অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ১০: আমি কি সত্যিই অসুস্থ?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
তুমি যা দেখছ, সেটা বাস্তব নয়।
ডা. রেজওয়ান করিম কথাটা বললেন খুব নরম গলায়। যেন কাঁচের গ্লাসে আস্তে করে চামচ নামিয়ে রাখছেন। এসির হালকা শব্দ ছাড়া চেম্বারে আর কিছু নেই।
আমি হাসলাম না। রাগও করলাম না। শুধু চেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরে বললাম,
আপনি নিশ্চিত? একদম নিশ্চিত?
উনি কলমটা নামিয়ে রাখলেন। আমার চোখের দিকে তাকালেন। উত্তর দিলেন না। প্রেসক্রিপশন প্যাডটা সাদা পড়ে রইল।
সেই নীরবতার ভেতর প্রথমবার টের পেলাম, ঘরে দুজন মানুষ বসে আছি। অথচ সত্যি বলছে একজনই।
সমস্যা হলো, কে? আমার বুকের ভেতর কেউ যেন ফিসফিস করল, দুজনই।
শুরুটা এক বছর আগে হতে পারে।
অফিস থেকে ফিরতাম সন্ধ্যা সাতটায়। কলাবাগানের গলি, পাঁচতলা বাড়ি, লিফট নেই। সিঁড়ির ধাপে ধাপে লাল রঙ চটে গেছে। তিনতলায় উঠলেই দেখতাম, উনি দাঁড়িয়ে।
চেহারা ভোলার মতো। বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ। ছাই রঙের শার্ট, কালো প্যান্ট। ভিড়ে মিশে যাবে। কিন্তু চোখ দুটো শান্ত। পুকুরের জলের মতো স্থির।
প্রথমদিন বলেছিলেন, নতুন এসেছ? আমি রায়হান। পাশের বিল্ডিংয়ে থাকি, তিনতলায়।
এরপর রোজ। আমি সিঁড়ি ভাঙতাম, উনি সিগারেট ধরাতেন না, পান খেতেন না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকতেন। দেয়ালে হেলান দিয়ে।
আজ বস ঝাড়ল?
হ্যাঁ। আপনি কীভাবে জানলেন? ফাইল ছুড়ে মেরেছে।
উনি হাসতেন। মুখ দেখলেই বোঝা যায়, অভিক। আমি মানুষ পড়তে পারি। তিরিশ বছর মার্কেটিং-এ ছিলাম।
আমার ভালো লাগত। ঢাকা শহরে কেউ কারও খবর নেয় না। দারোয়ানও না। উনি নিতেন। উপদেশ দিতেন। সবাইকে কলিজা দেখাস না। সবাই বন্ধু না। বিশেষ করে হিসাবের লোকজন।
আমি ওনাকে বন্ধু ভাবতাম। একমাত্র বন্ধু। অফিসের কেউ না, বাসার কেউ না।
নিশি ধরল তিন মাসের মাথায়।
এক সন্ধ্যায় আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি। হাতে চায়ের কাপ। নিশি চা নিয়ে এল। এলাচের গন্ধ।
কার সাথে কথা বলো?
আমি ঘুরে তাকালাম। রায়হান ভাই তো পাশেই। গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে।
আরে, রায়হান ভাই। পরিচয় করিয়ে দিই। আমার বউ।
নিশি ট্রেটা শক্ত করে ধরল। চোখ বড় বড়। বারান্দার এমাথা-ওমাথা তাকাল। টবের গাছ, শুকনো কাপড়। কই? কোথায়?
আমি হেসে ফেললাম। মজা করো? উনি তো... আমি রায়হান ভাইয়ের দিকে তাকালাম। উনি হাসছেন। আমার দিকে। নিশির দিকে না। যেন নিশি বাতাস।
এই যে। আপনার পাশে। গ্রিল ধরে।
নিশি এক পা পিছাল। চায়ের কাপ কেঁপে উঠল। ডিশে লেগে টুং শব্দ। অভিক... এখানে... এখানে কেউ নেই। শুধু তুমি। আর আমি।
আমি হাসি থামালাম। মজা করো? উনি তো বললেন, তোমার রান্নার হাত ভালো। গতকাল ইলিশ করেছিলে না?
