সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-০৯
রিকশাওয়ালার স্বপ্ন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৮ আগষ্ট, ২০২৬
সারাদিন অন্যের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে মানুষটা নিজের স্বপ্নে আর পৌঁছাতে পারে না।
জামালের ঘুম ভাঙে ভোর পাঁচটায়। আজানের আগেই। উঠোনে রাখা রিকশাটা কাপড় দিয়ে মোছে, চাকার হাওয়া দেখে, সিটটা ঝেড়ে নেয়। তারপর চুপচাপ বেরিয়ে পড়ে।
শহর তখনও পুরোপুরি জাগেনি। ফাঁকা রাস্তায় হালকা কুয়াশা। এই সময়টায় রিকশা টানতে কষ্ট কম লাগে। মনে হয়, রাস্তাটা শুধু তার একার।
বারো বছর ধরে সে রিকশা চালায়। আগে ভাড়ার রিকশা চালাত, এখন নিজের একটা আছে। পুরোনো হয়ে গেছে। প্যাডেল ভারী, চেইনে শব্দ হয়। তবু এটাই তার সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সে টাকার হিসাব করে না। শুধু প্যাডেল মারে। কেউ ডাকে, "এই, যাবা?" কেউ দরদাম করে, কেউ না বলেই উঠে বসে। রোদে পিঠ পোড়ে, বৃষ্টিতে জামা ভিজে গায়ের সঙ্গে লেগে থাকে। সিটে বসা মানুষটা জানতেও পারে না, যে মানুষটা টানছে তার পায়ে ফোসকা পড়েছে, হাঁটু কাঁপছে।
তার ছেলে রিফাত ক্লাস এইটে পড়ে। অঙ্কে ভালো। রিফাতের একটাই স্বপ্ন, ইঞ্জিনিয়ার হবে।
একদিন স্কুল থেকে একটা কাগজ নিয়ে এলো। কোচিংয়ে ভর্তির নোটিশ। নিচে টাকার অঙ্ক লেখা। জামাল কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার এক মাসের আয়ের প্রায় অর্ধেক।
সে কিছু বলল না। শুধু বলল, "দেখি বাবা।"
সেই রাত থেকে জামাল আরও এক ঘণ্টা বেশি চালায়। ভোরে আরও আগে বের হয়, রাতে আরও পরে ফেরে। স্কুল গেট, বাজার আর হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বেশি খদ্দের পাওয়ার আশায়। কেউ কেউ বলে, "এত ভাড়া চাও কেন?" সে হাসে, ভাড়া কমিয়ে দেয়। তর্ক করে না।
একদিন রিফাত হঠাৎ বলল, "বাবা, তোমার রিকশায় উঠতে আমার লজ্জা লাগে। বন্ধুরা দেখে।"
জামালের পা থেমে গেল। সে কিছু বলল না। রাতে খেতে বসে শুধু বলল, "লজ্জা পেলে হেঁটে যাস।"
রিফাত মাথা নিচু করে রইল। পরে বুঝল, বাবার গলায় রাগ ছিল না, ছিল কষ্ট।
কোচিংয়ের টাকা জোগাড় হয়ে গেল। রিফাত ভর্তি হলো। এখন সন্ধ্যায় পড়তে যায়। জামাল বারান্দায় বসে থাকে। হারিকেনের আলোয় ছেলের পড়ার ছায়া দেখে। মনে হয়, এই টানাটানির একটা মানে আছে।
এক দুপুরে একটা বড় বাড়ির সামনে এক ভদ্রলোক রিকশা থেকে নেমে ভাড়া না দিয়েই ভেতরে ঢুকে গেল। জামাল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে গিয়ে চাইতে সাহস হলো না। গেটের দারোয়ান এসে বলল, "এই, এখানে দাঁড়াবা না, যাও।"
সেদিন খালি রিকশা নিয়ে ফিরতে ফিরতে সে ভাবছিল, এই শহরে তার কাজ শুধু মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। তাকে কেউ কোথাও পৌঁছে দেবে না।
রাতে রিফাত পড়া শেষ করে বাবার কাছে আসে। বইয়ের ছবি দেখায়। ব্রিজ, দালান, রাস্তা। জামাল কিছুই বোঝে না, তবু মাথা নাড়ে।
তার মনে হয়, ছেলে একদিন এমন রাস্তা বানাবে যেখানে রিকশা টানতে এত কষ্ট হবে না। এমন একটা শহর বানাবে যেখানে কেউ ভাড়া না দিয়ে চলে যাবে না, কাউকে গেট থেকে তাড়িয়ে দেবে না।
স্বপ্নটা এখন আর তার নিজের নেই। স্বপ্নটা ছেলের হয়ে গেছে। আর সেই স্বপ্নটাই প্রতিদিন ভোরে তাকে প্যাডেলে জোর এনে দেয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।