ধারাবাহিক গল্প
গোপন উত্তরাধিকার
পর্ব ৬: শেষ গোপন নথি
২০ জুন, ২০২৬
মিতু রহমান দেখতে রায়ানের মতো না।
এটাই নিশির প্রথম চিন্তা।
বয়স বাইশ-তেইশ হবে। চুল ছোট করে কাটা। কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ, এক কোণে সেলাই খুলে গেছে। চোখ লাল, কিন্তু কাঁদছে না।
হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে ঢুকে সরাসরি নিশির দিকে তাকাল।
"আপনি নিশি আন্টি?"
নিশি উঠে দাঁড়াল। "হ্যাঁ। তুমি মিতু?"
মিতু মাথা নাড়ল। তারপর অভিকের দিকে তাকাল। তারপর অর্ণবের দিকে।
"আপনারা দুজনের মধ্যে কে আমার বাবা?"
করিডোরে একটা ট্রলি ক্যাঁচক্যাঁচ করে চলে গেল। কেউ উত্তর দিল না।
মিতু হাসল। তিক্ত হাসি। নিশির মতো। রায়ানের মতো।
"ঠিক আছে। আমিও জানি না। মা কখনো বলেনি।"
অভিক বলল, "রুবিনা... রুবিনা তোমার মা?"
"হ্যাঁ। রুবিনা হোসেন। আপনারা দুজনেই চিনতেন, তাই না?"
অর্ণব চোখ নামিয়ে নিল।
নিশি বলল, "ভেতরে চলো। রায়ান জেগে আছে।"
---
রায়ান মিতুকে দেখে উঠে বসতে গেল। নার্স ধমক দিল।
"তুই এখানে কী করছিস?"
মিতু বলল, "তোর অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে তোর বস ফোন করেছিল। আমি বাসে উঠে চলে এসেছি।"
"আমি ঠিক আছি।"
"দেখতেই পাচ্ছি। মাথা ফাটিয়ে ঠিক থাকা যায়, জানতাম না।"
দুই ভাইবোনের ঝগড়া দেখে নিশির বুকের ভেতরটা একটু হালকা হলো। অদ্ভুতভাবে। তারপর আবার ভারী হলো। কারণ এই দুটো বাচ্চা একই মায়ের, কিন্তু বাবা আলাদা হতে পারে। আবার একইও হতে পারে। কেউ জানে না।
মিতু ব্যাগ থেকে একটা মলাট ছেঁড়া ডায়েরি বের করল।
"মায়ের।"
রায়ান বলল, "এটা তো আমার কাছে থাকার কথা ছিল।"
"তোর কাছে চিঠি ছিল। আমার কাছে ডায়েরি। মা ভাগ করে দিয়ে গেছে। যাতে আমরা দুজন একসঙ্গে না বসলে পুরো গল্পটা না পাই।"
নিশি বলল, "স্মার্ট মহিলা।"
মিতু নিশির দিকে তাকাল। "আপনি আমার মাকে চিনতেন?"
"না। তোমার মা আমাকে চিনত।"
মিতু ডায়েরিটা নিশির দিকে বাড়িয়ে দিল।
"তাহলে এটা আপনার পড়া উচিত। শেষ পাতাটা।"
ডায়েরির শেষ পাতা। তারিখ নেই। কালি ছড়িয়ে গেছে, যেন পানি পড়েছিল।
"আমি অভিককে ভালোবাসতাম। অর্ণব আমাকে ভালোবাসত। আমি দুজনের কাউকেই ঠকাতে চাইনি। তাই কাউকে বেছে নিইনি।
রায়ান যখন হলো, আমি কাউকে বলিনি ওর বাবা কে। কারণ আমি নিজেও নিশ্চিত ছিলাম না।
মিতু যখন হলো, তখন আমি নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু ততদিনে অভিকের বিয়ে হয়ে গেছে নিশির সঙ্গে। আমি নিশিকে দেখেছিলাম ক্যান্টিনে। ওর চোখে যে জেদ, সেটা আমার চেনা। ও লড়বে। আমি লড়তে চাই না।
আমি আমার দুই বাচ্চাকে একটা কথা বলে যাব - তোমাদের বাবার নামে কিছু চেও না। নিজের নামে কিছু করো। যদি কোনোদিন দরজা বন্ধ হয়ে যায়, নিশি হোসেনের দরজায় যেও। ও ফিরিয়ে দেবে না। কেন জানি না, আমার মনে হয় ও ফিরিয়ে দেবে না।
রুবিনা"
নিশি ডায়েরিটা বন্ধ করল। হাত কাঁপছে। এবার লুকানোর চেষ্টা করল না।
মিতু বলল, "মা ঠিক ছিল?"
নিশি চোখ তুলল। "কী ব্যাপারে?"
"আপনি ফিরিয়ে দেবেন না?"
ঘরে সবাই তাকিয়ে আছে। অভিক, অর্ণব, রায়ান বেডে আধশোয়া।
নিশি ডায়েরিটা মিতুর হাতে ফেরত দিল।
"তোমার মা ভুল করেছে একটা জায়গায়।"
"কী?"