নিশি চা রেখে ঘরে চলে গেল। সেদিন রাতে আমার পাশে শুলো না। সোফায়। কম্বল মুড়ি দিয়ে।
প্রথমবার ওর চোখে ভয় দেখলাম। আমার জন্য। ঠিক ভয় না, একটা আতঙ্ক।
তারপর শব্দ শুরু হলো।
রাত তিনটায় ঘুম ভাঙত। কেউ ফিসফিস করে নাম ধরে ডাকছে। অভিক... অভিক... ওঠো। গলাটা চেনা, কিন্তু কার বুঝি না।
বাথরুমে যেতাম। না, নিশি ঘুম। নাক ডাকছে হালকা।
পাশের ঘরে চেয়ার টানার শব্দ। খচ করে। আমি দৌড়ে যেতাম। ঘর ফাঁকা। চেয়ার যেখানে ছিল সেখানেই। ধুলো জমে আছে।
অফিসে ফাইল দেখছি, কানের কাছে কেউ বলবে, পেছনের কলিগটা তোর নামে লাগাচ্ছে। প্রমোশন আটকাবে। সাবধান। ম্যানেজারকে মেইল করছে।
ঘুরে তাকাতাম। সবাই পিসিতে মুখ গুঁজে। কেউ তাকাচ্ছে না। এসির শব্দ।
শব্দগুলো স্পষ্ট। নিশির গলার চেয়েও স্পষ্ট। নোটিফিকেশনের টুং শব্দের চেয়েও।
নিশি বলত, ডাক্তার দেখাও। প্লিজ। আমার জন্য।
আমি বলতাম, পাগল আমি না তুমি? আমি যা শুনি তা সত্যি। তুমি শুনতে পাও না, সেটা তোমার কান খারাপ। বা তুমি ইচ্ছে করে শুনছ না।
নিশি কাঁদত। বালিশ ভিজে যেত। আমি বুঝতাম না কেন কাঁদে। আমি তো ভালো আছি।
বড়দা একদিন জোর করে নিয়ে গেল। ট্রেনে করে রাজশাহী থেকে এসেছে। এক ঘণ্টা। শুধু কথা বলবি। ডা. রেজওয়ান ভালো। আমার বন্ধু।
ডা. রেজওয়ান। তিনি থামালেন না। এক ঘণ্টা না, দেড় ঘণ্টা বললাম। রায়হান ভাইয়ের কথা। রাতের ফিসফিস। অফিসের কানাঘুষা। নিশির অবিশ্বাস।
সব শেষে উনি বললেন, অভিক, আপনি মিথ্যা বলছেন না। আপনার ব্রেইন এই সিগন্যালগুলো তৈরি করছে। ডোপামিন বেশি হচ্ছে হতে পারে। অডিটরি কর্টেক্স অ্যাকটিভ। আপনার কাছে এটা রেডিওর গানের মতো রিয়েল। ভলিউম কমানো-বাড়ানো যায় না। কিন্তু স্টেশনটা আপনার মাথার ভেতর। বাইরে না। আমরা ওষুধ দিলে রেডিওটা আস্তে হবে। বন্ধ না। আস্তে। নয়েজ কমবে।
আমি বিশ্বাস করিনি।
আপনি বলছেন রায়হান ভাই নেই? আমি পাগল? আমার চাকরি আছে, সংসার আছে।
আমি বলছি, উনি আপনার প্রোটেক্টর। আপনার ব্রেইন ওনাকে বানিয়েছে। কারণ আপনি একা। ভয় পান। অফিসে স্ট্রেস। বাবা নেই।
ওষুধ দিলেন। অলানজাপিন ৫ মিগ্রা। রাতে একটা।
নিশির মুখের দিকে তাকিয়ে খেলাম। ওর জন্য। ওর চোখে পানি ছিল।
প্রথম মাস জাহান্নাম।
ঘুম। বমি। মাথা ঝিমঝিম। ওজন বাড়ল তিন কেজি। আর সবচেয়ে খারাপ, নীরবতা।
সন্ধ্যা সাতটায় বুকের ভেতর খালি লাগত। সিঁড়ি ফাঁকা। কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না।
রাত তিনটায় কেউ নাম ধরে ডাকে না। মশার কয়েলের গন্ধ।
অফিসে কেউ সাবধান করে না। নিজে ভুল করি।
আমি একা।
একদিন সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদলাম। শব্দ করে না, চুপচাপ। রায়হান ভাই, আপনি কই? রাগ করেছেন? আমি ওষুধ খাই বলে?
