সিরিজ-শব্দহীন পৃথিবীর গল্প
গল্প-৩ এক ফোঁটা সহানুভূতি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২২ জুলাই, ২০২৬
বাইরে থেকে দেখলে ঝকঝকে আধুনিক সুপারমার্কেটগুলোকে আনন্দের চারণক্ষেত্র বলেই মনে হয়। থরে থরে সাজানো চোখধাঁধানো পণ্য, মাথার ওপর ঝলমলে আলো, আর আবহ সঙ্গীত হিসেবে মৃদু তালে বাজতে থাকা সুর। কিন্তু সেই আলো ঝলমলে জায়গাটাই যে চোখের পলকে কতটা বিভীষিকাময় হয়ে উঠতে পারে, তা ওই রবিবারের আগে আমাদের ধারণাতেই ছিল না।
আমরা তিনজন গিয়েছিলাম সাপ্তাহিক কেনাকাটা করতে—আমি, মারুফ আর আমাদের আট বছরের ছেলে আয়ান। সবকিছু বেশ সহজভাবেই চলছিল। ট্রলিতে টুকটাক জিনিসপত্র তুলতে তুলতে আমরা যখন ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছিলাম, ঠিক তখন থেকেই পরিবেশটা বদলাতে শুরু করল।
আবদ্ধ স্থানে ট্রলির চাকার একটানা ঘড়ঘড় শব্দ, পণ্য সামগ্রীর তীব্র রঙের ঝলকানি, আর সেই সঙ্গে মাইকে ভেসে আসা ঘনঘন ঘোষণা—সব মিলিয়ে এক চরম বিশৃঙ্খল জট তৈরি হলো। একজন সাধারণ মানুষের কাছে এটা অতি পরিচিত কেনাকাটার কোলাহল বৈ আর কিছু নয়। কিন্তু আয়ানের মতো অতি-সংবেদনশীল মনস্তত্ত্বের শিশুর কাছে এটি ছিল অজস্র তীক্ষ্ণ শব্দের পাহাড়, যা একমুহূর্তে ভেঙে পড়েছিল ওর কচি মাথার ওপর।
ওর চিবুকে যন্ত্রণার রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রথমে ও দু-হাতে শক্ত করে কান চেপে ধরল, তারপর দু-তিনবার মাথা ঝাঁকাল। আমরা বুঝে ওঠার আগেই ও নিজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল।
এটাই অটিস্টিক শিশুদের 'মেল্টডাউন'। এটি কোনো অবাধ্যতা নয়, বায়না নয়, কিংবা কোনো জেদও নয়। এটি মূলত মস্তিষ্কের এমন এক অসহায় অবস্থা, যখন অতিরিক্ত উদ্দীপনা ও স্নায়বিক চাপে শিশুটি নিজের দেহ ও মনের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না। ও তখন ভীষণ একা আর নিরূপায় হয়ে পড়ে।
আয়ান মেঝেতে শুয়ে পড়ল। গলার ভেতরে জমাট কান্নার সঙ্গে সঙ্গে ও হাত-পা ছুড়তে লাগল, ব্যাকুল হয়ে মেঝেতে মাথা ঠুকতে চাইল। ওর অবশ হাতের ধাক্কায় পাশে রাখা প্লাস্টিকের বোতলের একটা র্যাক হুড়মুড় করে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো সুপারমার্কেট যেন থমকে গেল। সবাই কেনাকাটা থামিয়ে আমাদের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকাতে লাগল। পুরো ঘরে নেমে এল এক বিষাদময় অস্বস্তিকর নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতায় কোনো সমবেদনা ছিল না, ছিল কেবল কঠোর বিচারকের দৃষ্টি।
মানুষ আমাদের ঘিরে দাঁড়াল—যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত তামাশা চলছে। চারপাশ থেকে বিষাক্ত ফিসফিসানি ভেসে আসতে লাগল—
"কেমন মা রে বাবা! একটা বাচ্চার জেদ সামলাতে পারে না!"
