শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–৭ : যে স্বপ্নের জন্য সব হারিয়েছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"কিছু স্বপ্ন দূর থেকে সুন্দর লাগে। কাছে গিয়ে তবেই বোঝা যায়, তার দাম কত বড়।"
বিচ্ছেদের পর প্রথম প্রথম নিশির মনে হয়েছিল, সে মুক্তি পেয়েছে।
কোনো কৈফিয়ত নেই। কোনো দমবন্ধ নীরবতা নেই। নতুন বাসা, নতুন নিয়ম, নতুন মানুষ।
সায়ান বলেছিল, “তোমাকে আর কাঁদতে হবে না। আমি আছি।”
নিশি বিশ্বাস করেছিল। বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কারণ বিশ্বাস না করলে বারো বছরের সংসার ছেড়ে আসার সাহসটুকুও অর্থহীন হয়ে যেত।
কিন্তু মানুষের জীবন ডায়ালগ দিয়ে চলে না। চলে প্রতিদিনের খুঁটিনাটি দিয়ে।
সকাল দশটা। সায়ান ল্যাপটপে মুখ গুঁজে। নিশি চা বানিয়ে এনে সামনে রাখে।
“থ্যাংকস।” চোখ তোলে না সায়ান।
আগে অভিকও অফিসের চাপে থাকত। কিন্তু চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে একবার হলেও বলত, “আহ, শান্তি।” সেই ‘শান্তি’ শব্দটায় সংসার লুকিয়ে থাকত।
এখানে শুধু ‘থ্যাংকস’। শুকনো, কর্পোরেট।
বিকেলে নিশি বলল, “চলো না, ছাদে যাই। হাওয়া খেয়ে আসি।”
সায়ান ফোন স্ক্রল করতে করতে বলল, “উফ, এখন না। ক্লায়েন্ট মিটিং আছে। তুমি যাও।”
নিশি একা ছাদে উঠল। পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটা বাচ্চা মেয়ের খিলখিল হাসি ভেসে এল। হাসিটা ঠিক মিশির মতো।
বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। এই সময় মিশি কী করে? হোমওয়ার্ক? নাকি বাবাকে জ্বালাচ্ছে, “বাবা, গল্প বলো”? মেঘলা কি এখনো রাত জেগে পড়ে? চোখের নিচে কালি পড়ে না তো?
ভাবতে ভাবতে রেলিং চেপে ধরে নিশি।
যে স্বপ্নের জন্য সে সব ছেড়ে এসেছিল, সেই স্বপ্নে মেয়েদের মুখ ছিল না। এখন বুঝতে পারছে, মেয়েদের ছাড়া কোনো স্বপ্নই পূর্ণ হয় না।
দেখা করতে যায় নিশি। প্রতি শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে আটটা—আদালতের বরাদ্দ সময়।
কলিংবেল দিতেই মিশি দরজা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। “মা! তুমি এসেছ!”
নিশি মেয়েকে বুকে চেপে ধরে। গায়ের গন্ধটা নেয় বুক ভরে। এই গন্ধটার জন্য সে মরতেও পারে।
“মা, আজকে রাতে থাকবে? প্লিজ?” মিশির গলায় কান্না।
নিশি অভিকের দিকে তাকায়। অভিক অন্যদিকে তাকিয়ে। চোখে রাগ নেই। যা আছে, তার নাম ক্লান্তি। যে ক্লান্তি চিৎকারের চেয়েও বেশি শব্দ করে।
“না মা। আজকে যেতে হবে। সামনের সপ্তাহে আবার আসব।”
মিশির মুখটা নিভে যায়। “তুমি সবসময় চলে যাও কেন, মা?”
এই ‘কেন’র উত্তর নিশির কাছে নেই। সে শুধু মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ায়।
মেঘলা দূরে দাঁড়িয়ে। আসে না, জড়িয়ে ধরেও না। শুধু তাকিয়ে থাকে। সেই চাহনিতে কোনো অভিযোগ নেই। আছে একরাশ জিজ্ঞাসা—“তুমি কেন গেলে, মা?”
নিশি ব্যাগ কাঁধে নেওয়ার সময় মেঘলা হঠাৎ বলে, “মা, ভালো আছো?”
