আমরা মূলত আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশকে বড় হওয়া এক মধ্যবর্তী প্রজন্ম।
যাদের শৈশব কেটেছে এনালগ সময়ে, আর যৌবনের দরজায় দাঁড়িয়েই হঠাৎ ঢুকে পড়েছে ডিজিটাল পৃথিবী।
পুরোনো দিনের হাত ধরেই আমাদের হাঁটা শুরু হয়েছিল, কিন্তু জীবন আমাদের ঠেলে দিয়েছে একেবারে ভিন্ন এক সময়ের ভেতরে।
আমরা এমন এক সময়ের সন্তান,
যখন খবর আসত চিঠিতে, কার্ডে, টেলিগ্রামে—আর সেই খবর আসার আগ পর্যন্ত পুরো বাড়ি নিঃশ্বাস আটকে থাকত।
আজ যেখানে এক সেকেন্ডেই সব জানা যায়, তখন সেখানে অপেক্ষা ছিল জীবনেরই একটা অংশ।
আমরা দেখেছি—অসম্ভব কীভাবে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
আমাদের শৈশব ছিল মাটির খুব কাছাকাছি।
মেঝেতে বসে খাওয়া, শব্দ করে চা টানা, এক গ্লাস পানিতে সবার পালা—এসব ছিল দৈনন্দিন।
বিকেল মানেই ছিল মাঠ, রাস্তা, উঠোন।
লুকোচুরি, গোল্লাছুট, বাঘবন্দি, ডাঙ্গুলি—এই খেলাগুলো আমাদের শরীরের সঙ্গে বড় হয়েছে।
নিজেদের হাতেই বানিয়েছি খেলনা—কাগজের ঘুড়ি, নাড়া ক্ষেতে বানানো বল—যেগুলোর কোনো দাম ছিল না, কিন্তু আনন্দ ছিল অঢেল।
বেতের চাবুক খেয়েছি, আবার চাদরের ভেতর লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েছি দস্যু বনহুর, কুয়াশা, মাসুদ রানা, স্বপন কুমারের বই।
আমরা আলো কম থাকলেও থামিনি।
কূপি বা হ্যারিকেনের ক্ষীণ আলোয় পড়েছি, লিখেছি।
ফ্যান, এসি, ফ্রিজ—এসব ছাড়াই বড় হয়েছি আমরা।
ঘাম, গরম, শীত—সবকিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে শিখেছিলাম।
কালির কলমে হাত মেখেছি, নতুন বইয়ের গন্ধে আলাদা এক আনন্দ পেয়েছি—যেটা এখন আর বোঝানো যায় না।
স্কুলজীবন ছিল শেখার জায়গা—শুধু বইয়ের নয়, জীবনেরও।
বিনা টিফিনে স্কুলে যাওয়া, টিচারের মার খাওয়া, বাড়ি এসে নালিশ করে আবার মার খাওয়া—সবই স্বাভাবিক ছিল।
কারণ তখন বিশ্বাস ছিল—ভুল করলে শাসন হবেই, আর বড়রা ভুল করেন না।
আমরা শিখেছিলাম সম্মান করতে।
গুরুজনকে দেখলে থেমে দাঁড়াতে, মাথা নিচু করতে।
রাস্তায় স্যার দেখলে পথেই পায়ে হাত ছোঁয়া—কোনো সংকোচ ছিল না, ছিল না দ্বিধা।
আমরা রেডিওর শব্দে পৃথিবী চিনেছি।
রাতে ছাদে বসে বিবিসির খবর শুনেছি, অনুরোধের আসরের অপেক্ষা করেছি।
টেলিভিশনের জন্য ছাদে উঠে অ্যান্টেনা ঘুরিয়েছি, ঝিলমিল করা স্ক্রিনেও খেলা দেখেই খুশি হয়েছি।
লোডশেডিং আমাদের বিরক্ত করত, কিন্তু ভেঙে দিত না—কারণ অপেক্ষা করতে আমরা জানতাম।
আমাদের অপেক্ষা ছিল ধৈর্যের।
আত্মীয় এলে বাড়ি ভরে উঠত।
ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভিজে স্কুল থেকে ফিরতাম।
নিয়ম ছিল—সূর্য ডোবার আগেই ঘরে ফেরা।
ঈদের সময় চাওয়া ছিল কম—একটা নতুন জামা।
আর বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নেওয়া—সব চাওয়া পূরণ হয় না।
আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি দুই সময়ের মাঝখানে।
পুরোনো দিনের স্মৃতি বুকে নিয়ে, নতুন দিনের গতির সাথে তাল মেলাতে চেষ্টা করছি।
আমরা না পুরোপুরি পেছনের, না পুরোপুরি সামনের—আমরা এক সংযোগকারী প্রজন্ম।
এই কারণেই হয়তো আমরা এখনো বন্ধু খুঁজি।
এখনো কোনো হারানো নিরাপদ জায়গার কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসে।
আমরা জানি—সময় বদলায়, পৃথিবী বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়।
কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু অভ্যাস, কিছু মূল্যবোধ—সেগুলো বদলায় না।
আমরা সেই প্রজন্ম,
যারা একদিনের পৃথিবীকে একাধিক রূপে দেখেছে।
আর সেই দেখার ভারটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।