ধারাবাহিক গল্প
গোপন উত্তরাধিকার
পর্ব ৩: যে সত্যটা অভিক বলেনি
২০ জুন, ২০২৬
ফোনটা তিনবার রিং হয়ে কেটে গেল।
চতুর্থবারে ধরল।
"নিশি?"
গলাটা ভারী। ঘুম জড়ানো না, ক্লান্ত। যেন অনেক দিনের ক্লান্তি।
অর্ণব রহমান। অভিকের বড় ভাই।
নিশি দলিলটা টেবিলে খোলা রেখেই বলল, "R.H Project এর গুদামের কাগজে তোমার সই কেন, ভাইয়া?"
ওপাশে একটু নীরবতা। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
"অভিক জানে তুমি ফাইলটা পেয়েছো?"
"অভিক জানে আমি ওর পেমেন্ট আটকে দিয়েছি। ফাইলটা পরে।"
"তুমি কী করেছো?"
"যা করা উচিত ছিল। আমার টাকা কোথায় যাচ্ছে সেটা না জেনে আমি সই করি না।"
অর্ণব হাসল। তিক্ত একটা হাসি। "তুমি এখনো একই রকম আছো, নিশি। সব কথায় জিততে চাও।"
"আর তোমরা দুই ভাই এখনো একই রকম আছো। সব সত্য লুকাতে চাও।"
"কাল সকালে আমার অফিসে এসো। রায়ান থাকবে।"
লাইনটা কেটে গেল। নিশি ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল। অর্ণব একবারও বলেনি রায়ান কে। যেন ধরে নিয়েছে নিশি জানে।
পরদিন সকাল। গুলশান ২ এর একটা পুরনো অফিস। অভিক গ্রুপের চকচকে বোর্ডরুম না, অর্ণবের নিজের ছোট জায়গা।
রায়ান আগে থেকেই বসে ছিল। সামনাসামনি দেখে নিশি বুঝল, ছবির চেয়ে বাস্তবে ওকে আরও ছোট লাগে। চোখের নিচে কালি। অস্থির হাতে নখ খুঁটছে।
অর্ণব বলল, "নিশি, এটা রায়ান। রায়ান, ইনি নিশি হোসেন। অভিক গ্রুপের—"
"আমি জানি উনি কে," রায়ান কেটে দিল। নিশির দিকে তাকাল না। "আপনিই আমার ফান্ডিং আটকেছেন, তাই না?"
নিশি একটু থমকাল। ও ভেবেছিল ছেলেটা ভয় পাবে, বা নরম গলায় কথা বলবে।
"হ্যাঁ। আমি আটকেছি।"
"কেন?"
"কারণ ওই টাকা আমার কোম্পানি থেকে যাচ্ছে। আর আমি জানি না কেন যাচ্ছে।"
রায়ান এবার তাকাল। চোখ লাল।
"আমি ভিক্ষা চাইনি। আমাকে বলা হয়েছিল এটা আমার প্রাপ্য।"
"কার প্রাপ্য? কার ছেলে তুমি?"
ঘরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
অর্ণব কিছু বলতে যাচ্ছিল, রায়ান হাত তুলে থামাল।
"আমি জানি না।"
নিশি ভ্রু কুঁচকাল। "মানে?"
"মানে আমি জানি না আমার বাবা কে। আমার মা কখনো বলেনি। মারা যাওয়ার আগে শুধু একটা খাম দিয়ে গিয়েছিল। ভেতরে এই কোম্পানির নাম, আর অর্ণব আঙ্কেলের ফোন নম্বর।"
নিশির বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। ও যে উত্তরটা নিয়ে এসেছিল, সেটা পেল না।
"তাহলে তুমি অভিককে বাবা বলে ডাকো কেন?"
"আমি ডাকি না।" রায়ানের গলা শক্ত। "আপনারা সবাই ধরে নেন। আমার মা'র ডায়েরিতে A.R লেখা ছিল। আপনাদের কোম্পানিতে A.R দুজন আছে। অভিক রহমান। অর্ণব রহমান। আমি কোনটা?"
