যে চিঠি কখনো পোস্ট হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছয় পর্বের ছোটগল্প
২৪ আগষ্ট, ২০২৬
পর্ব এক
ঠিকানাহীন চিঠি
পুরোনো ডাকঘরগুলোরও একটা গন্ধ থাকে। কাগজ, আঠা, ধুলো, স্যাঁতসেঁতে কাঠ আর মানুষের অপেক্ষা—সব মিলিয়ে সেই গন্ধ। সকালে দরজা খুললে গন্ধটা হালকা থাকে। বিকেলের দিকে সারাদিনের চিঠি আর মানুষের হাতের স্পর্শ জমতে জমতে সেটাই যেন ঘন হয়ে ওঠে।
অনিরুদ্ধ সেই গন্ধের মধ্যে তেইশ বছর কাটিয়েছেন। চিঠি বাছাই করাই তাঁর কাজ। কারও চাকরির খবর, কারও আদালতের সমন, কারও বিদেশে থাকা ছেলের পাঠানো টাকা, কারও বিয়ের নিমন্ত্রণ। মানুষের জীবনের আনন্দ, ভয়, অভিমান, দুশ্চিন্তা—সবকিছুর ছোট ছোট কাগজ তাঁর হাত ঘুরে গন্তব্যে যেত।
তিনি কখনো চিঠি পড়তেন না। শুধু খামের ওপর লেখা হাতের লেখা দেখতেন। কিছু হাতের লেখা দেখে বোঝা যেত, মানুষটি খুব তাড়াহুড়ো করে লিখেছে। কিছু অক্ষর কাঁপত। কোনো খামের কোণে তেলের দাগ থাকত। কোনো কোনো খামে শিশুর আঁকা ফুল।
আর মাঝে মাঝে এমন চিঠিও আসত, যার ওপর খুব যত্ন করে লেখা— “মায়ের হাতে দেবেন।”
এই চিঠিগুলো অনিরুদ্ধ একটু সাবধানে রাখতেন। কেন, তা তিনি জানতেন না। হয়তো নিজের জীবনে এমন একটি চিঠি কোনোদিন ঠিকমতো পৌঁছায়নি বলেই।
মীরা নেই সাত বছর।
মৃত্যুর আগের রাতে হাসপাতালের বিছানায় মীরা তাঁকে ডেকেছিল।
“শোনো…”
অনিরুদ্ধ তখন বিলের কাগজ গুছাচ্ছিলেন। পরদিন ভোরে রক্ত জোগাড় করতে হবে। ডাক্তার কী বলেছেন, ওষুধ কখন দিতে হবে—এসব মাথায় ঘুরছিল।
তিনি বলেছিলেন,
“কাল বলো। আজ একটু মাথা ধরেছে।”
মীরা আর কিছু বলেনি।
সেই রাতেই তার শ্বাস থেমে গিয়েছিল।
সাত বছর পরও অনিরুদ্ধ মাঝে মাঝে ভাবেন, মীরা আসলে কী বলতে চেয়েছিল?
অভিমান?
ভালোবাসা?
কোনো গোপন কথা?
নাকি একেবারে তুচ্ছ কিছু?
মানুষের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা কখনো কখনো তার অনুপস্থিতি নয়—তার শেষ কথাটা না জানা।
সেদিন দুপুরে বৃষ্টি হচ্ছিল। ডাকঘর প্রায় ফাঁকা। অনিরুদ্ধ বাছাইয়ের টেবিলে বসেছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, তাঁর কাগজের স্তূপের ওপর একটি খাম পড়ে আছে।
কীভাবে এল, তিনি খেয়াল করেননি।
খামের ওপর কোনো ডাকটিকিট নেই। কোনো পোস্টমার্ক নেই। প্রেরকের নাম নেই। প্রাপকের ঠিকানাও নেই। শুধু এক লাইনে লেখা—
“যার কাছে আমার কথা পৌঁছায়নি।”
অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ খামটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খাম খুললেন।
ভেতরে একটি কাগজ। মাত্র তিনটি বাক্য,
“আজও তোমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলাম। তারপর মনে পড়ল, তুমি আর নেই। কথাটা তাই আবার আমার কাছেই রয়ে গেল।”
নিচে কোনো নাম নেই।
অনিরুদ্ধ কাগজটি ভাঁজ করে খামে ঢুকিয়ে রাখলেন।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর মাথায় একটি কথাই ঘুরল,
কিছু কথা কি সত্যিই মানুষের কাছে পৌঁছায় না, নাকি আমরা পৌঁছানোর আগেই মানুষটাকে হারিয়ে ফেলি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।