শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি সিরিজের
সিরিজের পর্যালোচনা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
আমি যখন "শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি" লিখতে শুরু করি, তখন আমার মাথায় কোনো বড় তত্ত্ব ছিল না। আমি শুধু আমাদের চারপাশের ঘরগুলোর ভেতরের নীরবতাটা লিখতে চেয়েছিলাম। বাইরে থেকে যে পরিবারগুলোকে দেখলে মনে হয় এর চেয়ে সুখী পরিবার আর হয় না, তাদের ভেতরেই যে কী ভীষণ নিঃশব্দে ভাঙন শুরু হয়, সেটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
আমি ইচ্ছে করেই কাউকে ভিলেন বানাইনি। কারণ বাস্তবে বিচ্ছেদের পর কেউ জেতে না।
আমার চোখে এই গল্পের বাস্তবতাঃ-
আমি গল্পটাকে চিৎকার দিয়ে বলতে চাইনি। আমি চেয়েছি নীরবতা দিয়ে বলতে।
আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারগুলো মারামারি করে ভাঙে না। ভাঙে কথা কমে গিয়ে। অভিকের অফিসের চাপ, রাতে দেরি করে ফেরা, নিশির খাবার ঢেকে রেখে শুয়ে পড়া, এই দৃশ্যগুলো আমি বানাইনি। এগুলো আমাদের রোজকার জীবন। আমি দেখাতে চেয়েছি, ভালোবাসা কমে গেলে সংসার ভাঙে না, সংযোগ কমে গেলে ভাঙে।
যখন নিশি ফোন উল্টে রাখে, যখন বারান্দায় গিয়ে আস্তে আস্তে কথা বলে, তখন পাঠক হিসেবে আপনার রাগ হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি ওই জায়গাটায় অভিকের দোটানাটাও লিখতে চেয়েছি। একজন সাধারণ স্বামী একটা মেসেজ দেখেই তার বারো বছরের বউকে সন্দেহ করতে চায় না। সে নিজেকেই বোঝায়, আমি হয়তো বেশি ভাবছি। এই টানাপোড়েনটা খুব বাস্তব।
আর আমি সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছি ভাঙনের পরের জীবনে। আমাদের বেশিরভাগ গল্প ডিভোর্স পেপারে সই পর্যন্ত শেষ হয়ে যায়। আমি দেখাতে চেয়েছি, আসল যুদ্ধটা শুরু হয় তার পরদিন সকাল থেকে। যখন অভিককে একা রান্নাঘরে দাঁড়াতে হয়, যখন পোড়া ডিম দেখে মেয়ে বলে ওঠে, মা তো এমন বানায় না। ওই একটা লাইন লেখার সময় আমার নিজেরই বুকটা ভারী হয়ে গিয়েছিল।
আমি যেভাবে অভিক, নিশি আর মেয়ে দুটোকে দেখিঃ-
আমি লেখার সময় কাউকে একশো ভাগ দোষী ভাবিনি।
নিশি আমার কাছে একজন একা হয়ে যাওয়া মানুষ। তার একাকীত্বটা সত্যি। সারাদিন চার দেয়ালের ভেতর সংসার টানা, কারও সাথে মন খুলে কথা বলতে না পারা, এই কষ্টটা আমি অস্বীকার করতে চাইনি। কিন্তু তার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। একাকীত্ব একটা অনুভূতি, কিন্তু সেই অনুভূতি থেকে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া একটা সিদ্ধান্ত। সে চাইলে চিৎকার করে বলতে পারত, আমার দমবন্ধ লাগছে। সে তা না করে একটা সহজ আশ্রয় খুঁজেছে। আমি পরে সায়ানের সাথে তার জীবনটা ফাঁকা করে দিয়ে দেখিয়েছি, যে সম্পর্কে শুধু শোনা আছে, দায় নেই, সেই সম্পর্কও একসময় জেলখানা হয়ে যায়।
