শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–৯ : যে প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে ছিল না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"মা, তুমি কি আমাদেরও ছেড়ে চলে গিয়েছিলে?"
একটা বাক্য।
মাত্র নয়টা শব্দ।
কিন্তু ঘরের সমস্ত বাতাস থেমে গেল যেন। ফ্যানের শব্দটা পর্যন্ত দূরে সরে গেল।
মেঘলা দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। স্কুলব্যাগটা তখনো কাঁধে। চোখ নামায়নি।
মিশি তখনো মায়ের আঙুল ধরে আছে, কিন্তু তার ছোট্ট মুখে কুয়াশা। সে বোঝে না, তবু টের পায়—এই প্রশ্নটা সাধারণ না।
অভিক আর নিশি একবার চোখাচোখি করল। পরমুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নিল দুজনেই।
এই প্রশ্নের জন্য পৃথিবীর কোনো বাবা-মা তৈরি থাকে না।
নিশি এক পা এগিয়ে এল। গলা শুকিয়ে কাঠ।
“এমন কথা বলছিস কেন, মা?”
মেঘলার গলায় কাঁপুনি নেই। আছে জমাট বরফ।
“কারণ অনেকদিন ধরে আমরা আর ‘আমরা’ নেই, মা। স্কুলে ফ্রেন্ডরা যখন বলে ‘কালকে মা-বাবার সাথে কক্সবাজার গিয়েছিলাম’, আমি চুপ করে থাকি। কী বলব? আমার বলার মতো কিছু নেই।”
কথাগুলো অভিযোগ নয়। রায়।
ঘরটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
মিশি এবার বাবার দিকে তাকাল। তারপর মায়ের দিকে। তারপর আবার বাবার দিকে। ছোট মাথায় হিসাব মেলাতে পারছে না।
“তোমরা ঝগড়া করেছ? তাহলে সরি বলো। সরি বললে তো আবার বন্ধু হওয়া যায়। আমরা ক্লাসে তো হই।”
শিশুদের লজিক। সবচেয়ে নির্মম, কারণ সবচেয়ে সত্যি।
নিশির হাঁটু ভেঙে এল। সে মেঝেতে বসে পড়ল, দুই মেয়েকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। গলাটা কাঁপছে, “আমি তোদের ছেড়ে যাইনি, মা। কোনোদিন না।”
বলতে গিয়ে নিজেই থেমে গেল। কারণ পরের লাইনটা সে জানে—“কিন্তু আমি এমন কিছু করেছি, যার জন্য তোরা কষ্ট পাচ্ছিস।”
কথাটা মুখে আনতে পারল না। শুধু মেয়েদের চুলের গন্ধ নিল বুক ভরে।
মেঘলা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল না। সোজা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে জিজ্ঞেস করল, “মানুষ ভুল করলে কি আবার আগের মতো হওয়া যায়?”
প্রশ্নটা নিশির দিকে। কিন্তু উত্তরটা দিল অভিক।
সে এতক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার এগিয়ে এসে মেঘলার কাঁধে হাত রাখল।
“সব ভুল আগের মতো করে শোধরানো যায় না মা। কিছু ভুলের দাগ থেকে যায়। সেই দাগ নিয়েই বাঁচতে হয়।”
মেঘলা বাবার দিকে তাকাল। “তাহলে আমরা কী করব এখন?”
এই ‘আমরা’ শব্দটা ছুরির মতো বসল অভিকের বুকে।
সে মেয়েকে ধরে সোফায় বসাল। মিশিও এসে অন্য পাশে বসল। নিশি সামনের মোড়ায়।
চারজন। এক ফ্রেমে। তবু ছবিটা ভাঙা।
অভিক শান্ত গলায় বলল, “আমরা সত্যিটা মেনে নেব। আর চেষ্টা করব, যাতে তোদের কষ্টটা আর না বাড়ে।”
মিশি ছোট্ট গলায় বলল, “মা তো আমাদের কাছে আসে। কিন্তু রাতে থাকে না। রাতে থাকলে হয় না?”
