সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প ১০ -নিজের কাছে হেরে গেলাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
সংসারের কাছে অভিক কখনো হারেনি। হিসাবের খাতা কখনো এলোমেলো হয়নি, মেয়েদের পড়াশোনায় কোনো ঘাটতি রাখেনি, মাসের শেষে বাড়িভাড়ার টাকা জোগাড় হয়েছে, কিস্তি সময়মতো গেছে। মানুষের চোখে তার জীবনটা বেশ গুছানো।
শুধু এক রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার হঠাৎ মনে হলো—এই গুছিয়ে রাখা জীবনের কোথাও সে নিজেই নেই।
পাড়ার মানুষ তাকে দায়িত্বশীল বলে। আত্মীয়রা বলে, “অভিক নিজের সংসারটা খুব ভালো সামলেছে।” কথাগুলো শুনলে তার খারাপ লাগে না। বরং একসময় এই প্রশংসাগুলোই তার ভালো লাগত। নিজের বাড়ি হয়েছে, মেঘ আর মিশি ভালোভাবে বড় হয়েছে, নিশির জন্য যতটা পেরেছে করেছে। কারও কাছে ধার রেখে চলেনি। প্রয়োজনের সময় পিছিয়ে যায়নি।
তারপরও সেদিন রাতে নিজের ঘরের আলো নিভিয়ে বারান্দায় দাঁড়ানো অভিকের মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনের একজন দর্শক।
ছোটবেলায় অভিক নাটক করত। পাড়ার মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলত, পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করত। কলেজে উঠে গিটার হাতে নিয়েছিল। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গল্পও লিখত। তখন তার মনে হয়েছিল, একদিন নিজের মতো একটা সাংস্কৃতিক দল করবে। খুব বড় কিছু নয়—ছোট্ট একটা জায়গা থাকবে, কয়েকজন মানুষ থাকবে, সন্ধ্যার পর গান হবে, নাটক হবে, গল্প নিয়ে কথা হবে।
স্বপ্নটা তখন অসম্ভব মনে হয়নি।
বিয়ের পরও স্বপ্নটা ছিল। নিশিকে একদিন বলেছিল, “সংসারটা একটু গুছিয়ে নিই, তারপর আবার শুরু করব।”
নিশি হেসে বলেছিল, “করবে।”
তারপর মেঘ এল।
মেয়েটা ছোট ছিল। তার সময় লাগত। তারপর মিশি এল। বাড়ির খরচ বাড়ল। কিস্তি শুরু হলো। অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ এল। একটার পর একটা প্রয়োজন এসে দাঁড়াল।
প্রতিটা প্রয়োজনই সত্যি ছিল। কোনোটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।
তাই অভিক নিজের ইচ্ছেটাকে সরিয়ে রাখার সময় কখনো মনে করেনি যে সে কিছু হারাচ্ছে। নিজেকে শুধু বলেছে, “এখন না।”
মেঘ একটু বড় হোক।
মিশির পড়াশোনাটা গুছিয়ে যাক।
কিস্তিটা শেষ হোক।
তারপর।
নিশি মাঝেমধ্যে বলত, “তুমি নিজের কথাও একটু ভাবো।”
অভিক হেসে বলত, “আমার আবার কী দরকার?”