উত্তর নেই। বাতাস। রিকশার বেল।
নিশি পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আমি আছি তো। আমাকে দেখো।
আমি ওকে ধাক্কা দিলাম না। এই প্রথম। ওর কাঁধে মাথা রাখলাম।
ছয় মাস। আমি সুস্থ।
অফিসে প্রমোশন হলো। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ। বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার গেলাম। রাতে নিশির সাথে ছাদে হাঁটি। চাঁদ দেখি।
এক রাতে ও বলল, তোমাকে ফিরে পেয়েছি, অভিক। আমার পুরোনো অভিক।
আমি বললাম, হয়তো আমি সত্যিই অসুস্থ ছিলাম। তুমি ছিলে বলে বেঁচে গেছি।
বলতে গিয়ে বুকটা হালকা লাগল। স্বীকার করতে ভয় লাগে না এখন। থেরাপি কাজ করছে।
ডা. রেজওয়ান শেষ সেশনে বললেন, একটা কাজ করুন। গত এক বছরের যা যা স্পষ্ট মনে আছে, লিখুন। মেমরি ম্যাপ। ডায়েরি না, জার্নাল। লিখলে ব্রেইন নিজেই ধরতে পারে, কোনটা গ্যাপ। কোনটা কনফ্যাবুলেশন।
আমি বাসায় এসে খাতা খুললাম। নতুন খাতা। পাঁচ টাকার।
লিখলাম।
রায়হান ভাইয়ের কথা। প্রথম দেখা। ১৪ মার্চ। তার উপদেশ। সিগারেটের গন্ধ না থাকা।
রাতের ফিসফিস। ওরা ভালো না। সাবধানে থাকো।
নিশির সাথে ঝগড়া। তুমি আমাকে পাগল ভাবো। আমি চলে যাব।
অফিসের ঘটনা। কলিগ ফাইল সরিয়েছে। রায়হান ভাই বলেছিলেন। আমি ধরেছি।
দশ পৃষ্ঠা। তারিখ দিয়ে। নিয়ে গেলাম ডাক্তারের কাছে।
উনি পড়লেন। দশ মিনিট। চশমাটা বারবার ঠিক করলেন। তারপর খাতাটা আমার দিকে দিলেন।
অভিক, নিজে পড়ুন। জোরে পড়ুন। আমার সামনে।
আমি পড়লাম।
প্রথম পাতা। ঠিক। বান ভুল আছে দু-একটা।
দ্বিতীয় পাতা। ঠিক। অফিসের তারিখ মিলেছে।
তৃতীয় পাতার মাঝখানে এসে গলা আটকে গেল। গরম লাগছে।
আমি লিখেছি:
গত বছর অক্টোবরের পুরোটা আমি আর নিশি ছাদে বসে চা খেতাম। বৃষ্টি ছিল। কার্তিক মাস। আমরা ভিজতাম। ও গান গাইত। আমার হাত ধরে। আমি ওর চুলে বেলি গুঁজে দিতাম। সাদা বেলি। ওর প্রিয়।
কাগজটা কেঁপে উঠল। এসি চলছে।
অক্টোবর। গত বছর। নিশি দুই মাসের জন্য কানাডা ছিল। বোনের ডেলিভারি। ৩ অক্টোবর গেছে, ৫ ডিসেম্বর ফিরেছে। টরন্টো।
পাসপোর্টে সিল আছে। আমি এয়ারপোর্টে দিয়ে এসেছি। টিকিটের কপি আমার মেইলে। ওখান থেকে রোজ ভিডিও কল করত। রাত ১২টায়। তুষার দেখাত। মাইনাস ৫ ডিগ্রি। মেপল লিফ।
ও ঢাকায় ছিল না। ছাদে না। বৃষ্টিতে না। আমার পাশে না। ওর বদলে বাসায় আমি একা ডিম ভাজি খেয়েছি।
