চুরি হওয়া স্বপ্ন
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
তুমি কি কখনো থেমে ভেবে দেখেছ—তোমার বাবা-মা যখন তোমার বয়সী ছিলেন, তখন তাঁদের জীবন কতটা আলাদা ছিল?
একটা চাকরি পেলেই সংসার শুরু করা যেত। কয়েক বছর পর একটা ছোট বাড়ি কেনার স্বপ্ন অযৌক্তিক ছিল না। ভবিষ্যৎটা অনিশ্চিত মনে হলেও, ভাঙা মনে হতো না।
আর আজ?
২০২৫ সালের শেষে দাঁড়িয়ে আমরা—চাকরি অনিশ্চিত, বাড়ি তো দূরের কথা, মাসের শেষটা টানতে পারলেই যেন যুদ্ধ জেতা হয়।
এটা কি শুধু আমার ব্যর্থতা? নাকি তোমার?
না।
এটা একটা গভীর প্রজন্মগত বিশ্বাসঘাতকতা।
আমি যখন এসব ভাবি, মাথার ভেতর একটা ছবিই ঘুরতে থাকে। আমরা যুবকরা যেন একটা ভাঙা সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে আছি। উপরের প্রজন্ম সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছে—শিক্ষা, চাকরি, স্থিতিশীলতা, সম্পদ। আর আমাদের জন্য?
সিঁড়িটাই ভেঙে ফেলা হয়েছে। সামনে তাকালে শুধু শূন্যতা, নিচে তাকালে ক্লান্তি।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আয়ের অসমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ধনীদের সম্পদ বাড়ছে তিনগুণ গতিতে। আর আমরা?
বেকারত্ব, মানসিক অবসাদ, একাকিত্ব—সবই রেকর্ড উচ্চতায়।
অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরেই বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ বেড়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ যুব বেকারত্ব বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪ শতাংশ ছুঁয়েছে। বাড়ির দাম আকাশছোঁয়া। স্টুডেন্ট লোনের বোঝা কাঁধে চেপে বসে আছে।
এই সংখ্যাগুলো পড়লে আমার বুকের ভেতর কেমন জানি চেপে আসে। কারণ এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটাই আমাদের জীবন।
আমরা স্বপ্ন দেখি, কিন্তু হাত বাড়ালেই শূন্যতা। অনেক সময় নিজেকেই প্রশ্ন করি—আসলে কি আমরা বেশি কিছু চাইছি?
নাকি ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকুও এখন বিলাস?
আমি এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা বলি কেন?
কারণ পুরনো প্রজন্মের সিদ্ধান্ত আর নীতিগুলো আমাদের ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলেছে। তাঁরা পেয়েছেন সস্তা শিক্ষা, স্থিতিশীল চাকরি, সাশ্রয়ী বাড়ি। আর তাঁদের সময়ের নীতিগুলো—কর্পোরেটদের কর ছাড়, অবাধ সম্পদ জমা, পরিবেশ ধ্বংস করে তথাকথিত উন্নয়ন—এসব আমাদের জন্য রেখে গেছে ঋণ, অস্থিরতা আর একটা ক্ষতবিক্ষত পৃথিবী।
এই তুলনাটা করতে আমারও ভালো লাগে না। বাবা-মায়ের সঙ্গে লড়াই করতে চাই না। কিন্তু বাস্তবতা চোখ এড়ায় না।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, প্রজন্মগত টেনশন বাড়ছে। আমরা ভাবি পুরনোরা আমাদের বোঝে না। তারা ভাবে আমরা অলস। কিন্তু সত্যটা অন্য জায়গায়—দোষটা ব্যক্তির না, দোষটা সিস্টেমের। একটা সিস্টেম, যেটা ধনীদের জন্য আরও দরজা খুলে দেয়, আর আমাদের জন্য একটার পর একটা বন্ধ করে দেয়।
তবু আমি বিশ্বাস করি, এখানেই শেষ নয়। এই হতাশার ভেতরেই একটা পথ আছে। কিন্তু সেই পথ একা হাঁটা যাবে না। দরকার সলিডারিটি—প্রজন্ম জুড়ে ঐক্য।
পুরনো প্রজন্মকে বুঝতে হবে, তাঁদের সাফল্যের একটা বড় অংশ আমাদের ভবিষ্যৎ গিলে খেয়ে এসেছে। আর আমাদের—যুবকদের—একসাথে দাঁড়িয়ে বলতে হবে, এই ব্যবস্থা আর চলবে না।
আমাদের দরকার নতুন নীতি। প্রগ্রেসিভ ট্যাক্স। ধনীদের ওপর ওয়েলথ ট্যাক্স। সাশ্রয়ী হাউজিং। ফ্রি বা কম খরচে শিক্ষা। মানসিক স্বাস্থ্যের বাস্তব সাপোর্ট। জাতিসংঘ নিজেই বলছে—ইকুইটি আর সলিডারিটি ছাড়া এই সংকট কাটবে না।
আমি নিজে এই চাপটা প্রতিদিন অনুভব করি। রাতের বেলা ভাবি—পাঁচ বছর পর আমি কোথায় থাকব? তুমি কি এমন ভাবো না?
এই হতাশা শুধু আমার বা তোমার নয়। এটা আমাদের পুরো প্রজন্মের। কিন্তু আমরা যদি একসাথে দাঁড়াই—যুবক, পুরনো প্রজন্ম, সবাই—তাহলে এই চুরি হওয়া স্বপ্ন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এটা চুপচাপ পড়ার লেখা না। কমেন্টে তোমার অভিজ্ঞতা লেখো। কথা শুরু করো।
এই পোস্টটা শেয়ার করো, যেন আরও মানুষ বোঝে—সমস্যাটা ব্যক্তিগত না, কাঠামোগত।
ন্যায্যতার দাবিতে একসাথে গলা মেলাই। এখনই।
যদি মনে হয় এই কথাগুলো তোমার মনের ভেতরের চাপের সঙ্গে মিলে যায়—চুপ থেকো না। শেয়ার করো, কথা বলো, দাবি তুলো।
#প্রজন্মগতবিশ্বাসঘাতকতা #চুরিহওয়াস্বপ্ন #অর্থনৈতিকঅসমতা #যুবহতাশা #সলিডারিটি #যুবশক্তি #ইকুইটি #জেনজি #মানসিকস্বাস্থ্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।