নিশি চোখ মুছল। সারাদিনের মেকআপ ধুয়ে গেছে। এখন সে শুধু একজন মা, যার কাছে কোনো উত্তর নেই।
“আমি চেষ্টা করব মা। যতটা পারি, তোদের সাথে থাকব। প্রমিস।”
‘প্রমিস’ শব্দটা ঘরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।
সেদিন আর কেউ কথা বাড়াল না।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। নিশি উঠল।
“আমি আসি আজ।”
দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে তাকাল। এই ঘর, এই সোফা, এই দেয়ালের আঁকিবুকি—সব তার। আবার কিছুই তার না। এখন সে এখানে অতিথি। ঘড়ি ধরে আসে, ঘড়ি ধরে যায়।
“অভিক...” ডাকল নিশি।
অভিক দরজা ধরে দাঁড়িয়ে। “বলো।”
“থ্যাংক ইউ। মেয়েদের সামনে সিন ক্রিয়েট করোনি।”
অভিক মাথা নাড়ল। “ওদের আর ভাঙার কিছু নেই।”
দরজা বন্ধ হলো।
মিশি বাবাকে জড়িয়ে ধরল। “বাবা, মা কবে আবার আসবে?”
“শুক্রবারে, মা।”
“আর যদি না আসে?”
“আসবে।”
মেঘলা জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। বাইরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট। নিচে মা হেঁটে যাচ্ছে। একা।
সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল না, “আমরা কেন এমন?” কারণ সে জানে, এই ‘কেন’র উত্তর বড়দের কাছেও নেই।
রাত বারোটা।
দুই মেয়ে ঘুম। অভিক বারান্দায়।
আকাশে চাঁদ নেই। শুধু কালো।
সে হিসাব মেলাচ্ছে।
এই যুদ্ধে কে হারল?
সে হারিয়েছে বিশ্বাস। নিশি হারিয়েছে সংসার।
কিন্তু সবচেয়ে বড় হারটা হয়েছে মেঘলা আর মিশির। তারা হারিয়েছে ‘মা-বাবা’ শব্দটার স্বাভাবিক মানে। এখন থেকে ওদের কাছে ‘পরিবার’ মানে দুটো বাসা, দুটো ফোনকল, আর একরাশ প্রশ্ন।
এই ক্ষতি কোনো আদালতের রায় দিয়ে পূরণ হয় না। কোনো ক্ষমা দিয়ে না।
ফোনটা হাতে নিল অভিক। কন্টাক্ট লিস্টে নিশির নাম।
ডায়াল করল।
ওপাশে রিং হচ্ছে।
একবার। দুইবার। তিনবার।
চারবারের সময় ধরল নিশি। গলাটা বসা। “হ্যালো?”
অভিক লম্বা শ্বাস নিল। “আমার মনে হয়, আমাদের চারজনের একসাথে বসা দরকার।”
ওপাশে নীরবতা।
“ঝগড়া করার জন্য না, নিশি। দোষ দেওয়ার জন্য না। মেয়েদুটোর সামনের দশটা বছর নিয়ে কথা বলার জন্য। ওদের স্কুল, ওদের মন, ওদের ভয়—এগুলো নিয়ে।”
আবার নীরবতা। তারপর খুব আস্তে, খুব ভাঙা গলায় নিশি বলল, “আমি আসব। কবে বলো।”
ফোনটা রাখতেই অভিক বুঝল, সে যা করতে যাচ্ছে, সেটা দ্বিতীয় বিয়ে না, দ্বিতীয় সংসারও না।
সেটা শুধু দুটো ভাঙা মানুষের একসাথে বসে তাদের বাচ্চাদের জন্য একটা ছাতা বানানোর চেষ্টা।
ছাতাটা বৃষ্টি ঠেকাতে পারবে কি না, সে জানে না।
কিন্তু চেষ্টা না করলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।
আর এই সিদ্ধান্তটাই পরের সপ্তাহে সবাইকে চমকে দিতে যাচ্ছে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।