ধারাবাহিক গল্প
গোপন উত্তরাধিকার
পর্ব ৫: রক্তের হিসাব
২০ জুন, ২০২৬
হাসপাতালের করিডোরে টিউবলাইটটা ভনভন করছে।
রাত একটা দশ।
নিশি বেঞ্চে বসে আছে। কোটটা ভাঁজ করে কোলে রাখা। হাত দুটো শক্ত করে ধরা। কাঁপছে না। অন্তত বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
অভিক দুইবার কফি এনে দিয়েছে। দুইবারই ঠান্ডা হয়ে গেছে। নিশি ছোঁয়নি।
ডাক্তার বের হলেন।
"হেড ইনজুরি। সিরিয়াস না, মনে হচ্ছে। জ্ঞান ফিরেছে। তবে এখন কথা বলাবেন না।"
নিশি উঠে দাঁড়াল। "আমি দেখতে পারি?"
"আপনি...?"
"আমি নিশি হোসেন।"
ডাক্তার মাথা নাড়লেন। "পাঁচ মিনিট। একজন।"
অভিক বলল, "তুমি যাও।"
নিশি তাকাল। "তুমি যাবে না?"
"ও আমার নাম বলেনি। তোমার নাম বলেছে।"
রায়ানের মাথায় ব্যান্ডেজ। বাঁ হাতে স্যালাইন চলছে। চোখ আধা খোলা।
নিশি চেয়ারটা টেনে বসল। কিছু বলল না প্রথমে।
রায়ান ফিসফিস করল, "আপনি এসেছেন।"
"না এসে উপায় ছিল? তুমি হাসপাতালের লোককে আমার নাম বলে বলে পাগল করে দিয়েছো।"
রায়ানের ঠোঁটের কোণে একটু হাসি। "আর কাকে বলব? বাবার নাম তো জানি না।"
নিশির বুকের ভেতরটা একটু মোচড় দিল। ও মুখটা শক্ত রাখল।
"ডাক্তার বলেছে কথা বলবে না। চুপ করো।"
"আপনি সকালে বলেছিলেন আপনি আমাকে পছন্দ করেন না।"
"হ্যাঁ। এখনো করি না।"
"তাহলে এসেছেন কেন?"
নিশি উত্তর দিল না। ব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল। রায়ানের প্রজেক্টের নোটটা। যেটা সকালে দিয়েছিল।
"তোমার রুট প্ল্যান। আমি ঠিক করে দিয়েছি। তিনটা গাড়ির জায়গায় দুটো। ড্রাইভারদের শিফট বদলেছি। পড়ে দেখো। যখন চোখ খুলতে পারবে।"
রায়ান কাগজটার দিকে তাকাল। "আমি তো মরেও যেতে পারতাম। আপনি প্রজেক্ট নিয়ে এসেছেন?"
"তুমি মরোনি। আর আমার টাকা মরতে দেব না।"
রায়ান হেসে ফেলল। তারপর কাশল। ব্যথা পেল। "আপনি আসলেই..."
"কী?"
"আমার মায়ের মতো। উনিও এরকম ছিলেন। মুখে কঠিন, ভেতরে..."
"ভেতরে কিছু নেই।" নিশি উঠে দাঁড়াল। "পাঁচ মিনিট শেষ। ঘুমাও।"
দরজার কাছে গিয়ে থামল। ঘুরল না।
"আর হ্যাঁ। তোমার ফান্ডিং আমি ছাড়িনি। হোল্ডে রেখেছি। সুস্থ হয়ে প্রজেক্ট ঠিক করো, তারপর পাবে।"
রায়ান বলল, "থ্যাংক ইউ।"
নিশি বলল, "ওয়েলকাম না।"
বেরিয়ে এলো।
করিডোরে অভিক দাঁড়িয়ে। অর্ণবও এসেছে। কোট ভেজা। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।
অর্ণব বলল, "ও কেমন আছে?"
নিশি বলল, "বেঁচে আছে। তোমাদের দুজনের মতো জেদি। সহজে মরবে না।"
অভিক বলল, "নিশি, আমাদের DNA টেস্ট করানো উচিত।"
নিশি আর অর্ণব প্রায় একসঙ্গে বলল, "না।"
অভিক থমকাল। "মানে?"