"আমি ফিরিয়ে দিই। আমি সবাইকে ফিরিয়ে দিই। আমি আমার স্বামীকেও ফিরিয়ে দিতে পারি, যদি দরকার হয়।"
মিতুর মুখ শক্ত হয়ে গেল। রায়ান চোখ বন্ধ করল।
নিশি বলে চলল, "কিন্তু তোমার মা একটা জায়গায় ঠিক ছিল। আমি লড়ি। আর আমি লস করি না।"
ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করল। R.H Logistics এর ফান্ডিং পেপার। যেটা দুই সপ্তাহ আগে বাতিল করেছিল।
"রায়ান, তোমার প্রজেক্ট। আমি সই করে দিয়েছি। টাকা ছাড় হবে কাল।"
রায়ান তাকাল। "শর্ত?"
"তিনটা। এক, আমার দেওয়া রুট প্ল্যান মানবে। দুই, প্রতি মাসে আমার কাছে রিপোর্ট করবে, তোমার বাবার কাছে না। তিন..."
নিশি মিতুর দিকে তাকাল।
"তিন, তোমার বোনকে তোমার কোম্পানিতে নেবে। ফাইন্যান্স দেখবে ও। ওর চোখ দেখে মনে হচ্ছে ও টাকা গুনতে জানে।"
মিতু বলল, "আমি আপনাদের দয়া চাই না।"
"এটা দয়া না। এটা ইনভেস্টমেন্ট। আমি তোমার ভাইয়ের কোম্পানিতে টাকা দিচ্ছি। আমি চাই কেউ একজন আমার টাকা পাহারা দিক। তুমি তোমার ভাইকে বিশ্বাস করো না, তাই না?"
মিতু একটু হাসল। "একদম না। ও গাধা।"
রায়ান বলল, "এই!"
নিশি ফাইলটা রায়ানের বেডের পাশে রাখল।
"সই করো। সুস্থ হলে কাজে নামবে।"
রায়ান সই করল। হাত কাঁপছে।
মিতু বলল, "আমি সই করব না। আমি আপনাদের কোম্পানির কেউ না।"
নিশি বলল, "ঠিক। তুমি আমার লোক। আমার কোম্পানির না। আমার পার্সোনাল। বেতন আমি দেব। রিপোর্ট আমাকে করবে।"
মিতু তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, "আপনি খুব খারাপ মানুষ, তাই না?"
"হ্যাঁ।"
"ভালো। আমিও।"
দুজনে হাত মেলাল।
করিডোরে অভিক অপেক্ষা করছিল। একা। অর্ণব চলে গেছে।
"কী হলো ভেতরে?"
নিশি বলল, "আমি তোমার ছেলের কোম্পানিতে টাকা দিয়েছি। আর তোমার মেয়েকে চাকরি দিয়েছি।"
অভিক থমকাল। "মেয়ে?"
"মিতু। রুবিনার মেয়ে। তোমারও হতে পারে, অর্ণবেরও হতে পারে। আমি জানি না। জানতেও চাই না এখন।"
"নিশি..."
"অভিক।" নিশি ওর দিকে তাকাল। "আমি ওদের বাঁচাচ্ছি না। আমি আমার টাকা বাঁচাচ্ছি। আর..."
থামল।
"আর?"
"আর রুবিনা ঠিক ছিল। আমি ফিরিয়ে দিতে পারি না। চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি।"
অভিক কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।
নিশি বলল, "বাড়ি চলো। আমি ক্লান্ত।"
দুজনে লিফটের দিকে হাঁটল। পাশাপাশি, কিন্তু একটু দূরত্ব রেখে।
লিফটের দরজা খুলল। ভেতরে অর্ণব দাঁড়িয়ে। হাতে একটা খাম।
"নিশি। এটা রুবিনা আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, যদি কোনোদিন তুমি রায়ান আর মিতুকে মেনে নাও, তাহলে এটা তোমাকে দিতে।"
নিশি খামটা নিল না। "কী আছে এতে?"
"DNA রিপোর্ট। রায়ান আর মিতুর। ওরা দুই ভাইবোন..."
অর্ণব থামল।
"ওরা দুই ভাইবোন কী?"
"ওরা দুই ভাইবোন না।"
নিশির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
"মানে?"
"মানে রুবিনার দুই বাচ্চার বাবা দুজন আলাদা মানুষ। রায়ানের বাবা একজন। মিতুর বাবা আরেকজন।"
লিফটের দরজা বন্ধ হতে শুরু করল।
অভিক হাত দিয়ে আটকাল।
"তাহলে কে কার বাবা?"
অর্ণব খামটা নিশির হাতে গুঁজে দিল।
"ভেতরে লেখা আছে। আমি পড়িনি। রুবিনা বলেছিল, এটা শুধু নিশি পড়বে। কারণ সিদ্ধান্তটা ওর।"
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। নিশি, অভিক, আর একটা খোলা না হওয়া খাম, তিনজন নিচে নামছে।
নিশি খামটার দিকে তাকিয়ে আছে। খুলবে কি খুলবে না, ঠিক করতে পারছে না।
চলবে...
পর্ব ৭: উত্তরাধিকার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।