অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ৭: পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছি তিন দিন হলো। ১৩/বি, কলাবাগান। পাঁচতলা বাড়ি, লিফট নেই। সিঁড়ির রেলিংয়ে লাল রঙ উঠে গেছে।
প্রথম যে মানুষটার সাথে পরিচয় হলো, তিনি পাশের ১৩/সি-র কাকা।
বয়স ষাটের ঘরে হতে পারে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, বুকপকেটে পুরোনো কাচের চশমা। চোখে পাতলা ফ্রেম। গলার স্বর নরম, বুড়িগঙ্গার স্রোতের মতো লাগে।
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা। আমি অফিস থেকে ফিরে সিঁড়ি ভাঙছি, উনি দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকেন। হাতে মাটির ভাঁড়। এলাচ-দারুচিনির গন্ধ ভেসে আসে।
আমাকে দেখেই হাসেন। আজ এত দেরি? বস রাগ করেছে বুঝি? শার্টের কলার ভাঁজ হয়ে আছে।
আমি অবাক হতাম। উনি কীভাবে জানেন? ব্যাগটা নামিয়ে হেসে বলতাম, অফিসের ঝামেলা, কাকা। আপনি জানলেন কীভাবে? ফাইল ছুড়ে মেরেছে স্যার।
উনি ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বলতেন, মুখ দেখলেই বোঝা যায় বাবা। চাকরি করেছি চল্লিশ বছর, ইপিজেডে। মানুষের কপাল পড়তে পারি।
দশ মিনিট দাঁড়িয়ে গল্প। দেশের কথা, বাজারদর, বর্ষার পানি। আমার বাবার কথা। উনি বাবাকে চিনতেন বলে দাবি করলেন। বলতেন, তোমার বাবা রফিক আমার স্কুলের বন্ধু ছিল। আজিমপুর স্কুলে। খুব রাগী, কিন্তু মনটা নরম।
বাবা মারা গেছেন পনেরো বছর। আমি জিজ্ঞেস করতাম না, কীভাবে চিনলেন। ভালো লাগত। ঢাকা শহরে নতুন ফ্ল্যাটে একজন মুরুব্বি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার হতে পারে। একা একা ভালো লাগে না।
নিশি প্রথম খটকা লাগাল দুই সপ্তাহ পর।
রাতে ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলল, তোমার ওই কাকাটাকে তো কোনোদিন দেখলাম না। গেটের কাছে দেখি না।
আমি ডাল দিয়ে ভাত মাখাচ্ছিলাম। তুমি তখন রান্নাঘরে থাকো। বিকেলে পেঁয়াজ কাটো না? কাকার গলা শোনো না? উনি তো জোরেই বলেন।
নিশি ভ্রু কুঁচকাল। কই না তো। আমি তো বারান্দায় কাপড় মেলি বিকেলে। দরজা খোলা থাকে। ফ্যানের শব্দ ছাড়া কিছু শুনি না। কোনোদিন তো কথা শুনিনি। গন্ধও পাইনি।
আমি হাসলাম। তুমি খেয়াল করো না। কাল ডাকব। পরিচয় করিয়ে দেব। মিষ্টি আনব।
কাল আর এল না।
পরদিন বৃহস্পতিবার। আমি নিশিকে বললাম, আজ এক কাপ চা বেশি করো। কাকাকে দেব। সাথে বিস্কুট।
নিশি ফ্রিজ থেকে ডিম বের করছিল। হাত থেমে গেল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। চোখে ভয় না, কনফিউশন। একটা দাগ।
কার জন্য?
পাশের কাকার জন্য। সাদা পাঞ্জাবি পরেন। চশমা।
নিশি আস্তে করে বলল, অভিক, পাশের ফ্ল্যাটে তো কেউ থাকে না। আমি গতকাল বাড়িওয়ালা আন্টিকে জিজ্ঞেস করেছি। উনি বললেন, পাঁচ বছর ধরে তালা। মামলা চলছে। ছেলেরা আমেরিকায়। চাবি ওদের কাছে।
আমি বিশ্বাস করিনি। মজা করছে। রান্না করতে করতে মাথা গরম।
আরে, আমি রোজ কথা বলি! উনি তো এখনো... গতকাল বললেন, বর্ষায় ইলিশের দাম বাড়বে।
কথা শেষ করতে পারিনি। নিশি আমার হাত ধরল। ওর হাত বরফের মতো ঠান্ডা।
চলো, দারোয়ানের কাছে যাই। আমারও মাথা কাজ করছে না।
জামিল চাচা। দারোয়ান। বিশ বছর এই বিল্ডিংয়ে। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, চাচা, ১৩/সি-তে কে থাকেন? সাদা পাঞ্জাবি পরা কাকা? পান খান?
