অতীতের ওপারে
অধ্যায় এক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১৬, জুন ২০২৬
সন্ধ্যাটা ছিল অদ্ভুত রকম শান্ত। মাগরিবের নামাজ শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। বাড়ির প্রায় সবাই নিজেদের মতো ব্যস্ত। কিন্তু রাশিদা এখনও একা বসে আছে সেই ঘরে, যেখানে সে তার মা, মেয়ে এবং ছোট ভাইবোনদের সঙ্গে থাকত।
খাটের পাশে মেঝেতে বসে সে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছিল গদির সঙ্গে। চোখ স্থির, অথচ কোনো কিছুর দিকে নয়। মনে হচ্ছিল অসংখ্য চিন্তা ভেতরে ধাক্কা দিয়ে জায়গা করে নিতে চাইছে।
সে কাঁদছিল না। হয়তো এত কেঁদেছে যে এখন আর কান্নার শক্তিটাই নেই। সে শুধু ক্লান্ত—মনে করতে, অভিনয় করতে, আর এমন এক জীবনের ভারে ক্লান্ত, যে জীবন তাকে ছাড়তে চায় না।
রাশিদা চোখ বন্ধ করল। ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
সে বদলেছে—অন্তত সে বিশ্বাস করে, বদলেছে।
একসময়কার বেপরোয়া মেয়েটা আর নেই। বহু বছর আগে সে সেই মানুষটাকে পেছনে ফেলে এসেছে। নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
কিন্তু তার অতীত যেন তাকে ছাড়তে চায় না।
মানুষের ফিসফাসে সেটা ফিরে আসে। বিচারভরা দৃষ্টিতে সেটা ফুটে ওঠে। বিয়ের কথায় সেটা সামনে আসে। আর প্রতিদিন, তার মেয়ের নিষ্পাপ চোখের দিকে তাকালেই সেটা আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তার মেয়ে—খাদিজা।
তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামত।
মাত্র সতেরো বছর বয়সে সে তাকে জন্ম দিয়েছিল।
রাশিদা তাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। তার জন্য নিজের জীবনও দিতে পারে।
তবু একটা কথা বদলায় না। খাদিজার কোনো বাবা নেই।
মারা যাওয়ার কারণে নয়—সে জানেই না সে কে।
সেই সময়টায় রাশিদার একসঙ্গে তিনজন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।
এই কথাটা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
সে ছিল তরুণী, একগুঁয়ে, বেপরোয়া।
আজও কেউ যখন খাদিজার দিকে তাকায়, সব মনে পড়ে যায়—ষোল বছরের সেই মেয়েটা, তার গর্ভধারণ, লজ্জা, অপমান, সবকিছু।
আর এটা তার প্রথম গর্ভধারণ ছিল না।
ভাবনাটা উঠলেই বুক ভার হয়ে আসে।
তখন সে ভাবত, সে সব জানে। রোমাঞ্চের পেছনে ছুটত। পরিণতির কথা ভাবত না।
তারপর বাস্তবতা দরজায় কড়া নাড়ল।
একটি পজিটিভ প্রেগন্যান্সি টেস্ট।
প্রথমবার সে গর্ভপাত করিয়েছিল। কোনো ভয় ছিল না, অনুশোচনাও না।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার গর্ভবতী হলো।
এবারও একই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মা আগেই জেনে গেলেন।
তিনি যা বলেছিলেন—
—যখন নিজের ইচ্ছায় ওই পথে গিয়েছিস, তখন মা হওয়ার দায়িত্বও নিতে হবে।
কঠিন কথা। কিন্তু সত্য।
তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, একটাও চিকিৎসা যেন বাদ না যায়।
সতেরো বছর বয়সে রাশিদা সন্তানের জন্ম দিয়েছিল।
আজ সেই সন্তান বড় হয়ে উঠেছে।
এক সুন্দর মেয়ে, যার কোনো পরিচিত বাবা নেই।
রাশিদা চোখ বন্ধ করল।
ভেতরের চিন্তাগুলো তাকে ছাড়তে চাইছিল না।
জায়নামাজের দিকে তাকিয়ে রইল।
মাঝেমধ্যে মনে হতো—এই অতীত কি কখনো থামবে?
কখনো কি মানুষ তাকে ভুলের বাইরে দেখবে?
আর কখনো কখনো মনে হতো—সে কি আদৌ সেই ভবিষ্যতের যোগ্য?
তার বয়স তখন ছাব্বিশ ছিল।
তবু ভবিষ্যৎ তখনও দূরে।
ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।
রাশিদা মুখে হাত বুলিয়ে নিল।
—দরজা খোলা।
মা আসাবে ঢুকলেন। মেয়েকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কাঁদছিস কেন? —আমি কাঁদছি না।
—চোখ না কাঁদলেও হৃদয় কাঁদে।
রাশিদা কেঁপে উঠল। —আপনারা কেন আমার অতীত ছাড়তে পারেন না?
মা শান্তভাবে বললেন—
—খাদিজা আছে। মানুষ মনে রাখবেই।
তিনি যোগ করলেন—
—এই কারণেই মেয়েদের নিজেকে আগলে রাখতে হয়।
নীরবতা নেমে এল।
—আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছি।
—আমি জানি। আল্লাহ ক্ষমা করেছেন। কিন্তু সমাজ না। আর খাদিজাও না।
রাশিদা ঠোঁট কামড়ে ধরল।
—আমি চেষ্টা করেছি।
—চেষ্টা করেছিস ঠিকই। কিন্তু কাভুর কথা শোনা উচিত। তোর চাচা ফজলু মিয়ার।
চুপ।
—আমি পারি না।
—তবু শুনতে হবে।
—তিনি কোথায় ছিলেন যখন আমরা না খেয়ে ছিলাম?
চোখে পানি।
—এখন এসে আমার জীবন ঠিক করবেন?
মা আসাবে বললেন—
—তবু শুনতে হবে। তিনি তোর বাবার মৃত্যুর পর অভিভাবক।
—তিনি দায়িত্ব নেননি।
—সেটা সত্যি।
নীরবতা।
—অভাব কি তোকে ওই পথে নিয়ে গিয়েছিল?
রাশিদা থেমে গেল।
—না, রাশিদা। তুই নিজে গিয়েছিলি।
ঘর স্থির।
রাশিদা চোখ নামিয়ে ফেলল।
—ফাতিমা তোর চেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। তবু সে যায়নি।
সব স্মৃতি ভিড় করে এল।
—তুই চেয়েছিলি।
নীরবতা।
রাশিদা ভেঙে পড়ল।
তারপর—
—তুই বদলেছিস, আমি জানি।
রাশিদা চোখ মুছল।
—কিন্তু মানুষ শুধু কলঙ্কটাই দেখে।
রাশিদা ধীরে মাথা তুলল। চোখ লাল।
—মা… কাভু যে মানুষটার কথা বলছে, আমি তাকে চিনি।(চলবে.........)
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।