অর্ণব বলল, "রুবিনা চায়নি।"
নিশি বলল, "আর আমি চাই না রায়ান জানুক ও কার ছেলে। এখন না। ও আগে দাঁড়াক। নিজের পায়ে। তারপর জানবে ওর রক্তে কে আছে।"
অভিক তাকিয়ে রইল। "তুমি ওকে প্রোটেক্ট করছো?"
"না।" নিশি ব্যাগ থেকে রুবিনার চিঠিটা বের করল। ভাঁজ খুলল। "আমি এই চিঠিটা প্রোটেক্ট করছি।"
চিঠির নিচে আরও দুটো লাইন ছিল, যেটা নিশি সকালে রায়ানকে পড়ে শোনায়নি।
অভিক পড়ল।
"যদি কোনোদিন আমার ছেলে তোমার দরজায় আসে, ওকে ফিরিয়ে দিও না। আমি জানি তুমি পারবে না। কারণ তুমি যাকে ভালোবাসো, তাকে ছাড়তে পারো না। এমনকি সে যদি তোমাকে কষ্টও দেয়।
পুনশ্চ - ওর জন্ম তারিখ ১৪ই ফেব্রুয়ারি। ওর বাবার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ঠিক এক বছর আগে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে, তেজগাঁওয়ের ওই গুদামে।"
অভিকের হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।
অর্ণব কাগজটা তুলল। তারিখটা পড়ল। মুখ সাদা হয়ে গেল।
নিশি বলল, "১৪ই ফেব্রুয়ারি। ভ্যালেন্টাইন্স ডে। তেজগাঁওয়ের গুদাম। তোমরা দুই ভাইয়ের মধ্যে কে ছিল সেদিন ওখানে?"
কেউ উত্তর দিল না।
কারণ দুজনেই ছিল।
অভিক ফিসফিস করল, "ওই দিন... ওই দিন আমি আর অর্ণব দুজনেই গুদামে ছিলাম। রুবিনা ইনভেন্টরি করতে এসেছিল।"
অর্ণব বলল, "আমি আগে বেরিয়ে গিয়েছিলাম।"
অভিক বলল, "আমি পরে।"
নিশি দুজনের দিকে তাকাল। একবার অভিক, একবার অর্ণব।
"তাহলে? কে?"
কেউ জানে না।
করিডোরের শেষ মাথা থেকে নার্স ডাকল, "রায়ান হোসেনের বাড়ির লোক কে?"
তিনজনেই একসঙ্গে ঘুরল।
কেউ এগোল না।
নিশি একটা নিঃশ্বাস নিল। তারপর বলল,
"আমি। আমাকে বলুন।"
নার্স বলল, "পেশেন্টের ফোনে বারবার কল আসছে। একটা নম্বর থেকে। আমরা ধরিনি। আপনি একটু দেখবেন?"
নিশি ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ১৭টা মিসড কল। সব একই নম্বর থেকে। নাম সেভ করা নেই।
কলটা আবার এলো। নিশি ধরল।
"হ্যালো, রায়ান?"
ওপাশে একটা মেয়ের গলা। অল্পবয়সী। কাঁপছে।
"আপনি কে? রায়ান কোথায়?"
"আমি নিশি। রায়ান হাসপাতালে। আপনি কে?"
একটু নীরবতা। তারপর—
"আমি রায়ানের বোন।"
নিশির হাত শক্ত হয়ে গেল ফোনের উপর।
"কী বললেন?"
"আমি বললাম আমি রায়ানের বোন। ওর মা আমার মা-ও। বাবা... বাবা আলাদা। আপনি কি নিশি আন্টি? মা আপনার কথা লিখে গিয়েছিল ডায়েরিতে। বলেছিল, যদি কখনো বিপদে পড়ি, আপনাকে ফোন করতে।"
পেছনে অভিক আর অর্ণব তাকিয়ে আছে।
নিশি ধীরে বলল, "তোমার নাম কী?"
"মিতু। মিতু রহমান।"
ফোনটা নিশির হাতে ভাইব্রেট করছে। নাকি ওর হাত কাঁপছে, বোঝা যাচ্ছে না।
চলবে...
পর্ব ৬: শেষ গোপন নথি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।