সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প ৯ -মৃত্যুর আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
মৃত্যুকে অভিক খুব একটা ভয় পেত না। ভয় পেত অন্য একটা জিনিসকে—একদিন যদি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে হয়, এতগুলো বছর বেঁচে থেকেও সে আসলে নিজের জীবনটা বাঁচতেই পারেনি।
হাসপাতালের ঘরটা দুপুরের আলোয় শান্ত হয়ে ছিল। জানালার পর্দা সামান্য নড়ছিল। দূরে কোথাও একটা ট্রলির চাকা গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। অভিক বিছানায় চুপ করে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।
ডাক্তার কিছুক্ষণ আগে দেখে গেছেন। আপাতত বড় কোনো বিপদ নেই, তবে বিশ্রাম দরকার। ওষুধ নিয়মিত খেতে হবে। আর যাওয়ার সময় খুব সহজভাবে বলেছিলেন, “স্ট্রেসটা একটু কমাবেন।”
স্ট্রেস কমাবেন।
কথাটা শুনে অভিক হেসেছিল।
তার জীবনে স্ট্রেস কমানোর মতো আলাদা কোনো জায়গা ছিল নাকি?
ছোটবেলায় বাবার ব্যবসা ডুবে যাওয়ার পর থেকেই সে একটা জিনিস শিখেছিল—সংসারে দায়িত্ব আগে, নিজের ইচ্ছে পরে। তখন কথাটা প্রয়োজন ছিল। পরে সেই প্রয়োজনই অভ্যাস হয়ে গেল। আর অভ্যাসটা একসময় তার পুরো জীবনটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল।
বিয়ের পর নিশির সঙ্গে কত স্বপ্ন ছিল।
একদিন পাহাড়ে যাবে। কোনো এক শহরের ছোট্ট কফিশপে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করবে। অভিক আবার গিটার বাজাবে। নিশি বই পড়বে। দুজনের জন্য একটা ছোট্ট ঘর থাকবে, যেখানে দরকারের চেয়ে ইচ্ছের জিনিস একটু বেশি থাকবে।
সব স্বপ্নই ছিল।
শুধু সময়টা ছিল না।
মেঘ এল। তারপর মিশি। সংসারের খরচ বাড়ল। বাড়ির কিস্তি, মেয়েদের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিৎসা—একটার পর একটা দায়িত্ব এসে দাঁড়াল। অভিক প্রতিবার নিজের স্বপ্নটাকে একটু সরিয়ে রেখে বলেছে, “এখন না।”
মেয়েরা একটু বড় হোক।
এই খরচটা মিটে যাক।
কিস্তিটা শেষ হোক।
অবসর নিলে।
সে ভেবেছিল, জীবনটা বুঝি জমিয়ে রাখা যায়। আজকের আনন্দটুকু তুলে রেখে কালকে একসঙ্গে খরচ করা যাবে।
অবসর সত্যিই এসেছিল।
শুধু তখন শরীরটা আর আগের জায়গায় ছিল না।
আগের মতো দূরে হাঁটতে পারে না। সিঁড়ি ভাঙলে হাঁপ ধরে। গিটারটা নামালে আঙুলে আগের মতো জোর থাকে না। পাহাড়ে যাওয়ার কথা ভাবলে এখন জায়গাটার সৌন্দর্যের আগে মনে হয়—এতটা পথ হাঁটতে পারব তো?
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে অভিকের মনে হলো, সে এতদিন ভবিষ্যতের কাছে জীবন জমা রেখেছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ কখনো কাউকে প্রতিশ্রুতি দেয় না যে, তুমি যখন প্রস্তুত হবে, তখন সে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে।
নিশি পাশে বসেছিল। তার হাতটা অভিকের হাতের ওপর রাখা।
অভিক ধীরে বলল, “নিশি, আমরা কি কখনো নিজেদের মতো করে বেঁচেছিলাম?”
নিশি কোনো উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বলল, “তুমি সবসময় বলতে, একদিন সময় হবে।”
অভিক চোখ বন্ধ করল।
স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে আসতে লাগল।
মেঘের প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন। ছোট্ট ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। মিশির নাচের অনুষ্ঠানে মঞ্চের আলোয় তাকে খুঁজে বেড়ানো। আর এক বিকেলে নিশির সেই কথাটা—
“চলো না, নদীর ধারে যাই।”
অভিক তখন বলেছিল, “আজ না। একটু কাজ আছে।”
কাজটা কী ছিল, আজ আর মনে নেই।
কিন্তু নিশির মুখটা মনে আছে।
হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোসগুলো এমনই হয়। যে মুহূর্তগুলো হারিয়ে যায়, সেগুলোর কারণ পরে আর মনে থাকে না। শুধু মুহূর্তগুলোই থেকে যায়।
অভিক জানালার দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, সে জীবনে খুব খারাপ কিছু করেনি। বরং যতটা পেরেছে, ভালো থাকার চেষ্টা করেছে। দায়িত্ব থেকে পালায়নি। পরিবারের প্রয়োজনের সময় পিছিয়ে যায়নি। মেয়েদের জন্য যা করার দরকার করেছে।
তবু একটা জায়গায় সে নিজের কাছে ঋণী হয়ে গেছে।
নিজের জীবনটার কাছে।
সে বেঁচে ছিল—কিন্তু কতটা জীবনকে ছুঁয়ে বেঁচেছিল?
এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই।
নিশি তার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল।
অভিক বলল, “আমরা একটা জায়গায় যাব?”
“কোথায়?”
“যেখানে অনেকদিন যেতে চেয়েছিলাম।”
নিশি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “পাহাড়ে?”
অভিকও হাসল।
“হ্যাঁ। এবার আর পরে না।”
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার দিন আকাশটা পরিষ্কার ছিল। রাস্তায় মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ, দোকানের আলো—সবকিছুই আগের মতো। অথচ অভিকের চোখে সেদিন পৃথিবীটাকে একটু নতুন মনে হলো।
সে জানে, হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো আর ফিরে আসবে না। যে বিকেলগুলো কাজের কাছে হেরে গেছে, যে ভ্রমণগুলো “পরে”র খাতায় পড়ে আছে, যে গানগুলো মাঝপথে থেমে গেছে—সব ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তবু সামনে যতটুকু পথ আছে, সেটুকু তো এখনও তার।
মৃত্যু একদিন আসবে।
কখন আসবে, সেটা অভিক জানে না।
শুধু এইটুকু বুঝেছে—মৃত্যুর কথা ভেবে ভয় পাওয়ার চেয়ে, জীবিত অবস্থায় জীবনটাকে না ছুঁয়ে ফেলার ভয় অনেক গভীর।
গাড়িতে উঠতে গিয়ে সে নিশির দিকে তাকিয়ে বলল, “চলো।”
নিশি বলল, “কোথায়?”
অভিক জানালার বাইরে তাকিয়ে হেসে বলল, “জানি না। তবে আজ কোথাও যাওয়া যাক।”
এই প্রথম তাদের সামনে কোনো গন্তব্য ছিল না।
শুধু পথ ছিল।
আর অনেক বছর পর, অভিক সেই পথটাকেই নিজের জীবন বলে মনে হলো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।