ধারাবাহিক গল্প
গোপন উত্তরাধিকার
পর্ব ১: পুরনো ফাইল
২০ জুন, ২০২৬
বৃষ্টি নামার ঠিক আগে শহরটার একটা আলাদা গন্ধ হয়।
সেদিনও হয়েছিল।
মিরপুর ১০-এর ভেতরের গলিগুলো ভিজবে ভিজবে করছে। আকাশটা সীসার মতো ভারী। বাতাসে কাঁচা মাটি আর ড্রেনের জলের মিশেল গন্ধ।
নিশি সিএনজির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। চুপচাপ।
বারো বছর পর সে এই এলাকায় ফিরেছে।
সেই আটশো বর্গফুটের ফ্ল্যাটটা। যেখানে একসময় তাদের পুরো পৃথিবীটা একটা নড়বড়ে সেগুন কাঠের টেবিল আর নীলচে হয়ে যাওয়া একটা সোফার মধ্যে আটকে ছিল।
আজ তাদের কোম্পানির নাম বিলবোর্ডে ওঠে। কিন্তু বড় হওয়া মানেই নিরাপদ হওয়া না, সম্ভবত কখনোই ছিল না।
ফ্ল্যাটের চাবিটা এখনো নিশির ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতরের চেইন পকেটে থাকে।
দুই বছর আগে অভিক বলেছিল, "বেচে দিই। ফ্ল্যাটটা এমনি পড়ে আছে, শুধু সার্ভিস চার্জ যাচ্ছে।"
নিশি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলেছিল, "না।"
কেন না, সেটা আর ভাঙেনি।
দরজা খুলতেই বন্ধ ধুলোর একটা ঝাপটা নাকে এলো।
ভেতরটা প্রায় আগের মতোই আছে। দেয়ালের সেই ঘড়িটা, যেটা ৩টা ১৭-তে থেমে আছে আজ কত বছর। ফিকে হয়ে যাওয়া একটা বিয়ের ছবি। ছবির দুজন মানুষ হাসছে, তারা তখনো জানে না ভবিষ্যৎ ঠিক কতটা প্যাঁচানো হতে পারে।
বুকশেলফের কোণে একটা খালি ভেলভেটের বাক্স পড়ে ছিল। নিশির বিয়ের চুড়ির বাক্সটা। সে এক সেকেন্ডের জন্য ওটার দিকে তাকাল, তারপর মুখ ফিরিয়ে নিল।
সে এখানে স্মৃতি হাতড়াতে আসেনি।
দুই দিন আগে অফিসে একটা বাদামী খাম এসেছিল। প্রেরকের নাম, ঠিকানা কিছুই নেই।
ভেতরে শুধু একটা ৪R সাইজের ছবি।
একজন তরুণ। বাইশ-তেইশ হবে বয়স। চোখে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস।
ছবির পেছনে কিছু লেখা নেই। শুধু একটা তারিখ, নীল কালিতে।
নিশি ছবিটা প্রথমে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল। পাঁচ মিনিট পর আবার তুলে এনেছে।
কারণ ছেলেটার চোখের ভঙ্গিটা তার চেনা মনে হয়েছিল। অস্বস্তিকর রকমের চেনা।
সে অভিককে কিছু বলেনি। অভিক চাপের মধ্যে মিথ্যা বলতে পারে না ঠিকই, কিন্তু পুরো সত্যটাও সে সহজে বলে না। কখনোই বলত না।
নিশি ঠিক করেছিল, আগে নিজে দেখবে। তারপর প্রশ্ন।
স্টোররুমের স্টিলের আলমারিটা জ্যাম হয়ে ছিল। নিশি একটানে খুলল। ধুলো উড়ল এক ঝাঁক।
একটার পর একটা ফাইল। পুরনো ইলেকট্রিক বিল, ভ্যাটের রসিদ, ব্যাংকের স্টেটমেন্ট।
প্রায় এক ঘণ্টা পর একটা ধূসর ফোল্ডার পেল।
উপরে কালো মার্কারে হাতে লেখা - R.H Project
ভেতরে প্রথম পাতাতেই সেই ছেলেটার ছবি। একই ছবি, শুধু এটা প্রিন্ট করা, পরিষ্কার।
নিচে কিছু হিসাবের শিট। সিঙ্গাপুর থেকে আসা কয়েকটা ওয়্যার ট্রান্সফারের কাগজ। গুলশানের একটা ফ্ল্যাটের দলিলের ফটোকপি।
নিশির হাত কাঁপছিল না। বরং আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে যাচ্ছিল।
শেষ পাতায় একটা হলুদ স্টিকি নোট।
"রায়ানের বিষয়টি এখনো গোপন থাকবে। সময় না আসা পর্যন্ত।"
নিচে কোনো পুরো স্বাক্ষর নেই। শুধু দুটো অক্ষর।
A.R
নিশি নোটটা দুইবার পড়ল। তারপর আবার।
A.R.
