একটি ধারাবাহিক প্রেমের গল্প
নীল সাগরের ওপারে
পর্ব ২ : অচেনা মেয়েটি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৭ জুন ২০২৬
অভিক কখনো ভাবেনি, একটা সাদামাটা সন্ধ্যা মাথার ভেতর এতগুলো প্রশ্ন রেখে যেতে পারে।
গাড়ির পাশে দাঁড়িয়েও তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল সমুদ্রের দিকটায়। সেখানে একটা মেয়ে বসে আছে। একা।
কিছুক্ষণ আগে মেয়েটা নিজের সঙ্গেই কথা বলছিল। কাঁদছিলও। অথচ চেষ্টা করছিল কেউ যেন টের না পায়।
অভিক অনেক রকম মানুষ দেখেছে। কেউ কষ্ট ঢাকতে হাসে। কেউ রাগ দিয়ে দুর্বলতা আড়াল করে। কিন্তু এই মেয়েটার মধ্যে অন্য কিছু ছিল বলে মনে হলো। সে তার ভেতরের লড়াইটা লুকানোর তেমন চেষ্টা করছে না।
দরজার হাতলে হাত রেখেছিল অভিক। খুলবে। তারপরও থেমে গেল। আরেকবার তাকাল মেয়েটার দিকে।
মনে হলো, গিয়ে শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করে—“আপনি ঠিক আছেন?”
কিন্তু পর মুহূর্তেই নিজেকে থামাল। সব মানুষের কিছু সময় থাকে, যেটা একান্তই তার। সেখানে হঠাৎ করে অন্য কারো ঢুকে পড়া দরকার নাও হতে পারে।
অথচ মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দৃশ্যটা পাল্টে গেল।
দূর থেকে হঠাৎ কয়েকজনের গলার আওয়াজ কানে এলো। তাকিয়ে দেখল, কিছুটা দূরে সেই মেয়েটাকে ঘিরে ঝামেলা শুরু হয়েছে। একটা ছেলে তর্ক করছে। ছেলেটার ভঙ্গি, চোখের চাহনি—কোনোটাই সুবিধের মনে হলো না।
অভিক দ্রুত পা চালাল। কাছে পৌঁছানোর আগেই মেয়েটা ছেলেটার চোয়ালে ঘুষি বসিয়ে দিল।
দৃশ্যটা দেখে অভিক এক মুহূর্ত থমকাল। মেয়েটার চোখে ভয় নেই। আছে শুধু জমে থাকা রাগ, হয়তো কয়েকদিনের, কিংবা কয়েক বছরের।
ছেলেটা রেগে এক পা এগিয়ে এলো। আশপাশের দু-একজন তখন ব্যাপারটা খেয়াল করতে শুরু করেছে। সৈকতের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বালিতে লম্বা ছায়া পড়েছে সবার।
অভিক আর দেরি করল না। গিয়ে ছেলেটার কব্জি চেপে ধরল।
“যথেষ্ট হয়েছে।”
গলার স্বর উঁচু না। কিন্তু তাতে একটা স্পষ্ট ওজন ছিল।
ছেলেটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পরিস্থিতি মাপার চেষ্টা করছে বলে মনে হলো। চারপাশে লোক জড়ো হচ্ছে দেখে তার সাহসটা কমে এলো।
শেষমেশ বিরক্ত মুখে সরে গেল। যাওয়ার সময় একবার পেছন ফিরে তাকাল। আগের সেই দাপট চোখে নেই।
নিশি তখনও হাঁপাচ্ছে। রাগটা পুরোপুরি যায়নি। অভিকের দিকে তাকাতেই তার মুখের ভাবটা সামান্য বদলাল। সতর্কতা আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক।
“আপনি ঠিক আছেন?” অভিক আস্তে জিজ্ঞেস করল।
নিশি কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর ছোট করে বলল, “হ্যাঁ।”
একটা শব্দ মাত্র। কিন্তু সেই ‘হ্যাঁ’-এর ভেতর ক্লান্তি টের পাওয়া যায়।
“আপনার নামটা জানতে পারি?”
প্রশ্নটা করে অভিক নিজেই একটু থমকাল। হয়তো তাড়াহুড়ো হয়ে গেল।
নিশি তার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ দেখল। এরপর বলল, “নিশি।”
ব্যস, এটুকুই।
অভিক হালকা হাসল। “আমি অভিক।”
নাম বিনিময়টা সাধারণ। তবু মুহূর্তটা মাথায় গেঁথে গেল। কেন, সেটা বোঝা কঠিন।
“আপনি এখানে একা?”
কথাটা বলেই অভিক বুঝল, প্রশ্নটা না করলেও হতো।
নিশির চোখের দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “আজ একটু একা থাকতে চেয়েছিলাম।”
অভিক আর কিছু জানতে চাইল না। কিছু কষ্টের দরজা জোর করে খুলতে নেই। খুললেও ভেতরে আলো পৌঁছায় না সবসময়।
দুজনেই চুপ। অস্বস্তি লাগছে না। শুধু ঢেউয়ের শব্দ। বাতাসে নিশির চুল বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে। সে হাত দিয়ে সরাচ্ছে না।
অভিক লক্ষ্য করল, মেয়েটার চোখে এখনো কষ্ট জমে আছে। আবার সেই কষ্টের ভেতর এক ধরনের জেদও আছে। যেন অনেক কিছু হারিয়েও সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চায়।
“আপনি কিছু খেয়েছেন?” হঠাৎ বলল অভিক।
নিশি ফিরে তাকাল। চুপ করে থেকে উত্তর দিল, “না।”
অভিক মাথা নাড়ল। “তাহলে চলুন, কিছু খাওয়া যাক।”
নিশি দ্বিধায় পড়ল। অচেনা কারো সঙ্গে যাওয়া ঠিক হবে কি না, এই প্রশ্নটা মাথায় এলো। সাবধান হতে বলছে মনের একটা অংশ।
আবার অন্য একটা অংশ বলছে, আজকের রাতটা একটু অন্যরকম হোক।
শেষ পর্যন্ত মাথা নাড়ল সে। রাজি।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। বালির ওপর তাদের পায়ের ছাপ পড়ছে। একটু পরেই ঢেউ এসে সেটা মুছে দেবে।
একজন নিজের অতীত আড়াল করে হাঁটছে। আরেকজন নিজের ভেতরের অচেনা অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করছে।
সামনে কী আছে, কেউ জানে না।
দূরে সমুদ্র থামছে না। একটার পর একটা ঢেউ এসে তীরে ভাঙছে। যেন গল্পটা কেবল শুরু হলো।
চলবে...
#নীল_সাগরের_ওপারে
#অভিক_ও_নিশি
#ধারাবাহিক_গল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।