শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–১০ : শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"শেষে বুঝলাম, সম্পর্কের যুদ্ধে কেউ জেতে না। কেউ শুধু একটু কম হারে।"
পাঁচ বছর।
সময় স্রোতের মতো। অনেক কিছু ভাসিয়ে নেয়, ধুয়ে দেয়। কিন্তু কিছু দাগ পাথরে খোদাই হয়ে যায়। মোছে না।
অভিকের চুলে এখন রুপোলি রেখা। প্রমোশন হয়েছে, কেবিন হয়েছে, ভিজিটিং কার্ডে ‘সিনিয়র ম্যানেজার’ লেখা।
তবু সকাল ছ’টায় অ্যালার্ম বাজলে সে-ই ওঠে। নিজের জন্য চা, মেয়েদের জন্য টোস্ট। ছুটির দিনে তিনজন মিলে ধানমন্ডি লেকে হাঁটতে যাওয়া, কাচ্চি খাওয়া, বইমেলায় ঘোরা—এটাই এখন সংসার।
সংসারটা আগের মতো না। তবু সংসার।
মেঘলা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইংরেজি সাহিত্য। চোখে চশমা, কাঁধে ব্যাগ, কথায় যুক্তি। মিশি কলেজে উঠল এই বছর। ছবি আঁকে, কবিতা লেখে, বাবার মতো চুপচাপ।
দুজনেই বড় হয়েছে। নিজের জুতো নিজে বাধে, নিজের পথ নিজে ঠিক করে।
কিন্তু কিছু মুহূর্তে ওরা থমকে যায়।
বন্ধুর বাসায় গিয়ে যখন দেখে, মা ভাত বেড়ে দিচ্ছে, বাবা পাশে বসে পেপার পড়ছে—মেঘলা দুই সেকেন্ড চুপ করে থাকে। মিশি আড়চোখে তাকায়। কেউ বোঝে না। কিন্তু ওরা জানে, বুকের ভেতর কোথায় লাগে।
নিশিও থেমে থাকেনি।
একটা এনজিওতে কাজ করে। ব্যস্ত রাখে নিজেকে। মেয়েদের জন্মদিনে প্রথম ফোনটা তার। পরীক্ষার আগের রাতে মেসেজ—“রিল্যাক্স। তুই পারবি।” মিশির জ্বর হলে অফিস ফেলে ছুটে আসে থার্মোমিটার হাতে।
মা হওয়ার দায়িত্ব থেকে সে একদিনও পালায়নি।
তবু রাতগুলো খালি।
ড্রয়ারে রাখা পুরোনো অ্যালবামটা মাঝে মাঝে বের করে। কক্সবাজার, সাজেক, মেঘলার ক্লাস ফাইভের রেজাল্টের দিন—চারজনের হাসি।
ছবিতে হাত বুলিয়ে আবার তুলে রাখে। কারণ সে জানে, ফ্রেমে ফেরা যায়। সময়ে ফেরা যায় না।
অভিক আর নিশি এখন কী?
স্বামী-স্ত্রী না। শত্রুও না।
দুইজন সহ-অভিভাবক। মিশির কলেজ ফর্ম ফিলাপ, মেঘলার টিউশন ফি, ডাক্তার—ফোনে কথা হয়। দরকারে দেখা হয়।
দোষারোপ নেই। খোঁচা নেই।
কারণ দুজনেই বুঝে গেছে, কাটা ঘায়ে নুন দিলে ঘা শুকায় না, শুধু জ্বালা বাড়ে।
একদিন বিকেল। মিশির কলেজে ভর্তি উপলক্ষে ছোট আয়োজন। বাসায় পোলাও, রোস্ট, পায়েস।
চারজন এক টেবিলে। অনেকদিন পর।
খেতে খেতে মিশি হঠাৎ হেসে বলল, “জানো, ক্লাস ফাইভে থাকতে আমি রোজ দোয়া করতাম—আল্লাহ, কাল সকালে যেন উঠে দেখি সব ঠিক হয়ে গেছে। মা আবার রান্নাঘরে, বাবা পেপার পড়ছে।”
কেউ হাসল না।
মেঘলা প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমিও। কিন্তু একদিন বুঝলাম, কিছু দোয়া কবুল হয় না। কারণ আমরা নিজেরাই সেটা নষ্ট করে ফেলি।”
নিশির গলায় ভাত আটকে গেল। পানি খেল।
অভিক জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। রোদ মরে আসছে।
কিছু স্বপ্ন থাকে, যেগুলো শুধু শৈশবেই দেখা যায়। বড় হলে সেগুলো আর মানায় না।
খাওয়া শেষে মেঘলা বারান্দায় গেল। অভিক পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“বাবা,” মেঘলা বলল। গলাটা শান্ত, কিন্তু ভারী। “একটা কথা বলি?”
“বল মা।”
“আমি যদি কখনো সংসার করি... আমি একটা জিনিস করব না।”
“কী?”
“চুপ করে থাকব না। রাগ হলে বলব। কষ্ট হলে বলব। একা লাগলে বলব। কারণ আমি দেখেছি, না বলা কথাগুলো কীভাবে মানুষকে শেষ করে দেয়।”
অভিক মেয়ের মাথায় হাত রাখল। তার চোখে পানি এল না। বুকে একটা শান্ত নদী বয়ে গেল।
এত বছরের রক্তক্ষরণ তাহলে বৃথা যায়নি। অন্তত একজন শিখেছে—সম্পর্ক মানে শুধু ভালোবাসা না। সম্পর্ক মানে সময়মতো সত্যি কথা বলার সাহস।
সম্মান। বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসটা রোজ একটু একটু করে যত্ন করা। কারণ ভাঙতে এক সেকেন্ড লাগে, গড়তে জীবন লেগে যায়।
সূর্য ডুবছে।
আকাশ কমলা, বেগুনি, তারপর ধীরে ধীরে কালো।
চারজন মানুষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে। এক আকাশের নিচে। কিন্তু চারটা আলাদা ছায়া।
তারা এক হয়নি। আর হবেও না।
তবু তারা শিখেছে—ভেঙে গেলেও ভদ্রতা রাখা যায়। ক্ষমা করা যায়। নিজের সন্তানের জন্য নিজের ইগো সরিয়ে রাখা যায়।
কিন্তু কিছু ক্ষতি চিরস্থায়ী।
অভিক হারিয়েছে নিশ্চিন্তে ঘুম।
নিশি হারিয়েছে ‘বাসা’ নামের শব্দটা।
মেঘলা আর মিশি হারিয়েছে সেই শৈশব, যেখানে মা-বাবা মানে ছিল একটা শব্দ, দুটো নয়।
কোনো আদালত, কোনো থেরাপি, কোনো সময় এই ক্ষতি ফেরত দিতে পারবে না।
এই সত্যটা মেনে নিয়েই তাদের বাঁচতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি।
শুধু সবাই কিছু না কিছু হেরেছে। কেউ বেশি, কেউ কম।
— সমাপ্ত —
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।