অভিক রহমান। এটাই তো সবচেয়ে সহজ হিসাব।
নাকি...
নিশির মাথায় আরেকটা নাম এসে ধাক্কা দিল, যে নামটা সে বারো বছর ধরে মুখে আনতে চায় না।
অর্ণব রহমান। অভিকের বড় ভাই।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে অভিক।
নিশি ধরল না। দ্বিতীয়বার বাজল। তৃতীয়বার।
চতুর্থবারে ধরল।
"কোথায় তুমি?"
"তোমার কী দরকার?"
"ড্রাইভার বলল তুমি মিরপুরের দিকে গেছো।"
তাহলে এইভাবে জেনেছে। কোনো গোপন ক্যামেরা না, কোনো ফাইল ট্র্যাকার না। শুধু ড্রাইভার রফিক ভাইয়ের একটা ফোন।
"হ্যাঁ। পুরনো ফ্ল্যাটে।"
একটু নীরবতা। লাইনের ওপাশে এসির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
"কেন?"
নিশি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
"R.H Project কী, অভিক? রায়ান কে?"
ওপাশে নিঃশ্বাসটা আটকে গেল। স্পষ্ট শোনা গেল।
"নিশি, তুমি... তুমি ওই ফাইলটা কোথায় পেলে?"
"আমি পেয়েছি। এটাই তোমার প্রথম প্রশ্ন? আমি কোথায় পেলাম? ছেলেটা কে, সেটা না?"
"শোনো—"
"না। এখন আর না। দশ বছর ধরে তুমি শোনাচ্ছো। এবার আমি বলব, তুমি শুনবে।"
অভিক চুপ করে গেল। নিশির গলা কাঁপছিল, রাগে।
"তুমি বাসায় আসো। আমরা কথা বলি।"
"কথা তো তুমি এড়িয়ে যাও। আমি এড়াই না। আমি এখানেই আছি। তোমার সাহস থাকলে এখানে এসো।"
নিশি ফোনটা নিজে কেটে দিল। এই প্রথমবার।
ফাইলটা ব্যাগে ঢোকাতে গিয়ে ছবিটা মেঝেতে পড়ে গেল। নিশি তুলল না। এক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পা দিয়ে সরিয়ে দিল, তারপর আবার নিচু হয়ে তুলে নিল। ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। নিচের টং দোকানের কেটলিতে পানি ফুটছে। শিসের শব্দটা তিনতলা পর্যন্ত ভেসে আসছে।
টেবিলের ওপর ফোনটা পড়ে আছে। স্ক্রিনটা অন্ধকার।
নিশি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার সামনে এখন একটা প্রশ্ন না, দুটো।
রায়ান কার ছেলে?
আর A.R. - এই দুটো অক্ষর আসলে কার?
চলবে...
পর্ব ২: টাকার গন্ধ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।