অথচ আমার খাতায়, আমার মাথায়, আমার চোখে, ও প্রতিদিন ছিল। হাসছিল। গান গাইছিল। আমার হাত ধরে ছিল। আমি ওর চুলে বেলি দিয়েছি। গন্ধ পেয়েছি। শ্যাম্পুর গন্ধ।
আমি পাতা উল্টালাম। আরও আছে। হাত কাঁপছে।
নভেম্বরে নিশির জন্মদিন। আমরা সাজেক গেলাম। মেঘের মধ্যে। ও পাহাড় দেখে কাঁদল। আমি ছবি তুললাম।
নিশি নভেম্বরে কানাডা। সাজেক না। টরন্টোর সিএন টাওয়ার।
ছবি? কোনো ছবি নেই ফোনে। সাজেকের ফোল্ডার ফাঁকা।
ডিসেম্বরে নিশি আমার জন্য সোয়েটার বুনল। নীল রঙ। উল কিনেছিল নিউমার্কেট থেকে।
নিশি ফিরেছে ৫ ডিসেম্বর। জেট ল্যাগে অসুস্থ। বিছানা থেকে উঠতে পারত না। সোয়েটার বুনবে কখন? কাঁটাও ধরেনি।
আমার হাত থেকে খাতা পড়ে গেল। মেঝেতে।
আমি ডাক্তারের দিকে তাকালাম। গলা দিয়ে স্বর বের হয় না। পানি খাব।
উনি বললেন না, দেখলেন? উনি উঠে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। হাতটা গরম।
আমি ফিসফিস করলাম, আমি... আমি এতদিন কার সাথে ছিলাম? বাসায়? রাতে?
নিজের সাথে, অভিক। শুধু নিজের সাথে।
তাহলে... তাহলে এই ছয় মাস... নিশি... এই যে থেরাপি... এই যে হাসি...
ডাক্তার চুপ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। রাস্তায় জ্যাম।
আমি বুঝলাম।
থেরাপির ছয় মাস আমি সুস্থ হয়েছি। হ্যাঁ। রায়হান ভাই চলে গেছে। ফিসফিস বন্ধ। রাতের ঘুম ভালো।
কিন্তু নিশি?
নিশি তো আট মাস আগেই চলে গেছে। ব্যাগ নিয়ে। লাল ট্রলি। ডিভোর্স পেপার রেখে টেবিলে। আমি সাইন করিনি। আমি পড়িনি। ছিঁড়ে ফেলেছি। আমি বিশ্বাস করিনি। কোর্টে গেছি, কিন্তু দেখা করিনি।
তাই ব্রেইন ওকে রেখে দিয়েছে। আমার সাথে। খাওয়ার টেবিলে। ছাদে। বিছানায়। বাজার করতে গেছি ওকে নিয়ে।
আমি যে ‘সুস্থ’ হলাম, সেটা ছিল আরেকটা লেয়ারের অসুখ। লেয়ার্ড ডিলিউশন।
আমি রায়হান ভাইকে তাড়িয়েছি। কারণ ডাক্তার বলেছে উনি নেই।
কিন্তু নিশিকে যেতে দিইনি। কারণ ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না। তাই ব্রেইন ওকে বানিয়েছে।
ডাক্তার আস্তে বললেন, এখন থেকে আসল কাজ শুরু, অভিক। রিয়েলিটি টেস্টিং। গ্রাউন্ডিং।
আমি মাথা নিচু করলাম। টেবিলের কাঠের দাগ গুনছি।
প্রথমবার নিজেকে প্রশ্ন করলাম।
আমি এতক্ষণ যা বললাম, যা লিখলাম, যা মনে রেখেছি, তার কতটা সত্যি?
ডাক্তার কি সত্যি? এই চেম্বার? এই খাতা?
হয়তো এই গল্পটাও না। হয়তো আমি এখনো ৩০৫ নম্বর কক্ষে।
------------------------------সমাপ্ত----------------------------
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।