেও চাই না এখন। কিন্তু ও যদি আমার কোম্পানির টাকা নেয়, ওকে আমার নিয়মে চলতে হবে।"
"তুমি ওকে মেনে নিচ্ছো?"
"না। আমি ওকে সহ্য করছি। মেনে নেওয়া আর সহ্য করা এক জিনিস না।"
অভিক হাসল। অল্প। "তুমি একটুও বদলাওনি।"
"তুমিও না। তুমি এখনো ভাবো তুমি একাই সব ঠিক করতে পারবে।"
দুজনেই চুপ। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। নিচের টং দোকানের কেটলির শিস শোনা যাচ্ছে। মিরপুরের সেই শব্দ।
নিশির ফোন বাজল। অচেনা নম্বর। ধরল।
"ম্যাডাম নিশি হোসেন?"
"বলছি।"
"আমি R.H Logistics থেকে বলছি। রায়ান স্যার অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। তেজগাঁওয়ের গুদামের সামনে।"
নিশি উঠে দাঁড়াল।
"কতটা খারাপ?"
"আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। উনি বারবার একটা নাম বলছেন—"
"কী নাম?"
"নিশি।"
ফোনটা কেটে গেল। অভিক তাকিয়ে আছে।
"কী হয়েছে?"
নিশি ব্যাগটা হাতে নিল। চাবি খুঁজছে। হাত কাঁপছে। এবার রাগে না।
"রায়ান। অ্যাক্সিডেন্ট।"
অভিক উঠে দাঁড়াল। "আমি গাড়ি বের করছি।"
নিশি দরজার দিকে যেতে যেতে থেমে গেল। ঘুরল।
"অভিক।"
"হুম?"
"ও যদি... ও যদি কিছু হয়ে যায়, আমি নিজেকে কখনো মাফ করতে পারব না। আজ সকালে আমি ওকে বলেছি আমি ওকে পছন্দ করি না।"
অভিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
"তুমি ওকে পছন্দ করো না। তুমি ওকে ভয় পাও। কারণ ও তোমার মতো।"
নিশি আর কিছু বলল না। দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
চলবে...
পর্ব ৫: রক্তের হিসাব
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।