সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-৩
শেষ পাতার আগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
ডায়েরির শেষ পাতায় একটা মাত্র লাইন ছিল।
"আগামীকাল আমি হারিয়ে যাব।"
অভিক লাইনটা পড়ে হেসেই ফেলেছিল।
আরমান মাঝে মাঝেই অদ্ভুত সব কথা লিখত। তাই এটাকেও সে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু পরদিন সকালে নিশির ফোনেই খবরটা পেল।
— অভিক... আরমানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রথমে ওর কথা বিশ্বাসই হয়নি।
এক ঘণ্টার মধ্যে তারা দুজন আরমানের বাড়িতে পৌঁছে গেল।
বাড়ির সামনে ভিড়।
ভেতরে পুলিশ।
ড্রয়িংরুমে কয়েকজন আত্মীয় চুপচাপ বসে।
আরমানের মা শুধু দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। যেন এই বুঝি ছেলে ফিরে আসবে।
ঘরটা দেখে অভিকের অস্বস্তি লাগল।
সবকিছু ঠিকঠাক।
আলমারি বন্ধ।
মোবাইল চার্জে লাগানো।
মানিব্যাগ টেবিলে।
শুধু মানুষটা নেই।
পুলিশ ঘরটা দেখে বেরিয়ে যাওয়ার পর অভিকের চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটা ডায়েরিতে।
কালো মলাট।
নিশি খুলে শেষ পাতায় গেল।
এক লাইন।
"আগামীকাল আমি হারিয়ে যাব।"
সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আর কিছু লেখেনি?
অভিক মাথা নাড়ল।
ডায়েরির আগের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।
প্রথম দিকে একেবারে সাধারণ কথা।
অফিসের কাজ।
মায়ের ডাক্তার দেখানো।
মাসের খরচ।
তারপর ধীরে ধীরে লেখাগুলো বদলাতে শুরু করেছে।
এক জায়গায় লেখা,
"সবাই যা দেখবে, সেটা বিশ্বাস কোরো না।"
আরেক পাতায়,
"কিছু সত্যি লুকিয়ে রাখতেই হয়।"
বাড়ি ফেরার পথে নিশি হঠাৎ বলল,
— একটা শব্দ বারবার মাথায় ঘুরছে।
— কোনটা?
— "হারিয়ে যাব।"
অভিক তাকাল।
নিশি বলল,
— মানুষ পালিয়ে যায়। লুকিয়ে থাকে। চলে যায়। কিন্তু ও লিখেছে হারিয়ে যাবে।
দুইটা কি একই কথা?
অভিক কোনো উত্তর দিল না।
তবে কথাটা মাথা থেকে নামল না।
পরদিন সে আরমানের অফিসে গেল।
সেখানে খুব বেশি কিছু জানা গেল না।
শুধু একজন পুরোনো সহকর্মী বললেন,
— শেষ কয়েক মাস ও খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে মনে হতো, কিছু একটা নিয়ে চিন্তায় আছে।
এর বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হলেন না।
সেদিন রাতে ডায়েরিটার কথাই বারবার মনে পড়ছিল।
নিশি হঠাৎ বলল,
— ডায়েরির প্রথম পাতাটা দেখেছিলে?
— না।
— আমার মনে হচ্ছে, ও ইচ্ছে করেই কিছু রেখে গেছে।
পরদিন আবার তারা আরমানের বাড়িতে গেল।
ডায়েরিটা তখনও পরিবারের কাছেই ছিল।
নিশি প্রথম পাতা খুলতেই থেমে গেল।
নামের নিচে ছোট্ট করে লেখা,
"শেষ পাতা থেকে পড়ো।"
অভিক একবার নিশির দিকে তাকাল।
তারপর শেষ পাতা খুলে উল্টো দিক থেকে পড়া শুরু করল।
আলাদা আলাদা বাক্যগুলো ধীরে ধীরে একটার সঙ্গে একটা মিলতে লাগল।
যেন পুরো ডায়েরিটাই উল্টো দিক থেকে পড়ার জন্য লেখা।
শেষ পর্যন্ত তারা বুঝল, আরমান কিছু কাগজপত্র নিরাপদে রেখে গেছে।
সে আশঙ্কা করছিল, একদিন হয়তো তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হবে।
তাই সব কথা সরাসরি লেখেনি।
শেষের দিকের একটা পাতায় শুধু লেখা ছিল,
"যদি আমাকে খুঁজে না পাও, মানুষটাকে নয়, কারণটা খুঁজো।"
ঘরের ভেতর কেউ কথা বলছিল না।
নিশি আস্তে করে ডায়েরিটা বন্ধ করল।
— ও বুঝতে পেরেছিল, তাই না?
অভিক উত্তর দিতে একটু সময় নিল।
— হয়তো।
— তাহলে এটা বিদায় ছিল?
অভিক মাথা নাড়ল।
— না। আমার মনে হয়, এটা বিদায় না।
এটা শুধু চাইছিল, কেউ যেন ঠিক জায়গায় প্রশ্নটা করে।
আরমানকে আর পাওয়া গেল না।
অন্তত সেদিন নয়।
হয়তো কোনো দিনও না।
ফিরে আসার সময় গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল অভিক।
হঠাৎ মনে হলো, মানুষ একদিনে হারিয়ে যায় না।
তার আগে অনেকগুলো দিন থাকে, যখন সে চুপচাপ ভেতর থেকে সরে যেতে থাকে।
আমরা শুধু সেটা টের পাই না।
সেদিন রাতে নিশি আবার ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলল।
"আগামীকাল আমি হারিয়ে যাব।"
এবার লাইনটা পড়ে তার মনে হলো না, এটা ভবিষ্যৎ জানিয়ে লেখা।
মনে হলো, অনেক আগেই কেউ সাহায্যের সংকেত দিয়েছিল।
কেউ পড়েছিল।
কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।