সিরিজ -আমাদের না-বলা কথা।
গল্প-০৩
টিনের ছাদ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৬ আগষ্ট, ২০২৬
বৃষ্টি নামলেই তাদের সবচেয়ে বড় ভয়টা ফিরে আসে, ছাদটা এবার ভেঙে পড়বে না তো?
সন্ধ্যার আগেই আকাশ কালো হয়ে এলো। রেহানা রান্নাঘরে হাঁড়ি নামাচ্ছিল। বাইরে তাকিয়ে হাত থেমে গেল। মেঘের রং দেখলেই তার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। আগে ছাদের দিকে তাকায়, তারপর অন্য সব দিকে। বর্ষা এলেই এই অভ্যাসটা ফিরে আসে।
রহিম একটু আগেই ঘরে ঢুকেছে। আজ কাজ ছিল, কিন্তু মজুরি বেশি জোটেনি। সে উঠোন থেকে পুরোনো পলিথিনটা টেনে এনে টিনের ফুটোয় গুঁজে দিল। জানে, এতে খুব বেশি আটকাবে না। তবু না করলে মনটা শান্ত হয় না।
রাত আটটা বাজতেই বৃষ্টি নামল।
প্রথমে টিনের ওপর টুপটাপ। তারপর হঠাৎ ঝমঝম শব্দ। ঘরের কোণ থেকে পানি পড়তে শুরু করল, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। রেহানা একটা বালতি এনে বিছানার পাশে রাখল। কিন্তু বৃষ্টি বাড়তেই বালতি সরানোর সময় পাওয়া গেল না। বিছানার মাঝখানটাই ভিজে গেল।
সাফিনের তিন দিন ধরে জ্বর। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। বৃষ্টির শব্দে উঠে বসে কাশতে লাগল। রেহানা ছুটে গিয়ে কপালে হাত রাখল। গা এখনও পুড়ে যাচ্ছে।
"মা," নীলা ডাকল। সাত বছরের মেয়ে, ঘরের এক কোণে পা গুটিয়ে বসে আছে। "বিছানা ভিজে গেছে।"
"এদিকে আয়," রেহানা বলল, "এখানে পড়বে না।"
বাইরে রহিম তখন দুই হাতে বাঁশের খুঁটিটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো ভিজে গেছে। পা কাদায় ডুবে যাচ্ছে। ছাড়তে পারছে না, ছাড়লেই টিনটা উড়ে যাবে। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, রাতটা কোনোমতে পার হলেই হলো।
ঘরের ভেতর বিছানা টেনে সরানো হলো। যেটুকু শুকনো জায়গা পাওয়া গেল, সেখানে তিনজন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসল। ওষুধ নেই, দোকান বন্ধ। বাইরে রাস্তায় হাঁটু সমান পানি।
রেহানা সাফিনের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। কাশি থামছে না। মনে মনে বলল, কাল সকাল হলেই ডাক্তারের কাছে যাবে, যেভাবেই হোক।
অনেক রাতে বৃষ্টি একটু ধরল। রহিম ভেতরে এলো। জামা থেকে পানি ঝরছে। মেঝেতেই বসে পড়ল। কোনো কথা বলল না। শুধু অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আস্তে বলল, "কাল একটা বড় পলিথিন কিনতে হবে।"
রেহানা জানে এই কথার মানে কী। কাল কাজ পেলে কিনবে। না পেলে এই কথাটাই আরেকটা রাত পার করে দেবে।
সে শুধু বলল, "হ।"
ভোরের দিকে বৃষ্টি থামল। মেঝেতে তখনও পানি জমে আছে। বিছানার এক পাশ ভেজা। সাফিন কখন ঘুমিয়ে পড়েছে।
আলো ফুটলে রেহানা উঠল। বাইরে তাকিয়ে দেখল, উঠোনে কাদা থকথক করছে, পাশের ঘরের টিনের একটা অংশ ভেঙে পড়ে আছে।
ভেজা বিছানাটা টেনে দরজার কাছে আনল। রোদ উঠলে মেলে দেবে।
রহিম মুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে গেল। নীলা ঝাড়ু হাতে মেঝের পানি ঠেলছে। এই বয়সেই কাজটা শিখে গেছে। এমন ঘরে বড় হলে এমনিই হয়।
রেহানা সাফিনকে কোলে তুলে নিল। রাস্তায় এখনও কাদা, তবু পা বাড়াল।
এই ঘরটা দুর্বল। প্রত্যেক বর্ষায় প্রশ্ন জাগে, এবার টিকবে তো? তবু এখানেই তাদের রাত কাটে। এখানেই সকাল হয়। এখান থেকেই আবার সব শুরু হয়।
একটা নিরাপদ ছাদ, একটু শুকনো মেঝে। এর বেশি তো কিছু চাওয়ার নেই তাদের।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।