গল্পের নাম: শোনো অবেলার পথিক
কলমে: হিমানী হিমাদ্রি
(পঞ্চম পর্ব)
অহিদত্তের সেই তীব্র চাহনি আর গোধূলির স্মৃতিগুলোকে মনের এক কোণে সযত্নে তুলে রেখে ইরাকে ফিরতে হলো তার চেনা ছকে। কিন্তু পরিস্থিতি এবার ভিন্ন। চক্রবর্তী বাড়িতে এবার পা রাখলেন শুভঙ্কর সান্যাল।
কলকাতা থেকে আসা নামকরা স্থপতি , বনেদি সান্যাল বংশের সুযোগ্য সন্তান। অত্যন্ত মার্জিত, সুপুরুষ এবং যুক্তিবাদী। মহিমবাবু তাকে জামাই হিসেবে পেতে মরিয়া, কারণ শুভঙ্করের আভিজাত্য চক্রবর্তীদের বংশমর্যাদাকে আরও উজ্জ্বল করবে।
দৃশ্যপট:
শরতের হালকা রোদ উঠোনের শিউলি ফুলের ওপর এসে পড়েছে। ইরা তার ঘরের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, পরনে সাদা গরদের শাড়ি। সে দেখল উঠোনে একটি ছাই রঙের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামলেন শুভঙ্কর—পরনে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা।
মহিমবাবু সসংকোচে তাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। শুভঙ্কর সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তার নজর গেল ওপরের জানলার দিকে। ইরার সাথে এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হলো। শুভঙ্কর হাসলেন— তবে সেই হাসিতে অহিদত্তের মতো ব্যঙ্গ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত শীতল বুদ্ধিমত্তা।
বিকেলের বৈঠক:
খাবার টেবিলে শুভঙ্কর খুব সহজভাবে কথা বলছিলেন। মহিমবাবু যখন শাস্ত্রের দোহাই দিচ্ছেন, শুভঙ্কর তখন মৃদু হেসে বললেন—
"শাস্ত্রে তো অনেক কিছুই লেখা থাকে মহিমবাবু, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যদি আমরা নিজেদের সংস্কার করতে না পারি, তবে সেই শাস্ত্র তো জঞ্জাল হয়ে যায়।"
শুভঙ্কর সরাসরি ইরার দিকে তাকিয়ে বললেন—
"শুনেছি আপনি খুব ভালো গান করেন ইরা দেবী। তবে আপনার গানের সুরের চেয়েও আপনার চোখের নীরবতা অনেক বেশি কথা বলে। যেন কোনো এক অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রেখেছেন মনের ভেতর।"
ইরা চমকে উঠল। এই মানুষটা কি তবে তার মনের হদিশ পাচ্ছে? শুভঙ্কর আবার বোমা ফাটালেন—
"আমি এখানে শুধু আত্মীয়তা করতে আসিনি। শুনলাম নদীর ধারের পুরনো শিব মন্দিরটার কাছে কোনো এক 'অহিদত্ত' নামের ছেলের বাস, যে নাকি ওখানের পাথরগুলোর ভাষা বোঝে। আপনি কি চেনেন তাকে?"
টেবিলের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। মহিমবাবুর হাত থেকে জলের গ্লাসটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ইরা নিজেকে সামলে নিয়ে খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল—
"অহিদত্ত আমাদের ছোটবেলার সঙ্গী। তবে সে পাথর বোঝে কিনা জানি না, মানুষ খুব ভালো চেনে।"
শুভঙ্কর চশমার আড়ালে তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দিয়ে ইরাকে মেপে নিলেন। তিনি ধীর স্বরে বললেন—
"চমৎকার! যে মানুষ চিনতে জানে, তার সাথে আমার আলাপ করাটা খুব জরুরি। কাল কি আমাকে একবার ওদিকে নিয়ে যাবেন ইরা দেবী?"
নদীর ধারের সেই পুরনো মন্দিরে কি তবে মুখোমুখি হবে কলকাতার শিক্ষিত আভিজাত্য আর গ্রামের অবহেলিত জেদ?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।