উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-৯ -বিদায়ের মুহূর্ত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
ফিরে আসছিলাম আমি, কিন্তু নদীর ওপারে রয়ে গেল আমার অনেক প্রশ্ন।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পদ্মার বুকে ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে। গোধূলির সেই ম্লান আলোয় নদীতীরের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই বুকের ভেতরটা অজান্তেই কেমন শূন্যতায় মুচড়ে উঠল। কাঁচা বাঁশের নড়বড়ে সাঁকোটা পার হয়ে কাঁচা রাস্তা ছেড়ে পাকা পথের ধারে এসে দাঁড়ালাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি, শান্ত জলের ওপর তখনও সার বেঁধে বাঁধা কাঠের নৌকাগুলো। ছোট ছোট উনুন থেকে ওঠা নীল ধোঁয়া হালকা সন্ধ্যার বাতাসে মিশে যাচ্ছে, আর ঘাটের একদম শেষ প্রান্তে গলুইয়ে দাঁড়িয়ে চার-পাঁচটা ছোট শিশু নিষ্পাপ হাসি মুখে হাত নেড়ে আমাকে বিদায় জানাচ্ছে।
চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসছিল সেই ভেসে থাকা বেদে বহরের দৃশ্য, কিন্তু আমার মন পড়ে রইল সেখানেই — নদীর ওপারে, যেখানে জীবন বয়ে চলে নিজস্ব এক অচেনা গতিতে।
মাত্র কয়েকটা দিন! অথচ এই অল্প সময়ের মধ্যেই চোখের সামনে জীবনের এক বিশাল ক্যানভাস খুলে গিয়েছিল। আমরা যারা ইট-পাথরের চার দেয়ালের নিরাপদ খাঁচায় থাকতে অভ্যস্ত, সামান্য চাওয়া-পাওয়া না মিললেই যাদের মনে ক্ষোভ আর হতাশা জমে, তারা কত সহজেই ভাবি জীবনের অর্থ বুঝি কেবল বস্তুগত অর্জন আর ইঁদুরদৌড়ে লুকিয়ে আছে। কিন্তু জলের বুকে ভেসে থাকা এই যাযাবর মানুষগুলো আমাকে জীবনের অন্য এক দর্শন শেখাল।
তারা দেখাল এমন এক জীবন, যেখানে কোনো স্থায়ী ঠিকানার নোঙর নেই, জমির কোনো খতিয়ান নেই, কিন্তু মাথার ওপর আছে আকাশের মতো অবাধ স্বাধীনতা। কাল সকালে উনুনে ভাত ফুটবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা তাদের নেই, অথচ আজকের মুহূর্তটুকুকে পরম তৃপ্তি আর হাসিমুখে উদযাপন করার মতো আশ্চর্য এক বৈভব তাদের আছে। প্রকৃতির রুদ্র রূপের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে, সমাজের তাচ্ছিল্য সয়েও অল্পে সন্তুষ্ট থাকার এই জীবনবোধ আমাকে আমার ভেতরের অজস্র অহেতুক চাওয়া-পাওয়ার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।
ঘাটের সেই ভেজা মাটি ছেড়ে আসার সময় আমি কেবল কিছু দৃশ্য সঙ্গে নিয়ে আসিনি, সঙ্গে নিয়ে এসেছি কিছু অমূল্য শিক্ষা — যা শহরের কোনো পাঠশালা কিংবা লাইব্রেরির বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না। আমি শিখে এলাম, মানুষে সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সামাজিক মর্যাদা বা অর্থবিত্ত দিয়ে নয়, গড়ে ওঠে হৃদয়ের নিখাদ সহানুভূতি আর ভালোবাসায়। আমি শিখে এলাম, জীবনের কঠিন ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও কীভাবে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ধরে রেখে নতুন করে বেঁচে থাকতে হয়।
পদ্মার পাড়ে রেখে আসা সেই বিদায়ের মুহূর্তগুলো কেবল ভ্রমণের পাতা হয়ে ধুলো জমাবে না, সারাজীবন আমার ভেতরের অহংকার, কৃত্রিম ক্ষোভ আর অযাচিত প্রাপ্তির হিসাবগুলোকে শুধরে দেওয়ার জন্য প্রদীপ হয়ে থাকবে।
অজস্র প্রশ্ন, এক দীর্ঘশ্বাস আর এক গভীর প্রশান্তি বুকে নিয়ে গঞ্জের দিকে পা বাড়ালাম। নদীর চরের এই সরল মানুষগুলো হয়তো সারাজীবন এভাবেই জলের বুকে ভেসে বেড়াবে, কিন্তু আমার মনের ভেতর তারা যে অমলিন ছাপ রেখে গেল, তা স্থায়ী হয়ে রইল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।