মেরিনা বিচে কিছুটা সময়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ভ্রমণ কাহিনি। ১৮ আগষ্ট, ২০২৬
চেন্নাইয়ে এসেছিলাম চিকিৎসার সূত্রে। ভেলোরের সিএমসিতে ডাক্তার দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রিপোর্ট হাতে নিয়ে আবার চিকিৎসকের কাছে ছোটা—দিনগুলো যেন একই গোল চক্করের মধ্যে ঘুরছিল। সেদিন চেন্নাইয়ে ছিলাম ফলো-আপের কাজে। সকালে ডাক্তার দেখানো শেষ করে হোটেলে ফিরতেই শরীর জানান দিল, সকাল থেকে তেমন কিছু খাওয়া হয়নি।
হোটেলের পাশের গলির ছোট্ট একটা দোকানে ঢুকে পড়লাম। কড়াইয়ে পরোটা ফুলছে, পাশে ডিম ভাজা হচ্ছে। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিলাম। আহামরি কিছু নয়। কিন্তু হাসপাতালের লম্বা করিডোর আর রিপোর্টের দুশ্চিন্তার পর ওই সাধারণ নাশতাটুকুই সেদিন খুব আপন মনে হলো। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে মনে হলো, অনেক দিন পর একটু স্বাভাবিকভাবে বসে আছি।
চা শেষ করতে করতে ঠিক করলাম, আজ আর রিপোর্ট নিয়ে ভাবব না। কয়েক ঘণ্টার জন্য কোথাও ঘুরে এলে ক্ষতি কী?
হোটেলে ফিরে খানিক জিরিয়ে একটা অটো নিলাম। গন্তব্য—মেরিনা বিচ।
অটো ছুটছিল চেন্নাইয়ের ব্যস্ত রাস্তা ধরে। জানালার বাইরে একের পর এক দোকান, পুরোনো বাড়ির গায়ে নতুন সাইনবোর্ড, বাস, গাড়ি আর মানুষের ভিড়। এত কিছু চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে মনই বসছিল না। মনের ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরছিল—আর কতক্ষণ পরে সমুদ্র দেখা যাবে?
মেরিনা বিচে পৌঁছে অটো থেকে নামতেই প্রথম যে জিনিসটা আমাকে থামিয়ে দিল, তা কোনো স্থাপনা নয়। সামনে হঠাৎ খুলে গেল বিশাল আকাশ।
সামনে বালির বিস্তার, তার পরেই বঙ্গোপসাগর। দূরে শুধু জল আর জল। ঢেউয়ের গর্জন কানে এসে লাগছে। চেন্নাইয়ের এত ব্যস্ততার মধ্যে এমন খোলা জায়গা আছে, শহরের ভেতর থেকে বোঝার উপায় নেই।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর জুতা খুলে হাতে নিলাম। বালির ওপর খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। কোথাও বালি রোদে গরম হয়ে আছে, কোথাও পায়ের নিচে নরম হয়ে ডেবে যাচ্ছে। প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে মনে হচ্ছিল, পায়ের নিচের বালিটাও স্থির নয়, একটু একটু করে সরে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে একেবারে জলের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম।
প্রথম ঢেউটা এসে শুধু পায়ের পাতা ছুঁয়ে গেল। ঠান্ডা জলের সেই ছোঁয়ায় শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। পরের ঢেউটা আরও কাছে এসে গোড়ালি ভিজিয়ে দিল। আমি নড়লাম না।
কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
গত কয়েক দিন ধরে মাথার মধ্যে শুধু চিকিৎসা, ওষুধ আর রিপোর্ট ঘুরছিল। সমুদ্র তার কোনো সমাধান দেবে না, আমি জানি। তবু ঢেউয়ের আসা-যাওয়া দেখতে দেখতে মনটা একটু শান্ত হয়ে এলো।
সমুদ্র কিছু বলছিল না। কোনো সান্ত্বনাও দিচ্ছিল না। শুধু ঢেউ আসছিল, পা ভিজিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর বালিতে ফিরে এলাম। দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আকাশ আর জল কোথায় গিয়ে মিশেছে, বোঝা যাচ্ছিল না। কোনো স্পষ্ট রেখা নেই। শুধু এক বিশাল নীলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা।
সেদিন মেরিনায় আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল এই দিগন্তটাই।
দুপুরের দিকে ক্ষুধা পেল। বিচের ধারের একটা দোকান থেকে অল্প কিছু খেয়ে নিলাম। খাওয়ার পর আবার কিছুক্ষণ হাঁটলাম। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল ডাবওয়ালা।
সমুদ্রের ধারে ডাব দেখলে না খেয়ে থাকা যায় না। একটা ডাব নিয়ে বসলাম। লোকটা কাত হয়ে থাকা কাঠের গুঁড়ির ওপর ডাব রেখে দা দিয়ে চটাস করে মাথা কাটল।
ডাবটা হাতে নিয়ে প্রথম চুমুক দিতেই মনে হলো, এর চেয়ে ঠিক সময়ের পানীয় আর হতে পারে না। ঠান্ডা জলটা গলা দিয়ে নামছিল। চারপাশে সমুদ্রের বাতাস, শরীরে রোদের ক্লান্তি, পায়ের নিচে বালি—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা বেশ ভালো লাগছিল।
পানি শেষ করে ভেতরের নরম শাঁসটুকু চামচ দিয়ে তুলে খেলাম। খুব সাধারণ একটা ঘটনা। কিন্তু আজ এতদিন পরও সেই স্বাদটা মনে আছে।
বিকেলের দিকে মেরিনা বিচের চেহারা বদলে গেল। আলো নরম হয়ে এসেছে। মানুষের ভিড় বাড়ছে। কেউ পরিবার নিয়ে এসেছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। শিশুরা বালিতে ঘর বানাচ্ছে। তরুণ-তরুণীরা ছবি তুলছে। বয়স্ক মানুষেরা ধীরে ধীরে হাঁটছেন। খাবারের দোকানগুলোতেও ভিড় জমেছে।
আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলাম।
এত মানুষ, কেউ কাউকে চেনে না। সবার জীবন আলাদা, চিন্তা আলাদা। তবু সবাই যেন একই কারণে এখানে এসেছে—কিছুক্ষণ নিজের ব্যস্ত জীবন থেকে বাইরে দাঁড়াতে।
সন্ধ্যা নামার আগে শেষবারের মতো সমুদ্রের দিকে তাকালাম।
সকালে যে মানুষটা হোটেল থেকে বেরিয়েছিল, তার কাঁধে ছিল রিপোর্টের ভার। আর এখন যে মানুষটা ফিরছে, তার ব্যাগে সেই ভার আছেই, কিন্তু মনটা আগের মতো ভারী লাগছে না।
অটো আবার শহরের দিকে ছুটল।
জানালার বাইরে চেন্নাই তার নিজের ব্যস্ততায় ফিরে গেছে। গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড়, দোকানের আলো—সব মিলিয়ে শহরটা আবার নিজের ছন্দে চলছে।
আমি চুপ করে বসে ছিলাম।
কিন্তু কানের ভেতর তখনো মেরিনা বিচের ঢেউয়ের শব্দ বাজছিল।
সেই ঢেউ, যে কিছুই বলেনি—শুধু এসে পা ভিজিয়ে দিয়ে ফিরে গিয়েছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।