"আজকালকার মা-বাবারা যে কী শিক্ষা দেয় কে জানে! এত বড় ছেলে, ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানটুকুও নেই!"
"এমন উচ্ছৃঙ্খল ছেলেকে তো ঘরে আটকে রাখা উচিত। পাবলিক প্লেসে এসে অন্যের শান্তি নষ্ট করার কোনো মানে হয়?"
প্রতিটি বচন বাণ হয়ে আমাদের বুকে বিঁধছিল। মারুফ এক হাতে আকুল হয়ে আয়ানকে সামলাচ্ছিল, অন্যদিকে মাথা নিচু করে অপমান সহ্য করছিল। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। একদিকে সন্তানের এই তীব্র যন্ত্রণা আর অন্যদিকে সমাজের এই নির্মম দৃষ্টিভঙ্গি—দুটো মিলে আমার সহ্যের শেষ বাঁধ ভেঙে দিল। আমি সেই মলিন মেঝেতেই বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কেঁদে ফেললাম।
সেই মুহূর্তে আলোর বন্যায় ভেসে যাওয়া হাজারো মানুষের ভিড়েও জায়গাটাকে আমাদের কাছে এক নিসঙ্গ, অচেনা গ্রহ বলে মনে হচ্ছিল। একটি হাতও এগিয়ে এল না এতটুকু সহযোগিতার উদ্দেশ্যে, একটি কণ্ঠও ফিসফিস করে বলল না—"ব্যস্ত হবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে।" সবাই কেবল দর্শক হয়ে রায় দিয়ে যাচ্ছিল।
তারা বুঝতে পারেনি, সাধারণ জেদ আর স্নায়বিক মেল্টডাউনের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। শিশু যখন খেলনা বা চকলেটের লোভে জেদ করে, তখন সে ইচ্ছাকৃতভাবে কান্নাকাটি করে কিছু আদায় করার তাগিদে। কিন্তু মেল্টডাউন কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নয়; এটি এক অবর্ণনীয় স্নায়বিক ক্রাইসিস। তখন শিশুটি তিরস্কার বা বকাঝকার পাত্র নয়—তখন তার ভীষণ প্রয়োজন একটু নিরাপত্তা, নির্জনতা আর পরম আশ্রয়ের।
সুপারমার্কেটের সেই অনভিপ্রেত ঘটনা সেদিন আমাদের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছিল। আমরা নিজেদের যতই শিক্ষিত দাবি করি না কেন, অজানা কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে একটু ধৈর্য ধরা, না বুঝে বিরূপ মন্তব্য না করা, কিংবা বিচারক না হয়ে সামান্য সহমর্মী হওয়া—এসব মানবিক গুণাবলীতে আমরা আজও কতটা পিছিয়ে আছি!
মারুফ শেষ পর্যন্ত আয়ানকে পাঁজকোলা করে তুলে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বাইরের গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। আর আমি অশ্রুসজল চোখে মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বোতলগুলো কুড়িয়ে তুলতে লাগলাম।
সেদিনের ঘটনার পর থেকে একটি সত্যই মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে আছে—জনসমক্ষে যখন কোনো মা বা বাবা তাঁর সন্তানকে নিয়ে এমন এক দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন তাঁদের কোনো উপহাস কিংবা অযাচিত উপদেশের প্রয়োজন হয় না। তাঁদের কেবল প্রয়োজন একটুখানি সহানুভূতি, কিছুটা ব্যক্তিগত স্পেস, আর একটি সহযোগিতার হাত।
কোনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর পরিবারকে অভিযুক্ত করার পূর্বে আমরা যদি কেবল এক সেকেন্ডের জন্য নিজেদের তাঁদের জায়গায় বসিয়ে ভাবতাম, তবে হয়তো এই সমাজটা এতটা রুক্ষ ও নির্মম হতো না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।