সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-৬
অচেনা আমি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
চোখ খুলেই অভিকের মনে হলো, কোথাও যেন একটা ভুল হচ্ছে।
ঘরটা চেনা।
বিছানাটা চেনা।
জানালার পাশে রাখা ছোট্ট গাছটাও চেনা চেনা লাগছে।
তবু সবকিছু যেন অন্য কারও।
ঠিক তখনই দরজা খুলে একটা মেয়ে ভেতরে এল।
চোখে ঘুম নেই, তবু মুখে হাসি রাখার চেষ্টা।
— ঘুম ভেঙেছে?
অভিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— আপনি... কে?
মেয়েটা থেমে গেল।
মুখের হাসিটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে বলল,
— আমি নিশি।
একটু থেমে আবার বলল,
— তোমার স্ত্রী।
কথাটা শুনেও অভিকের ভেতরে কিছু নড়ল না।
ঘরের দেয়ালে তাদের একসঙ্গে তোলা ছবি।
আলমারিতে পাশাপাশি ঝোলানো কাপড়।
টেবিলে দুটো মগ।
সবকিছুই যেন একটা জীবনকে প্রমাণ করছে।
শুধু সেই জীবনের মানুষটা নিজেই কিছু মনে করতে পারছে না।
ডাক্তার এসে অনেকক্ষণ কথা বললেন।
নাম?
আজ কী বার?
এখন কোথায় আছ?
অভিক নিজের নাম বলতে পারল।
তারপর মাথার ভেতরটা আবার ফাঁকা।
ডাক্তার শুধু বললেন,
— তাড়া দেবেন না। এমন হলে স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরতে পারে।
এরপর দিনগুলো কেমন ধীর হয়ে গেল।
নিশি কোনো দিন জোর করে কিছু মনে করাতে চাইল না।
শুধু পাশে থাকত।
একদিন চা এগিয়ে দিয়ে বলল,
— নাও।
চিনি দিইনি। তুমি এমনই খাও।
অভিক কাপটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো দিন চা খেতই না।
আবার মনে হচ্ছিল, হয়তো খেত।
সে নিজেই আর বুঝতে পারছিল না।
একদিন আলমারি গুছাতে গিয়ে একটা পুরোনো গিটার বের হলো।
ধুলো জমে আছে।
হাতে তুলতেই বুকের ভেতর হালকা একটা টান লাগল।
আঙুল তার ছুঁয়ে গেল।
কিন্তু কোনো সুর ফিরে এল না।
আরেক দিন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিল তারা।
রাস্তার পাশে একজন বৃদ্ধ হেসে বললেন,
— কেমন আছো বাবা?
অভিকও হেসে মাথা নাড়ল।
লোকটা চলে যাওয়ার পর নিশি বলল,
— উনি তোমাদের স্কুলের স্যার।
তোমাকে খুব আদর করতেন।
অভিক অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— অদ্ভুত না?
সবাই আমাকে চেনে।
শুধু আমি কাউকে চিনি না।
নিশি উত্তর দিল না।
হয়তো কোনো উত্তর ছিলও না।
সেদিন রাতে ড্রয়ারের ভেতর একটা নোটবুক পেল অভিক।
প্রথম পাতায় লেখা—
"যদি কোনো দিন সব ভুলে যাও, একটা কথা মনে রেখো—মানুষকে নতুন করে চিনতে ভয় পেয়ো না।"
নিচে তার নিজের স্বাক্ষর।
অনেকক্ষণ ধরে লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল সে।
নিজের হাতের লেখা।
তবু যেন অন্য কারও।
তারপর থেকে স্মৃতিগুলো একটু একটু করে ফিরতে শুরু করল।
বাবার আঙুল ধরে স্কুলে যাওয়া।
মাঠে ক্রিকেট খেলা।
অফিসে প্রথম দিন।
তারপর...
বৃষ্টি।
একটা ছাতা।
আর ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে হাসছে একটা মেয়ে।
এক বিকেলে বারান্দায় বসে অভিক হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— আমাদের প্রথম দেখা... বৃষ্টির দিন ছিল?
নিশি তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ।
খুব বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন।
কথাটা বলার সময় নিশির চোখে ছোট্ট একটা আলো ফুটে উঠেছিল।
অভিকের মনে হলো, সে যেন ধীরে ধীরে নিজের কাছেই ফিরছে।
কিন্তু কয়েক দিন পর হাসপাতালের ছাড়পত্রের কাগজে চোখ পড়তেই সবকিছু আবার থেমে গেল।
শেষ লাইনে লেখা—
"রোগীর বেশির ভাগ স্মৃতি অক্ষত। তীব্র মানসিক আঘাতের কারণে দুর্ঘটনার আগের কিছু স্মৃতি সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ রয়েছে।"
কাগজটা নামিয়ে অভিক নিশির দিকে তাকাল।
— তুমি কি আমাকে কিছু বলোনি?
নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— বলিনি।
— কী?
নিশি নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— দুর্ঘটনার দিন... আমরা আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
তুমি খুব রাগ করে বেরিয়ে গিয়েছিলে।
তারপর...
বাকিটা আর বলতে পারল না।
ঘরটা চুপচাপ হয়ে গেল।
অভিক হঠাৎ বুঝতে পারল, তার মাথা শুধু কিছু স্মৃতি মুছে দেয়নি।
একটা দিনের অসহ্য কষ্টও লুকিয়ে রেখেছিল।
নিশি ধীরে তার হাতটা ধরল।
— ডাক্তার বলেছিলেন, সব মনে পড়তেই হবে এমন না।
কিছু ক্ষত ভুলে যাওয়াও কখনো কখনো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
অভিক জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
বৃষ্টি পড়ছে।
অনেকক্ষণ পরে সে আস্তে বলল,
— আমি মানুষগুলোকে ভুলিনি।
আমি শুধু সেই মানুষটাকে ভুলে গিয়েছিলাম... যে একদিন ভেঙে পড়েছিল।
নিশি কিছু বলল না।
শুধু তার হাতটা ছাড়ল না।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
ভেতরে খুব ধীরে একটা মানুষ নিজের কাছেই ফিরে আসছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।