জামিল চাচা লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর নিশির দিকে। চোখ ছোট হয়ে এল।
স্যার, আপনি কার কথা বলছেন? ১৩/সি-তে তো আজিজ সাহেব থাকতেন। কিন্তু উনি তো... উনি থেমে গেলেন। মাটির দিকে তাকালেন। পাঁচ বছর আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। ইফতারের সময়। তারপর থেকে তালা। পুলিশ এসে সিল করে দিয়েছিল। ছেলেরা বিদেশ। চাবি তাদের কাছে। আমি নিজে লাশ নামিয়েছি।
আমার কানের পাশ দিয়ে গরম হাওয়া গেল। এসি বন্ধ।
মজা করছেন? আমি গতকালও কথা বলেছি! উনি বলেছেন, আমার বাবা তার বন্ধু! রফিক। আজিমপুর স্কুল।
জামিল চাচা মাথা নিচু করলেন। আজিজ স্যার আপনার বাবার কথা বলতেন, স্যার। বলতেন, কলাবাগানের রফিক আমার ক্লাসমেট, খুব রাগী ছিল। কিন্তু স্যার... উনি তো পাঁচ বছর ধরে কবরে। শায়িত আছেন আজিমপুরে।
আমি আর শুনিনি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেছি। পা কাঁপছে।
এরপরের এক মাস আমার না, অন্য কারও জীবন ছিল বলে মনে হয়।
আমি বিকেল পাঁচটায় দরজা খুলে দাঁড়াতাম। বুক ধড়ফড় করত।
কাকা আসতেন। হাসতেন। চোখের কোণে পানি। আজ শরীর খারাপ? চোখ বসা। ঘুম হয়নি?
আমি বলতাম, কাকা, নিশি বলে আপনি নেই। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখেছে।
উনি হাসতেন। পান খাওয়া দাঁত। পাগলি। ওর বয়স কম। চোখে ছানি পড়েছে। বড় হলে দেখবে। আমাকে দেখবে। ওর দাদি মারা গেছে তো, তাই মন খারাপ।
আমরা গল্প করতাম। উনি বলতেন, বাবা স্কুলে কীভাবে টিফিন ভাগ করে খেত। আমি শুনতাম। বাবার ছোটবেলার গল্প কেউ কোনোদিন বলেনি। আমার মার কাছেও শুনিনি।
আমি নিশিকে ডাকতাম। নিশি! কাকা এসেছেন! তাড়াতাড়ি এসো! চা দাও!
নিশি দৌড়ে আসত। চুল এলোমেলো। করিডোর ফাঁকা। শুধু আমি। দেয়ালে টিকটিকি।
নিশি কাঁদত না। চিৎকার করত না। শুধু আমার হাত ধরে বলত, অভিক, আমি এখানে। আমি আছি। ওখানে কেউ নেই। দেয়াল আছে। তুমি দেয়ালের সাথে কথা বলছ।
আমি চিৎকার করতাম, এই তো! এক সেকেন্ড আগেও ছিল! তুমি আসলেই চলে যায় কেন? তুমি বিশ্বাস করো না বলে?
আমার গলা ভেঙে যেত।
জেদ করে একদিন ১৩/সি-র কলিংবেল চাপলাম।
টিং...টং...
ভেতরে ফাঁপা শব্দ। ধুলোর গন্ধ দরজার নিচ দিয়ে আসছে। স্যাঁতসেঁতে।
আবার চাপলাম। টিং...টং... টিং...টং...
জামিল চাচা দৌড়ে এলেন। লাঠি ফেলে। স্যার, কী করছেন! সিল মারা দরজা! পুলিশ কেস হবে! জেল হবে!
