নতুন প্রজন্মের নিরাপত্তাহীনতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫
“তুমি কি কখনো এমন ভয় পেয়েছ যে, পিছনে ফিরতে ভয়, সামনেও কিছু নেই?”
আমার বন্ধু শান্ত। সদ্য চাকরি পেয়েছে একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে। বেতন মোটা। গতকাল রাতে ফোন করে বলল, “জাহিদ, আমি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাই।” আমি হেসে বললাম, “পাগল হয়েছিস?” ও বলল, “না ভাই, আমার মনে হয় কালকে যদি আমাকে লে-অফ করে দেয়, তাহলে আমি রাস্তায় নেমে যাব। এই ভয়টা আমাকে খেয়ে ফেলছে।” ওর গলায় কাঁপুনি। যে ছেলে একসময় স্বপ্ন দেখত বড় কিছু করবে, সে আজ ভয়ে কাঁপছে।
আমার ছোট বোন সারা। ইউনিভার্সিটিতে থার্ড ইয়ার। গত রাতে ওর রুম থেকে কান্না শুনে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” বলল, “দাদা, আমার বন্ধুরা সবাই ইন্টার্নশিপ পেয়ে গেছে। আমি পাইনি। আমার কি কোনো ভবিষ্যৎ নেই?” আমি কী বলব? আমি নিজেও তো জানি, চাকরির বাজারে একটা ইন্টার্নশিপ না থাকলে কীভাবে লোকে নাক সিঁটকায়।
আমার কাজিন রাকিব। বিয়ে করেছে এক বছর হলো। বউয়ের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক। কিন্তু গতকাল বলল, “ভাই, আমি বাচ্চা নিতে ভয় পাচ্ছি। এই দেশে বাচ্চা মানুষ করব কীভাবে? স্কুলের ফি, পড়াশোনা, চাকরি—সবকিছু ভেবে আমার বুকটা ধড়ফড় করে।” যে ছেলে একসময় বলত “আমি বড় পরিবার করব”, সে আজ ভবিষ্যতের ভয়ে বাচ্চা নিতে ভয় পাচ্ছে।
আমি নিজেও তো একই। ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু মনে নেই। প্রতি মাসে বেতন আসার পর ভাবি—এই টাকা কতদিন চলবে? যদি চাকরি চলে যায়? যদি বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়ে? যদি আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে যাই? এই “যদি”গুলো আমাকে রাতে ঘুমোতে দেয় না।
আমরা এমন একটা প্রজন্ম যারা সবকিছু পেয়েও কিছুই পাইনি।
- পড়াশোনা করেছি, কিন্তু চাকরির নিশ্চয়তা নেই
- চাকরি করছি, কিন্তু কালকে থাকবে কি না জানি না
- বিয়ে করছি, কিন্তু সংসার চালানোর নিশ্চয়তা নেই
- বাচ্চা নিতে চাই, কিন্তু তার ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই
আমরা সবাই একটা পাতলা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছি। নিচে কিছুই নেই। একটু টাল খেলেই শেষ।
আমরা অনলাইনে হাজার ফ্রেন্ড, কিন্তু রাত তিনটায় যখন বুক ধড়ফড় করে, তখন কার নম্বরে ফোন করব? কেউ ফোন তুলবে না। কারণ সবাই নিজের নিরাপত্তাহীনতায় ডুবে আছে।
আমি আর পারছি না এই ভয় নিয়ে বাঁচতে। আমি চাই একটু নিশ্চিত হতে। একটু নিশ্বাস নিতে। একটু ভুল করতে। একটু কাঁদতে। আর কেউ যদি বলে, “তুই দুর্বল”, আমি বলব, “হ্যাঁ, আমি দুর্বল। কিন্তু অন্তত আমি বেঁচে আছি।”
তাই আজ থেকে আমি চেষ্টা করব।
- ভয় হলে বলব। লুকাব না।
- কারো কষ্ট দেখলে জিজ্ঞেস করব, “তুই কেমন আছিস? সত্যিটা বল।”
- ছোট ছোট নিরাপত্তা তৈরি করব—একটা সঞ্চয়, একটা সত্যিকারের বন্ধু, একটু নিজের সময়।
- আর যদি কেউ বলে “তুই পারবি না”, আমি বলব, “দেখি। অন্তত চেষ্টা তো করছি।”
তুমি যদি এই লেখা পড়ে থাকো আর তোমার বুকটা ভারী লাগছে, তাহলে একটা কাজ করো।
আজ একজনকে মেসেজ করো। শুধু লিখো, “ভাই/আপু, তুই কেমন আছিস? সত্যিটা বল।”
দেখবে, কতগুলো মুখোশ খসে পড়বে। কতগুলো হাত ধরবে তোমার হাত।
আমরা হয়তো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ পাব না।
কিন্তু একে অন্তত একটু কম ভয়ের করে তুলতে পারি।
এটুকু তো পারি, তাই না?
নিজের নিরাপত্তার জন্য পদক্ষেপ নিন। কথা বলুন, সাহায্য নিন, সংযোগ তৈরি করুন।
#নতুন_প্রজন্মের_ভয় #নিরাপত্তাহীনতা #কালকের_চিন্তা #আমিও_ভয়_পাই #একটু_নিশ্বাস_নেই
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।