অভিক আমার কাছে সমাজের চোখে ভালো মানুষ। পরিশ্রমী, দায়িত্ববান। কিন্তু আমি ওর ভেতরের ফাঁকিটা লিখতে চেয়েছি। ও ভেবেছে টাকা আনলেই বাবা হওয়া যায়, স্বামী হওয়া যায়। ও ভুলে গেছে, সংসারে উপস্থিত থাকতে হয়। নিশির চুপ হয়ে যাওয়াকে ও শান্তি ভেবেছে, কখনো প্রশ্ন করেনি। আমি যে লাইনটা লিখেছি, আমি শুধু টাকা আনতে ব্যস্ত ছিলাম, মানুষটাকে আনতে ভুলে গেছি, এটা অভিকের মুখ দিয়ে আমার নিজের উপলব্ধিটাই বলানো।
আর মেঘলা আর মিশি হলো এই গল্পের আসল আয়না। ওদের কোনো দোষ নেই। ওরা শুধু ভোগে। আমি যখন লিখি, মিশি রাতে কেঁদে বলে, তুমি আমাকে রেখে চলে যাচ্ছিলে, আমি একা, তখন আমি বোঝাতে চাই, বড়দের ভুলের সবচেয়ে বড় মাশুল দেয় বাচ্চারা।
ওরা কি পারত ভুলগুলো শোধরাতেঃ-
আমি বিশ্বাস করি, পারত। খুব সহজেই পারত।
যদি ফোনের ওই মেসেজটা আসার অনেক আগে, একটা সন্ধ্যায় ওরা দুজন মুখোমুখি বসত। যদি অভিক ফোনটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন না করে বলত, নিশি, তোমার কি মন খারাপ, তোমাকে অনেকদিন হাসতে দেখি না। যদি নিশি বলত, আমার সারাদিন একা লাগে, আমার তোমার সাথে চা খেতে ইচ্ছে করে।
আমার মনে হয়, পরকীয়া বেশিরভাগ সময় ভালোবাসার অভাবে হয় না, গুরুত্বের অভাবে হয়। ওরা যদি সপ্তাহে একটা বিকেল শুধু নিজেদের জন্য রাখত, যেখানে ফোন থাকবে না, অফিসের গল্প থাকবে না, শুধু দুজন মানুষ থাকবে, তাহলে হয়তো এই গল্পটা অন্যরকম হতো। আমি এই না বলা কথাগুলো জমে ওঠাকেই ভাঙনের কারণ হিসেবে দেখিয়েছি।
এই সিরিজ দিয়ে আমি আসলে কী বলতে চেয়েছিঃ-
আমি কাউকে জ্ঞান দিতে চাইনি।
আমি শুধু তিনটা কথা বলতে চেয়েছি।
প্রথম কথা, সুখী সংসার মানে ঝগড়া নেই এমন সংসার না। সুখী সংসার মানে যেখানে ঝগড়ার পরেও কথা হয়।
দ্বিতীয় কথা, বিচ্ছেদ কোনো সমাধান নয়। এটা একটা নতুন যুদ্ধের নাম। আদালত দুজন মানুষকে আলাদা করে দিতে পারে, কিন্তু দুটো বাচ্চার বুকের ভেতরের প্রশ্নটার রায় কোনো আদালত দিতে পারে না।
তৃতীয় কথা, সন্তানের সামনে ভালো থাকার অভিনয় করলেই হয় না। ওরা সব বুঝতে পারে। ওরা স্পঞ্জের মতো সব শুষে নেয়। ওদের শৈশব বাঁচাতে হলে আগে নিজেদের সম্পর্কের যত্ন নিতে হয়।
আমার কাছে এই লেখার সার্থকতা কোথায়ঃ-
আমি যখন পর্বগুলো লিখি, অনেকেই আমাকে ইনবক্সে লিখেছে, ভাই, এটা তো আমার ঘরের গল্প। আমার কাছে এটাই সার্থকতা।
আমি নিশিকে খারাপ বানাইনি, অভিককে মহান বানাইনি। আমি দুজনকেই মানুষ বানিয়ে রেখেছি, যে ভুল করে, কাঁদে, আবার বাঁচার চেষ্টা করে। আমি শেষে ওদের আবার এক করে দিইনি। কারণ বাস্তবে সব ভাঙা জোড়া লাগে না। আমি দেখিয়েছি, ভেঙে গিয়েও কীভাবে ভদ্রভাবে বাঁচা যায়, সন্তানের জন্য কীভাবে নিজের ইগো সরিয়ে রাখা যায়।
আমি চেয়েছি, এই গল্পটা পড়ার পর কোনো স্বামী রাতে বাসায় ফিরে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করুক, আজ তোমার মন কেমন। কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে বলুক, আমার একা লাগছে।
যদি একটা পরিবারেও এই প্রশ্নটা নতুন করে শুরু হয়, আমি মনে করব আমার এই দশটা পর্ব লেখা সার্থক হয়েছে। কারণ শেষ পর্যন্ত আমি দেখাতে চেয়েছি, সম্পর্কের যুদ্ধে কেউ জেতে না। কেউ শুধু একটু কম হারে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।