নিশি অর্ণবের দিকে তাকাল। অর্ণব জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
"ভাইয়া?"
অর্ণব ঘুরল না। "আমি রায়ানের মাকে চিনতাম। অনেক আগে।"
"কতটা আগে?"
"যতটা আগে হলে রায়ান আমার ছেলে হতে পারে, ততটা আগে।"
ঘরে কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে না, মনে হলো।
রায়ান উঠে দাঁড়াল। "আমি এখানে DNA টেস্ট করাতে আসিনি। আমার প্রজেক্টের ফান্ডিং আটকে আছে। ওটা ছাড়ুন। আমি চলে যাব।"
নিশি বলল, "বসো।"
রায়ান তাকাল। "আপনি আমাকে অর্ডার করার কেউ না।"
"আমি তোমার ফান্ডিং আটকেছি। তার মানে এই মুহূর্তে আমি তোমাকে অর্ডার করারই লোক। বসো।"
রায়ান দাঁতে দাঁত চাপল। তারপর ধপ করে বসে পড়ল। জেদটা... চেনা লাগল নিশির।
অস্বস্তিকর রকম চেনা।
"তোমার মায়ের নাম কী ছিল?" নিশি জিজ্ঞেস করল, গলাটা একটু নরম করে।
"রুবিনা হোসেন।"
R.H. রায়ান হোসেন। মায়ের নামে। বাবার নামে না।
নিশির মাথায় হিসাবটা দ্রুত ঘুরল। যদি রুবিনা অর্ণবের সঙ্গে... তাহলে অভিক কেন টাকা দিচ্ছে? যদি রুবিনা অভিকের সঙ্গে... তাহলে অর্ণব কেন গুদামের দলিলে সই করছে?
"তোমার মা কিছু রেখে গেছে? চিঠি? ডায়েরি?"
রায়ান ব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ করা খাম বের করল। হলুদ হয়ে গেছে।
"এটা আমার মায়ের হাতে লেখা। আমাকে দিতে বলেছিল... বাবাকে। আমি জানি না বাবা কে, তাই কাউকে দিইনি।"
নিশি হাত বাড়াল। রায়ান দিল না।
"আগে আমার ফান্ডিং ছাড়ুন।"
নিশি হাসল। তিক্ত হাসি। "ব্ল্যাকমেইল করছো?"
"আপনি যেটা করছেন সেটাকে কী বলে?"
অর্ণব এবার উঠে দাঁড়াল। "যথেষ্ট হয়েছে। রায়ান, খামটা দাও। নিশি, তুমি ওর ফান্ডিং ছাড়বে।"
দুজনেই একসঙ্গে বলল, "না।"
অর্ণব থেমে গেল। তারপর হেসে ফেলল। শব্দ করে না, শুধু মাথা নাড়ল।
"তোমরা দুজন একেবারে একরকম। এই জন্যই অভিক তোমাদের দুজনকে কখনো মুখোমুখি হতে দেয়নি।"
নিশি আর রায়ান একে অপরের দিকে তাকাল। দুজনের চোখেই একই জেদ।
রায়ান খামটা টেবিলের ওপর রাখল। ঠেলে দিল নিশির দিকে।
"নিন। পড়ুন। তারপর ঠিক করুন আমি টাকাটা পাওয়ার যোগ্য কি না।"
নিশি খামটা খুলল। ভেতরে একটা চিঠি। হাতের লেখা কাঁপা কাঁপা।
প্রথম লাইনটা পড়েই নিশির হাত থেমে গেল।
চিঠিটা অভিককে লেখা না। অর্ণবকে লেখা না।
উপরে লেখা—
"প্রিয় নিশি,"
নিশি চোখ তুলল। রায়ান তাকিয়ে আছে। অর্ণব জানালার দিকে ফিরে গেছে।
"এটা... এটা আমার নামে কেন?"
রায়ান বলল, "আমিও সেটাই জানতে চাই।"
চলবে...
পর্ব ৪: অন্য একজন উত্তরাধিকারী
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।