কথাটা বলতে বলতে একসময় সে নিজেই বিশ্বাস করে ফেলেছিল, তার সত্যিই কিছু দরকার নেই।
গিটারটা আলমারির মাথায় উঠে গেল। পুরোনো নাটকের পোস্টারগুলো হারিয়ে গেল। বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে গল্প করার সময়টা কোথায় যেন ফুরিয়ে গেল। ডায়েরির পাতায় লেখা স্বপ্নগুলো একদিন আর খোলা হলো না।
জীবন চলতে থাকল।
মেঘ কলেজে উঠল। মিশিও বড় হলো। মেয়েরা ধীরে ধীরে নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সংসারের কাজ কমল না, শুধু তার ধরন বদলাল। একসময় অভিক খেয়াল করল, সন্ধ্যাগুলো বেশির ভাগ সময় নীরব কাটে।
তবু সে নিজেকে সফল মানুষই ভাবত।
কারণ সবকিছু তো ঠিক আছে।
শুধু নিজের ভেতরটা ছাড়া।
একদিন ডাক্তার তাকে বললেন, “স্ট্রেসটা একটু কমান।”
বাড়ি ফেরার পথে কথাটা নিয়ে অভিক ভাবছিল। স্ট্রেস কমাবে কীভাবে? তার তো কোনো বিশেষ সমস্যা নেই। চাকরি শেষ হয়েছে, মেয়েরা বড় হয়েছে, বাড়ি আছে, সংসার আছে।
সব আছে।
তবু কোথাও একটা অদৃশ্য ক্লান্তি তাকে সারাক্ষণ অনুসরণ করছে।
সেদিন সন্ধ্যায় নিশি চা দিতে এসে হঠাৎ বলল, “তুমি আগের মতো হাসো না।”
অভিক কাপটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল।
“আমি তো হাসি।”
“হাসো,” নিশি বলল, “কিন্তু আগের মতো না।”
অভিক উত্তর দিল না।
রাতে অনেকক্ষণ ঘুম এল না। শেষ পর্যন্ত উঠে আলমারির মাথা থেকে গিটারটা নামাল। ধুলো মুছতে মুছতে পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ল। গিটারটা কোলে রেখে একটা সুর ধরার চেষ্টা করল।
আঙুল ঠিক জায়গায় বসছিল না।
প্রথম সুরটাই বেসুরো হলো।
আবার চেষ্টা করল।
আবার ভুল।
অভিক গিটারটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো। মনে হলো, এত বছর সে শুধু গিটার বাজানো ভুলে যায়নি। নিজের একটা অংশও ভুলে গেছে।
সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের কাছে প্রশ্ন করল—আমি কী হারিয়েছি?
উত্তরটা কোনো জিনিসের নাম নয়।
সে হারিয়েছে সেই মানুষটাকে, যে একসময় কোনো কারণ ছাড়াই গান গাইত। যে নতুন গল্পের কথা ভাবত। যে বন্ধুর সঙ্গে বসে রাত পার করে দিতে পারত। যে জানত, জীবন শুধু দায়িত্বের নাম নয়।
সংসারের জন্য বাঁচা তার ভুল ছিল না।
মেয়েদের জন্য নিজের স্বপ্ন পিছিয়ে দেওয়াও অপরাধ ছিল না।
ভুলটা অন্য জায়গায়।
সে কখনো ভাবেনি, নিজের জন্যও তার কিছু প্রাপ্য আছে।
ত্যাগ আর নিজেকে মুছে ফেলার মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে, সেটা বুঝতে তার অনেক বছর লেগে গেল।
পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে অভিক হঠাৎ নিশিকে বলল, “আমি আবার শুরু করতে চাই।”
নিশি অবাক হয়ে তাকাল।
“কী?”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি যে মানুষটা ছিলাম, তাকে।”
নিশি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, “তুমি যদি নিজেকেই কোথাও রেখে আসো, তাহলে এতদিন আমরা কাকে নিয়ে সংসার করছিলাম?”
অভিক মৃদু হেসে ফেলল।
সেদিন কথাটার উত্তর তার কাছে ছিল না।
হয়তো এখনও নেই।
তবে সেই রাত থেকে সে প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখে। কখনো গিটার নিয়ে বসে। কখনো পুরোনো ডায়েরি খুলে। কখনো কিছু না করে বারান্দায় বসে থাকে।
খুব বড় কোনো পরিবর্তন নয়।
শুধু নিজের সঙ্গে আবার পরিচিত হওয়ার চেষ্টা।
কারণ জীবনে অনেক পরাজয় আসে—টাকার, কাজের, সুযোগের, সময়ের।
কিন্তু সবচেয়ে নিঃশব্দ পরাজয়টা তখনই ঘটে, যখন মানুষ চারপাশের সবার কাছে ভালো থাকতে থাকতে নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যায়।
অভিক সংসারের কাছে হারেনি।
হারিয়েছিল নিজের ভেতরের সেই মানুষটাকে।
এখন তার একটাই কাজ—
দেরি হলেও তাকে আবার খুঁজে পাওয়া।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।