আমি দরজায় কান পাতলাম। ভেতরে পিনপতন নীরবতা। অথচ গতকাল কাকা বলেছেন, আমার ঘরে তোমার বাবার ছবি আছে। সাদা-কালো। দেখাব একদিন। স্কুলের শার্ট পরা।
আমার হাঁটু ভেঙে গেল। সিঁড়িতে বসে পড়লাম। টাইলস ঠান্ডা। আমি কি পাগল? মা পাগল ছিল। শেষ বয়সে দেয়ালে মানুষ দেখত। ছায়া দেখত। বলত, ওরা হাঁটে।
ডা. সাবরিনা।
তিন মাস সেশন। সপ্তাহে দুইদিন। ওষুধ। রিসপেরিডন। শুরুতে ১ মিগ্রা, পরে ২ মিগ্রা।
ডাক্তার বললেন, এটাকে গ্রিফ-ইনডিউসড সাইকোসিস বলে। আপনি একা। নতুন জায়গা। বাবার জন্য মন খারাপ। আপনার ব্রেইন ‘বাবার বন্ধু’কে তৈরি করেছে। উনি আপনাকে কমফোর্ট দেন। গাইড করেন। বাবার অভাব পূরণ করেন। এটা রোগ, কিন্তু অপরাধ না। লজ্জা না। অনেকের হয়।
কিন্তু উনি আমার বাবার কথা জানলেন কীভাবে? স্কুলের নাম?
আপনি জানেন। ভুলে গেছেন। হয়তো বাবার ডায়েরি পড়েছেন ছোটবেলায়। বাবা গল্প করেছেন। নামটা সাবকনশাসে ছিল। ব্রেইন সেটা ব্যবহার করেছে। ব্রেইন খুব চালাক।
বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু ওষুধ খেলাম। নিশির মুখের দিকে তাকিয়ে।
প্রথম মাস নরক। মনে হতো কেউ মারা গেছে। খুব কাছের কেউ। বিকেল পাঁচটায় বুকটা হু হু করত। দরজা খুলতাম। করিডোর ফাঁকা। কান পাততাম। না, কারও গলা নেই। বাতাসের শব্দ।
ধীরে ধীরে সয়ে গেল। মানুষ সব সয়ে যায়।
ছয় মাস পর আমি সুস্থ। অফিস করি। প্রমোশন হয়েছে। বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডা। কাকা নেই। ১৩/সি-তে এখনো তালা। মরচে ধরা তালা। আমি তাকাই না। চোখ সরিয়ে নেই।
নিশি বলে, তুমি ফিরে এসেছ। আমার অভিক।
আজ বৃহস্পতিবার। রাত এগারোটা।
আমি আর নিশি চা খাচ্ছি। আদা চা। বারান্দার দরজা খোলা। বৃষ্টি। টিনের চালে শব্দ হচ্ছে।
হঠাৎ—
টক... টক... টক...
তিনবার। ধীরে। থেমে থেমে। যেন ওপাশের মানুষটা জানে আমরা শুনছি। জানালার গ্রিলে পানি পড়ার শব্দ না।
আমি আর নিশি দুজনেই কাপ নামালাম। দুজনেই দরজার দিকে তাকালাম। কাপটা কাঁপছে।
এই প্রথম। নিশিও শুনেছে। ওর চোখে আমি আমার ছয় মাস আগের ভয়টা দেখলাম। একই রকম। চোখের মণি বড় হয়ে গেছে।
আমি উঠলাম। পা টলছে না। ওষুধ খাচ্ছি নিয়মিত। আমি সুস্থ। রিপোর্ট নরমাল। এটা রিয়েল। নিশি শুনেছে মানে রিয়েল। হ্যালুসিনেশন শেয়ারড হয় না।
দরজার কাছে গেলাম। কান পাতলাম। কাঠের দরজা ঠান্ডা।
ওপাশ থেকে শব্দ এল। স্পষ্ট। নরম। নদীর মতো। সেই গলা। ছয় মাস আগে শুনতাম যেটা।
অভিক... আজ চা হবে না? আমি ভিজে গেছি বাবা। ছাতাটা আনতে ভুলে গেছি।
আমার হাত দরজার হাতলে। স্টিলের হাতল। ঠান্ডা। বরফের মতো।
নিশি পেছন থেকে আমার শার্ট খামচে ধরেছে। নখ বসে যাচ্ছে। ফিসফিস করছে, খুলো না। অভিক, দরজা খুলো না। প্লিজ। ওটা কিছু না।
আমি খুলিনি।
কারণ আমি জানি না, দরজার ওপাশে কে। আজিজ সাহেব? নাকি আমার ব্রেইন? নাকি অন্য কিছু?
(চলবে… গল্প ৮: যেদিন বুঝলাম, নিশি নেই)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।