সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-০৪
মেয়েটার ব্যাগ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৭ আগষ্ট, ২০২৬
মেয়েটার স্কুল ব্যাগে বইয়ের চেয়ে সংসারের দায় বেশি থাকত।
তিথি ঘুম থেকে ওঠে ভোর পাঁচটায়। মা ওঠার আগেই উঠতে হয়। উনুনে আগুন দিতে হয়, ভাত বসাতে হয়, ছোট ভাইটাকে ঘুম থেকে তুলতে হয়। বাবা রাতের শিফটে গেছে, এখনও ফেরেনি।
ঘরে একটাই ঘড়ি। দেয়ালে ঝুলছে, কাঁটা একটু আস্তে চলে। তিথি মাঝে মাঝে সেদিকে তাকায়, স্কুলে যাওয়ার সময় হলো কি না।
মা অসুস্থ। তিন মাস ধরে পায়ে ব্যথা। হাঁটতে পারে, কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছে। কিন্তু মা বিশ্রাম নিলে রান্না করবে কে, কাপড় কাচবে কে?
সেই ফাঁকটা তিথিই ভরে দেয়।
বয়স চৌদ্দ। ক্লাস নাইনে পড়ে। স্কুলের স্যার একদিন বলেছিলেন, মেয়েটা মন দিলে ভালো করবে। কিন্তু মনটা দেবে কোথা থেকে? রাতে বই খুলে বসলে চোখের সামনে অক্ষর থাকে, মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে সকালে কী রান্না হবে, ভাইয়ের ফি দেওয়া হলো কি না।
সেদিন সকালে একটু দেরি হয়ে গেল। মা শুয়ে থেকেই বলল, "তাড়াতাড়ি যা।"
তিথি ব্যাগটা কাঁধে তুলতে গিয়ে একটা বই বের করে দেখল। অঙ্কের হোমওয়ার্ক করা হয়নি। কাল রাতে বসেছিল, মাঝপথে ভাই ডাকল, তারপর আর হয়ে ওঠেনি।
সে বইটা আবার চুপচাপ ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল।
স্কুলে ঢুকতেই স্যার জিজ্ঞেস করলেন, "হোমওয়ার্ক এনেছ?"
তিথি মাথা নামিয়ে বলল, "স্যার, হয়নি।"
"কেন হয়নি?"
কী বলবে ও? বলবে কাল রাতে ভাইয়ের জ্বর এসেছিল, মাথায় পানি দিতে দিতে রাত এগারোটা বেজে গিয়েছিল? একদিন বললে স্যার শুনবেন, প্রতিদিন বললে কতদিন শুনবেন?
তাই চুপ করে রইল।
বিকেলে বাড়ি ফিরে ব্যাগটা রেখেই রান্নাঘরে গেল। মা শুয়ে আছে। ভাই উঠোনে ঘুরছে। বাবা এখনও ফেরেনি।
বেগুন কুটতে বসল। পাশে রাখা অঙ্ক বইটার দিকে মাঝে মাঝে তাকায়। একটা অঙ্ক কিছুতেই মিলছে না। স্যার ক্লাসে বুঝিয়েছিলেন, সেদিন মাথাটা অন্য দিকে ছিল।
তিথির একটাই স্বপ্ন, ডাক্তার হবে।
ছোটবেলায় মা অসুস্থ হলে টাকার অভাবে ডাক্তারের কাছে যেতে পারত না। তখন থেকেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, একদিন নিজেই ডাক্তার হবে, মায়ের চিকিৎসা নিজেই করবে।
কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে অনেকটা ফাঁক। সেই ফাঁকে আছে ঘরের কাজ, মায়ের ওষুধের হিসাব, ভাইয়ের পড়ার খরচ, বাবার ক্লান্ত মুখ।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তিথি বই নিয়ে বসে। এই সময়টায় প্রায়ই কারেন্ট থাকে না। মোমবাতি জ্বালায়। মোমের আলোয় অক্ষরগুলো কাঁপে, চোখ জ্বালা করে। তবু পড়ে।
একদিন পাশের বাড়ির এক চাচি বলেছিল, "এত পড়ে কী হবে, বিয়ে তো দিতেই হবে।"
তিথি কিছু বলেনি। শুধু বইটা আরও একটু কাছে টেনে নিয়েছিল।
আরেকদিন মা চুপচাপ বলেছিল, "তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না রে মা।"
তিথি হেসে বলেছিল, "তুমি আছো, এটাই তো অনেক।"
কথাটা বলার সময় গলার ভেতর কাঁটা বিঁধছিল, তবু বলেছিল।
ওর স্কুল ব্যাগে বই আছে, খাতা আছে, পেন্সিল আছে। আর ভাঁজ করা একটা কাগজ আছে, যেটা ও কাউকে দেখায় না।
সেই কাগজে ও নিজের হাতে একটাই লাইন লিখে রেখেছে,
"আমি পারব।"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।