শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–১ : ভাঙনের আগে সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
«"বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, এদের মতো সুখী পরিবার আর হয় না। অথচ সবচেয়ে বড় ভাঙনগুলো শুরু হয় নিঃশব্দে। কেউ টেরও পায় না।"»
অভিক কোনোদিন বড়লোক ছিল না। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। মাসের শেষে বেতন হাতে পেলে আগে সংসারের খরচ, তারপর দুই মেয়ের স্কুল, টিউশন, ছোটখাটো শখ—সব হিসাব কষে চলত। নিজের জন্য আলাদা করে কিছু কেনার অভ্যাসও ছিল না।
নিশি মাঝে মাঝেই হেসে বলত, “আমাদের হয়তো অনেক টাকা নেই, কিন্তু শান্তিটা আছে। এটাই তো সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
অভিক মুচকি হেসে উত্তর দিত, “এই শান্তিটা যেন কোনোদিন নষ্ট না হয়।”
তখন তারা কেউই বুঝতে পারেনি, মানুষ অনেক সময় নিজের অজান্তেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথাটাই বলে ফেলে।
তাদের বিয়ের বয়স অনেক বছর। বড় মেয়ে মেঘলা ক্লাস সেভেনে পড়ে, ছোট মেয়ে মিশি দ্বিতীয় শ্রেণিতে। সন্ধ্যায় চারজন একসঙ্গে খাওয়া, শুক্রবার বিকেলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, শীতের রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে গল্প করা—এসব ছোট ছোট মুহূর্তেই তাদের সংসারের সুখ ছিল।
পাশের ফ্ল্যাটের এক আন্টি প্রায়ই বলতেন, “তোমাদের পরিবারটাকে দেখলে মনটা ভালো হয়ে যায়।”
নিশি শুধু হেসে দিত।
কিন্তু মানুষের দেখা আর বাস্তবতা সব সময় এক হয় না।
গত কয়েক মাসে অভিকের অফিসের চাপ অনেক বেড়েছিল। নতুন প্রজেক্ট, মিটিং, অতিরিক্ত কাজ—সব মিলিয়ে প্রায়ই রাত করে ফিরতে হতো। বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে মেয়েরা ঘুমিয়ে যেত।
নিশি খাবার গরম করে টেবিলে রেখে বলত, “খেয়ে নিও। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।”
আগে এই সময় দুজনের গল্প শেষ হতো না। এখন কথাগুলো কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।
“অফিস কেমন ছিল?”
“ভালো।”
“খেয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
তারপর নীরবতা।
অভিক ভেবেছিল, হয়তো এমনটাই হয়। সংসার যত পুরোনো হয়, কথা তত কমে যায়। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, শুধু কথাই নয়, দূরত্বও বাড়ছিল।
নিশির মধ্যেও অদৃশ্য কিছু পরিবর্তন আসছিল। আগে বিকেলে ফোন করে জিজ্ঞেস করত, “কখন ফিরবে?” এখন আর করে না। আগে দরজা খুলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকত। এখন দরজা খুলেই নিজের ঘরে চলে যায়।
অভিক বিষয়টা খেয়াল করেছিল। তারপর নিজেকেই বুঝিয়েছিল, “হয়তো ও-ও ক্লান্ত। সারাদিন সংসার সামলানো কি সহজ?”
একদিন রাতের খাবারের সময় মিশি হঠাৎ বলল, “বাবা, তুমি এখন আর আমাদের সঙ্গে খেলো না কেন?”
অভিক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “এই কাজটা শেষ হলেই খেলব।”
মিশি ঠোঁট ফুলিয়ে উত্তর দিল, “তুমি সব সময় এটাই বলো।”
কথাটা শুনে নিশি একবার অভিকের দিকে তাকিয়েছিল। সেই দৃষ্টিতে অভিমান ছিল, ক্লান্তিও ছিল। কিন্তু কেউ কিছু বলল না।
দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল।
একদিন অফিস থেকে অস্বাভাবিকভাবে একটু আগে ফিরে এল অভিক। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বেল দেওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর নিশি দরজা খুলল। মুখে যেন হালকা অপ্রস্তুত ভাব।
“এত তাড়াতাড়ি?”
“মিটিং বাতিল হয়েছে।”
“ও... তাই নাকি।”
সেদিনও অভিক কিছু ভাবেনি। কিন্তু এরপর ছোট ছোট বিষয় চোখে পড়তে শুরু করল।
নিশি আগের চেয়ে অনেক বেশি ফোনে ব্যস্ত থাকে। ফোনটা প্রায়ই উল্টো করে রাখে। কল এলে অন্য ঘরে গিয়ে কথা বলে। কখনো একা একা হাসে, আবার কিছুক্ষণ পর একদম চুপ হয়ে যায়।
অভিক নিজেকে বারবার বোঝায়, “না, আমি হয়তো বেশি ভাবছি। মানুষ বদলাতেই পারে।”
সে বিশ্বাস করতেই চাইছিল। কারণ সন্দেহের চেয়ে বিশ্বাস করে ভুল করা তার কাছে সহজ মনে হতো।
সেদিন ছিল শুক্রবার। চারজনের একসঙ্গে বের হওয়ার কথা। নিশি বলল, “আজ যেতে ইচ্ছে করছে না। তোমরা যাও।”
মেঘলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মা, তুমি যাবে না?”
“শরীরটা ভালো লাগছে না।”
অভিক দুই মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। ফিরে এসে দেখল, নিশি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। দূরে কোথায় যেন তাকিয়ে।
“শরীর কেমন এখন?”
“ভালো।”
এরপর আর কোনো কথা হলো না।
সেদিন রাতেই প্রথমবারের মতো অভিকের মনে এক ধরনের অস্বস্তি বাসা বাঁধল। কারণ ছাড়া। তবু সেটা ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না।
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তার। পাশে হাত বাড়িয়ে দেখল, নিশি নেই।
ড্রয়িংরুমের দিক থেকে খুব আস্তে কথা বলার শব্দ ভেসে আসছিল। অভিক উঠে বসতেই শব্দ থেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর নিশি ঘরে ঢুকল।
“ঘুম ভেঙেছে?”
“হ্যাঁ। কোথায় ছিলে?”
“পানি খেতে গিয়েছিলাম।”
অভিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
পরদিন সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। নাস্তার টেবিলে মেয়েদের হাসি, স্কুলে যাওয়ার তাড়া—সবই স্বাভাবিক। শুধু অভিকের ভেতরটা আর আগের মতো স্বাভাবিক ছিল না।
সেদিন রাতে অফিসে জরুরি ফোন করার দরকার পড়ল। নিজের মোবাইলের চার্জ শেষ। তাই নিশির ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই একটি নতুন মেসেজ ভেসে এল।
“কাল তোমাকে না দেখে খুব খারাপ লাগছিল...”
অভিকের আঙুল থেমে গেল।
মুহূর্তের মধ্যেই স্ক্রিন নিভে গেল।
ঘরের ভেতর তখন আগের মতোই নীরব। ফ্যানের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।
কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই অভিকের মনে একটি প্রশ্ন জন্ম নিল—যে প্রশ্নের উত্তর হয়তো তার পুরো জীবনটাই বদলে দিতে চলেছে...
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।