বারান্দার নিস্তব্ধতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প - ২৬ জুলাই, ২০২৬
রাত সাড়ে এগারোটা।
অভিক বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিনের ভ্যাপসা গরমের পর সন্ধ্যায় এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন একটা ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। টবের সন্ধ্যামালতী গাছটা সেই বাতাসে অল্প অল্প দুলছে।
কিন্তু অভিকের মন সেদিকে নেই।
নিচের ফাঁকা রাস্তায় দুটো শুকনো কুকুর খাবারের খোঁজে মাথা নিচু করে হাঁটছে। চারপাশের ফ্ল্যাটগুলোতে আলো জ্বলছে, কিন্তু কোথাও কোনো শব্দ নেই। একটা থমথমে ভয় যেন পুরো বাড়িটাকে চেপে ধরে আছে।
প্রায় এক মাস হলো ঢাকার ছন্দটা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। জুনের শেষ থেকে বাজারে চাল, ডাল, তেলের জন্য হাহাকার পড়েছে। জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। শহরের অলিতে গলিতে অভাব। আর অন্যদিকে শহরের অন্য প্রান্তে এসি ঘরে বসে কিছু মানুষ কেবল মিটিং করছে, খাতায় কলমে নিয়ম বদলাচ্ছে। তাদের কোনো কথাই রাস্তার মানুষের পেট ভরাচ্ছে না।
"অভিক, এখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছো? ভেতরে এসো।"
পেছন থেকে নিশি এসে দাঁড়াল। নিশির মুখের দিকে তাকাতেই অভিকের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। গত কয়েকদিন ধরে তাদের ঘরেও টান চলছে। আজ সারাদিনে দুটো শুকনো রুটি আর পানি ছাড়া কিছুই জোটেনি।
অভিক পেছনের অন্ধকার গলিটার দিকে আঙুল তুলে বলল, "নিশি, শুনতে পাচ্ছো?"
নিশি কান পাতল। প্রথমে বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেল না। তারপর একটু মনোযোগ দিতেই শুনল, পেছনের কাঁচা ঘরগুলো থেকে কয়েকটা বাচ্চার একটানা কান্না ভেসে আসছে। ক্ষুধার কান্না।
"বাচ্চাগুলো সেই বিকেল থেকে কাঁদছে," অভিকের গলা কেঁপে উঠল। "আমি বিকেল থেকেই শুনছি। বলো তো, কেউ শুনতে পাচ্ছে না কেন? সবাই কি শুনেও না শোনার ভান করছে?"
নিশি গ্রিলটা শক্ত করে ধরল। ক্লান্ত গলায় বলল, "কে শুনবে, অভিক? সবাই নিজের পরিবার নিয়ে বাঁচবে কীভাবে সেই চিন্তায় পাগল হয়ে আছে। ভয়ে সবাই নিজের ভেতর গুটিয়ে গেছে।"
"আমিও তো তাই করছি, নিশি!" অভিক দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। "আমার নিজের পেটেও ক্ষুধা। ওদের জন্য কিছু করতে পারছি না। এই অসহায় লাগাটা আর নিতে পারছি না। নিজেকে বাঁচাতে আমিও কানের ভেতর একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিচ্ছি। আর ঘরে বসে খাতার পাতায় কবিতা লিখছি। কী হবে এই কবিতা দিয়ে? কবিতা দিয়ে কি একটা বাচ্চার পেট ভরে?"
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অভিকের হাতটা ধরল।
"কবিতা দিয়ে হয়তো পেট ভরে না, অভিক। কিন্তু কবিতা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে পাশের মানুষটা না খেয়ে আছে। তুমি যা লিখছো, সেটা ভুল না। কিন্তু শুধু লিখলে হবে না।"
অভিক অবাক হয়ে তাকাল।
নিশি বলল, "আমাদের ঘরে আজকের জন্য যে চালটুকু আছে, তার অর্ধেকটা ওদের দিয়ে আসি? এক বেলার জন্য হলেও বাচ্চাগুলোর কান্না থামবে। আর কাল সকালে আমরা বিল্ডিং এর সবাইকে নিয়ে একবার কথা বলি। সবাই মিলে যদি এক মুঠো করে চাল দিই, তাহলে কয়েকটা দিন অন্তত ওই গলির মানুষগুলো খেতে পাবে।"
অভিকের চোখে প্রথমবারের মতো একটু আলো ফিরে এল। তার মনে হলো, এতক্ষণ ধরে সে বড় কোনো সমাধানের জন্য অপেক্ষা করছিল, অথচ সমাধানটা তার ঘরের ভেতরেই ছিল।
বড় মিটিং, বড় বড় নীতিবাক্য দিয়ে এই সংকট মিটবে না। এই সংকট মিটবে ছোট ছোট ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
সেই মুহূর্তে মেঘের আড়াল থেকে চাঁদটা বেরিয়ে এল। বৃষ্টি ভেজা কামিনী ফুল থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে। বৃষ্টির পরের এই শান্ত সৌন্দর্য দেখে অভিকের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
আগে এই সৌন্দর্যে তার হিংসা হতো। মনে হতো প্রকৃতি কত উদাসীন। আজ মনে হলো, প্রকৃতি উদাসীন নয়, প্রকৃতি বরং শিখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে সব ঝড়ের পরেও নিজেকে ধুয়ে মুছে আবার সুন্দর হয়ে উঠতে হয়।
অভিক ধীরে ধীরে ঘরে এল। টেবিলের ওপর ডায়েরিটা খোলা পড়ে আছে। পাতার ওপর তারিখ লেখা - ২৭ জুলাই, ২০২৫।
সে কলমটা হাতে তুলে নিল। বাইরের বৃষ্টি ভেজা বারান্দার দিকে তাকিয়ে সে লিখতে শুরু করল। আজ আর কোনো রূপক কবিতা নয়। আজ সে লিখবে কাল সকালে সে কী করবে, তার একটা স্পষ্ট পরিকল্পনা।
ডায়েরির পাতায় সে লিখল, "বেঁচে আছি। এবং কাল সকাল থেকে শুধু বেঁচে থাকব না, অন্যকে নিয়েও বাঁচার চেষ্টা করব।"
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। বারান্দায় শুধু নিস্তব্ধতা আর কামিনী ফুলের গন্ধ পড়ে আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।