একটা লাইন। কিন্তু নিশির পা আটকে যায়।
“হ্যাঁ মা। তুই মন দিয়ে পড়িস।”
গলার কাছে দলা পাকানো কান্নাটা গিলে ফেলে সে বেরিয়ে আসে।
বাসায় ফিরে সায়ান জিজ্ঞেস করে, “এত মনমরা কেন?”
নিশি হাসার চেষ্টা করে। “কিছু না। ট্রাফিক ছিল।”
সায়ান আর ঘাঁটায় না। সে জানে না, বা জানতে চায় না, এই মনমরার পেছনে দুটো মুখ আছে। যাদের ছাড়া নিশির নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।
আস্তে আস্তে টের পায় নিশি, সায়ান বদলাচ্ছে। না, সায়ান বদলায়নি। সায়ান এমনই ছিল। দূর থেকে তাকে ‘বোঝার মানুষ’ মনে হতো। কাছে এসে দেখে, সে শুধু নিজেকে বোঝে।
একদিন রাতে ঝগড়া হলো। তুচ্ছ কারণ। নিশি রাঁধতে দেরি করেছে।
সায়ান খাবার ঠেলে দিয়ে বলল, “তোমার মাথায় সারাদিন ওই পুরোনো সংসার ঘোরে। এখানে মন নেই।”
নিশি ভাতের থালা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
“ওরা আমার মেয়ে, সায়ান। পুরোনো সংসার না।”
“সেই তো। আমার কথা ভাবার সময় কই তোমার?”
সেই রাতে নিশি বুঝল, সে এক জেলখানা থেকে পালিয়ে আরেক জেলখানায় ঢুকেছে। আগেরটায় অন্তত মেয়েদের হাসি ছিল। এখানে শুধু দেওয়াল।
আলমারি গোছাতে গিয়ে পুরোনো অ্যালবামটা হাতে এল। মেঘলার প্রথম জন্মদিন। অভিক কেক মাখিয়ে দিয়েছে নিশির গালে। চারজন হাসছে। ছবিটা কোলে নিয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ।
আঙুল বুলিয়ে দিল অভিকের মুখে, মেয়েদের মুখে।
“আমি কী খুঁজতে গিয়েছিলাম?” নিজেকেই প্রশ্ন করল।
ভালোবাসা? না। অভিক তাকে কম ভালোবাসেনি।
তাহলে? গুরুত্ব? একটু শোনার মানুষ? হ্যাঁ, হয়তো তাই।
কিন্তু সেই ‘গুরুত্ব’ খুঁজতে গিয়ে সে সবচেয়ে জরুরি মানুষগুলোকেই হারিয়ে ফেলেছে।
চোখের জল টুপ করে পড়ল ছবির ওপর। অভিকের শার্টের ওপর। কালির ছোপ লেগে গেল।
সেদিন রাতে ঘুম হলো না।
ভোরের দিকে ফোনটা হাতে নিল। কন্টাক্ট লিস্টে ‘অভিক’ নামটা জ্বলজ্বল করছে। আগের মতো ‘জান’ লিখে সেভ করা নেই। শুধু নাম।
কল বাটনে আঙুল রাখল। বুক ধড়ফড় করছে।
কী বলবে? “সরি”? “ভুল হয়ে গেছে”? কোন শব্দে বারো বছরের বিশ্বাস ফেরে? কোন ক্ষমায় মেয়েদের চোখের প্রশ্ন মোছে?
আঙুল সরিয়ে নিল।
কল করল না।
কিন্তু সেদিন সে বুঝল, কিছু কথা বলতেই হয়। ক্ষমা পাওয়ার জন্য না। নিজের ভেতরের এই পচনটা থামানোর জন্য।
স্বীকার করতে হয়—“আমি ভুল করেছি। আমি সব হারিয়েছি।”
কারণ পালিয়ে বেড়ালে ভুলটা মরে না। বরং রোজ রাতে বালিশের পাশে শুয়ে থাকে।
জানালার বাইরে আজান হচ্ছে।
নিশি উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গেল। চোখের নিচে কালি, গাল ভেঙে গেছে।
এই মুখটা তার স্বপ্নের মুখ না। এই মুখটা একটা ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল।
সে ঠিক করল, আজ অভিককে ফোন করবে। কী বলবে জানে না। শুধু বলবে।
কারণ দেরি হলেও সত্যিটা বলতে হয়।
না হলে মানুষটা মরে যায়, সত্যটা বেঁচে থাকে। আর সেই বেঁচে থাকা সত্য রোজ রাতে গলা টিপে ধরে।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।