সিরিজ-শব্দহীন পৃথিবীর গল্প
গল্প-২ সুরের ছোঁয়া
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২১ জুলাই, ২০২৬
সকালের নরম রোদে আয়ান যখন নতুন স্কুলের নীল ইউনিফর্ম পরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ওর চোখে কোনো ভয়ের ছাপ ছিল না। মিনির সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই নীরব ঘটনার পর থেকে আমাদের বুকের ভেতর এক চিলতে নতুন আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, হয়তো এই রূপময় বাইরের পৃথিবীতেও ও নিজের একটা জায়গা ঠিক খুঁজে নেবে; চারপাশের মানুষের সঙ্গে আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতে শিখবে।
কিন্তু স্কুলের প্রথম দিনটাই যে আমাদের এত বড় এক পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে, তা আমরা ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।
ক্লাসরুমটা ছিল বেশ বড় আর আলো-বাতাসে ভরা। তবে ঘণ্টা পড়তেই দৃশ্যপট এক নিমেষে বদলে গেল। একসঙ্গে অনেক শিশুর শোরগোল, কাঠের বেঞ্চ হেঁচড়ানোর কর্কশ শব্দ, মাথার ওপর পুরোনো ফ্যানের একটানা ঘড়ঘড় আওয়াজ আর জানালার বাইরে গাড়ির কর্কশ হর্ন—সব মিলিয়ে ঘরের ভেতর এক অসহ্য কোলাহলের সৃষ্টি হলো।
অন্য শিশুদের কাছে এই শব্দগুলো খুব সাধারণ হতে পারে, কিন্তু আয়ানের কাছে তা ছিল না। অটিস্টিক শিশুদের অনুভূতি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। ওর অতীব সংবেদনশীল মনের কাছে এই চেনা কোলাহলই তখন সহসা ধারালো কাঁটার মতো বিঁধতে লাগল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওর ভেতরে ভয়ের তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ল। আয়ান দুই হাতে শক্ত করে কান চেপে ধরল। যন্ত্রণায় ওর ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠল; মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ও এক ধরনের চাপা কাতরধ্বনি করতে লাগল। নিজেকে সামলাতে না পেরে ওর আকস্মিক ধাক্কায় বেঞ্চ থেকে বই, খাতা আর পেন্সিল বাক্স হুড়মুড় করে নিচে পড়ে ছড়িয়ে গেল।
ক্লাসের সবাই হতভম্ব হয়ে দৃশ্যটি দেখতে লাগল। আর পর মুহূর্তেই শুরু হলো ফিসফিসানি ও মৃদু হাসাহাসি। পাশ থেকে এক শিশু তো বেশ জোরেই বলে উঠল, "এ কেমন ছেলে রে! পাগল নাকি!"
শিক্ষকের মুখেও স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠল। প্রথম দিনেই একটা নতুন ছেলে এসে ক্লাসের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছে, এটা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, "এভাবে পড়াশোনা চালানো অসম্ভব। ওকে এখনই প্রিন্সিপালের কক্ষে নিয়ে যাও। এমন ছেলে এই স্কুলে চলবে না।"
পুরো ক্লাস যখন আয়ানের দিকে বিষাদময় আঙুল তুলেছে, সবাই যখন ধরে নিয়েছে প্রথম দিনেই ওকে অপমান সহ্য করে বেরিয়ে যেতে হবে, ঠিক তখনই এক অলৌকিক পরিবর্তন ঘটল।
একেবারে শেষ বেঞ্চে বসা একটি ছেলে, নাম অয়ন, শুরু থেকেই সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। আর দশটি শিশুর মতো ও উপহাস করেনি, ভয়ও পায়নি। ও অনুধাবন করতে পেরেছিল যে আয়ান কাউকে বিরক্ত করার জন্য এমন করছে না; ও মূলত চারপাশের বিকট শব্দের যন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আকুল হয়ে ছটফট করছে।
অয়ন এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর পকেট থেকে একটা সাদা ইয়ারপড বের করল।
কোনো তাড়াহুড়ো না করে, কোনো শব্দ না করে ও ধীর পায়ে আয়ানের দিকে এগিয়ে এল। খুব সতর্কতার সঙ্গে আয়ানের কান চেপে ধরা হাতের ফাঁক দিয়ে ইয়ারপডটি ওর কানে গুঁজে দিল। তারপর মুঠোফোনে একটা আলতো চাপ দিয়ে চালিয়ে দিল খুব মৃদু বেহালা আর পিয়ানোর সমন্বয়ে গড়া এক স্নিগ্ধ সুর।
এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড...
ক্লাসের সমস্ত কোলাহলের মাঝে আয়ানের কানে তখন শুধুই এক সুরময় ধারার বহমানতা। যেন চোখের পলকে চারপাশের সব কর্কশ শব্দ উধাও হয়ে এক পরম শান্তি নেমে এল।
আস্তে আস্তে আয়ানের শক্ত হয়ে থাকা হাত শিথিল হয়ে এল। কান থেকে হাত সরিয়ে ও বিস্ময় ভরা চোখে অয়নের দিকে তাকাল। ওর ঘন ঘন নিশ্বাস নেওয়ার গতি কমে এল; চোখের ভেতরের জমাট আতঙ্ক গলে গিয়ে সেখানে ফিরে এল প্রশান্তি। এক গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ও শান্ত হয়ে বেঞ্চে বসে পড়ল।
পুরো শ্রেণিকক্ষ তখন এক নীরব স্তব্ধতায় মগ্ন। যে শিক্ষক একটু আগেও ওকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন, তিনিও থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন। সহপাঠীদের হাসাহাসি এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল।
অয়ন মৃদু হেসে আয়ানের পাশের খালি জায়গাটায় এসে বসল। ওর কাঁধে আলতো করে হাত রেখে শান্ত সুরে বলল, "ভয় নেই, বন্ধু। আমি আছি তো। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
সেদিন কোনো মহতী উপদেশ, কোনো জটিল থেরাপি বা কঠোর নিয়ম আয়ানের পৃথিবী বদলে দেয়নি। বদলে দিয়েছিল এক শিশুর প্রতি আরেক শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত ও নিাদ সহমর্মিতা।
আমরা প্রায়ই মনে করি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে সাহায্য করতে হলে অনেক বড় ডিগ্রির প্রয়োজন, অনেক জটিল ভাবনার প্রয়োজন। আসলে তা নয়। ওদের অব্যক্ত ভাষা বোঝার জন্য হৃদয়ের অনুভূতির চেয়ে বড় কোনো জ্ঞান হতে পারে না। ওদের জায়গায় দাঁড়িয়ে বিশ্বটাকে দেখার মতো একটি উন্মুক্ত মন থাকলে, সামান্য একটি ইয়ারপড আর একটুখানি আদুরে স্পর্শেই ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ গল্প লেখা হয়ে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।